জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙার ঘোষণা দিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়া হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের চট্টগ্রামে আসা ঠেকাতে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ঘোষণা নিয়ে টান টান উত্তেজনা চলছে চট্টগ্রামে। মামুনুলের চট্টগ্রাম আগমন প্রতিরোধে গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, অক্সিজেন মোড় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর সড়কসহ বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা। তবে আগের দিন বৃহস্পতিবার রাতেই মামুনুল হক হাটহাজারী এসে পৌঁছান বলে গুঞ্জন থাকলেও তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আল আমিন সংস্থা নামে একটি সংগঠনের আয়োজনে হাটহাজারী পার্বতী স্কুল মাঠে দুই দিনব্যাপী এক ধর্মীয় মাহফিলে গতকাল সন্ধ্যায় বক্তব্য রাখার কথা ছিল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত এক প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে মামুনুলের চট্টগ্রাম আগমন প্রতিহত করার ঘোষণা দেন যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতারা। এর অংশ হিসেবে গতকাল সকাল থেকেই চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চুর নেতৃত্বে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় অবস্থান নেন। দুপুরে নগরী থেকে হাটহাজারীমুখী অক্সিজেন মোড়ে ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর সড়কের মাথায় ও অবস্থান নেন ছাত্রলীগ কর্মীরা। সেখানে সমাবেশ করে তারা মামুনুল হককে হাটহাজারীতে ঢুকতে দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দেয়। যুবলীগ-ছাত্রলীগের অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে মামুনুল হককে বিমানবন্দর কিংবা সড়কপথে হাটহাজারীতে যেতে দেখা যায়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হেফাজত প্রচার সম্পাদক মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়জী গতকাল বিকেল ৪টায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাওলানা মামুনুল হক চট্টগ্রাম এসেছেন কি না, তা আমার জানা নেই।’
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হকও মাওলানা মামুনুল হকের অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাটহাজারীতে অনুষ্ঠানরত ধর্মীয় মাহফিলকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যাতে অবনতি না ঘটে, সে ব্যাপারে আমরা পুরোপুরি সতর্ক রয়েছি।’
চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিমানবন্দরে অবস্থান নিয়েছিলাম। ওই সময়ে তিনি আসেননি। এ ছাড়া অক্সিজেন মোড়ে আমাদের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে বিকল্প কোনো পথে গোপনে তিনি এসেছেন কি না, তা আমাদের জানা নেই।’
ভাস্কর্য বসালে টেনেহিঁচড়ে ফেলে দেওয়ার হবে : কোথাও কোনো দল ভাস্কর্য বসালে তা টেনেহিঁচড়ে ফেলে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের আমির জুনাইদ বাবুনগরী। গতকাল রাতে হাটহাজারীর পার্বতী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আল আমিন সংস্থা আয়োজিত তিন দিনের তাফসিরুল কোরআন মাহফিলের সমাপনী দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতাকারী মামুনুল হকের এই মাহফিলে অন্যতম প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখার কথা থাকলেও তিনি সেখানে উপস্থিত হননি। তবে এই মাহফিল থেকেই ভাস্কর্যবিরোধী বক্তব্য দেন জুনাইদ বাবুনগরী।
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মদিনার সনদে দেশ চলবে। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। মদিনার সনদে যদি দেশ চলে, ইসলামবিরোধী কোনো কাজ হতে পারবে না। ইনশাআল্লাহ প্রধানমন্ত্রী (ভাস্কর্য বসাতে) দেবে না, দেবে না। মদিনার সনদে যদি দেশ চলে, কোনো ভাস্কর্য থাকতে পারে না। মদিনায় কি কোনো ভাস্কর্য আছে?’
ভাস্কর্য স্থাপন শরিয়তসম্মত নয় উল্লেখ করে বাবুনগরী বলেন, ‘কোনো পার্টি বা নেতার নাম বলছি না, যার ভাস্কর্য হোক না কেন। আল্লাহর কসম, কেউ যদি আমার আব্বার ভাস্কর্য বসায়, আমি সর্বপ্রথম সেই ভাস্কর্য টেনেহিঁচড়ে ফেলে দেব। যে-কোনো দল ভাস্কর্য বসাবে, আমার আব্বার ভাস্কর্যও যদি স্থাপন করা হয়, সেটা শরিয়তসম্মত হবে না। টেনেহিঁচড়ে ফেলে দেব।’
হাটহাজারী মাদ্রাসার অদূরে তিন দিনব্যাপী এই মাহফিলের আয়োজক ‘আল আমিন সংস্থা’ নামে একটি সংগঠন হলেও মূলত হেফাজত সংশ্লিষ্টরাই এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।
গত ১৩ নভেম্বর ঢাকার গেণ্ডারিয়ার ধূপখোলা মাঠে ‘তৌহিদী জনতা ঐক্যপরিষদের’ ব্যানারে এক সমাবেশ থেকে মুজিববর্ষ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করা হয়। একই দিনে রাজধানীর বিএমএ অডিটরিয়ামে বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে শানে রিসালাত কনফারেন্সে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা মামুনুল হকও প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করেন। এরপর থেকে তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করে আসছে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ বিভিন্ন সংগঠন।
