দেশে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না। মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ২৫ জন করে করোনায় মারা গেছে। এর আগের মাসগুলোতেও মৃত্যুর সংখ্যা কখনো বেড়েছে, কখনো কিছুটা কমেছে। এমনকি সে সময় বেশ কিছুদিন প্রতিদিন গড়ে ৪০-৪১ জন করে মারা গেছে; বিশেষ করে ১৫ দিন ধরেই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই। দুই সপ্তাহে যেখানে মারা গেছে ৪০৭ জন। অথচ এর আগের দুই সপ্তাহেও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২৫০, যা গত দুই সপ্তাহের মৃত্যুর চেয়ে ১৫৭ জন বেশি। অর্থাৎ শেষ দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে করোনায় মৃত্যুর হার বেড়েছে ৬৩ শতাংশ। এর আগের দুই সপ্তাহে এই হার ছিল ৩০ শতাংশ বেশি।
অথচ এই সময়ে মৃত্যু অনুপাতে শনাক্ত অতটা বাড়েনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনাবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শেষ সাত দিনে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা তার আগের সপ্তাহের তুলনায় ৪ শতাংশ বেড়েছে। শেষ দুই সপ্তাহে শনাক্ত তার আগের দুই সপ্তাহের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি। কিন্তু একই সময়ে মৃত্যু বেড়েছে ৬৩ শতাংশ।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ৩৬ জন করোনা রোগী মারা গেছে। এ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৬ হাজার ৫৮০। গত ৮ মার্চ প্রথম সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৬৪ জন, গত ৩০ জুন। এটিই করোনায় এক দিনে এখন পর্যন্ত দেশে সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা। দ্বিতীয় এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ২৬ আগস্ট ৫৪ জন। গত ১৮ মার্চ প্রথম একজনের মৃত্যুর সংবাদ জানানো হয়।
প্রতিদিন করোনায় মৃত্যুর ঘটনায় দেশের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে; বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ খুব ভয়ের মধ্যে আছেন। পরীক্ষা করে করোনা পজিটিভ হলেই পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী মানুষদের নিয়ে ভয়ের মধ্যে পড়ছেন স্বজনরা। কারণ বয়স্ক মানুষ আক্রান্ত কম হলেও মারা যাচ্ছেন বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, এখন পর্যন্ত অন্যান্য বয়সী মানুষের চেয়ে পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন সবচেয়ে কম ১৮ শতাংশ। অথচ মারা গেছেন সবচেয়ে বেশি প্রায় ৭০ শতাংশ। বেশি আক্রান্ত ২১-৪০ বছর বয়সী তরুণ ও যুবকরা, ৫৫ শতাংশ। কিন্তু মারা গেছে কম প্রায় ১২ শতাংশ।
কেন মৃত্যু কমানো যাচ্ছে না জানতে চাইলে বিশেষজ্ঞরা জানান, শনাক্ত রোগীদের শনাক্ত হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফলোআপ হচ্ছে না। তারা চিকিৎসকের সঠিক পরামর্শ পাচ্ছেন না। করোনা পজিটিভ হওয়ার পর নিজেদের ইচ্ছেমতো বাসায় থাকছেন ও সাধারণ চিকিৎসা নিচ্ছেন। এতে তাদের শারীরিক অবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠছে। এমনকি সর্বশেষ তারা যখন হাসপাতালে আসছেন, তখন আর চিকিৎসকদের কিছু করার থাকছে না।
রোগীদের ঠিকমতো ফলোআপ না করার পেছনে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের অর্থ, লজিস্টিক জনবলসংকটকে কারণ হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা। তাদের মতে, ফলোআপের জন্য যে পরিমাণ চিকিৎসক দরকার, তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) নেই।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে মৃত্যুর কারণ হচ্ছে যে যত রোগী শনাক্ত হচ্ছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের ফলোআপ করা দরকার। সেটা ঠিকমতো হচ্ছে না। আইইডিসিআর এ কাজটা করছে। কিন্তু এ কাজ করতে যে পরিমাণ জনবল দরকার, আইইডিসিআরে সেটা খুবই কম। প্রতিদিন রোগী শনাক্ত হচ্ছে দেড়-দুই হাজার। তা হলে এসব রোগীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফলোআপ করতে অন্ততপক্ষে ১০০ জন চিকিৎসক দরকার। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থাসহ সব মিলে চিকিৎসক আছেন ৫০ জনের কম, ৪০ জনের মতো। সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন যে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক থাকলেই হবে। কিন্তু হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা যদি কমাতে হয় তা হলে যারা শনাক্ত হচ্ছেন, তাদের মধ্যে বেশির ভাগই মৃদু লক্ষণযুক্ত, চিকিৎসক টেলিফোন করে যদি বুঝতে পারেন তার ডায়াবেটিস আছে, তার বয়স বেশি, তখন তারা তাকে ওষুধ খাওয়া বা হাসপাতালে যাওয়ার ব্যাপারে সঠিক পরামর্শ দিতে পারেন। এটা হলে মৃত্যুটা কমে যায়।
ফলোআপের জন্য চিকিৎসকদের টেলিফোন খরচ দেওয়া দরকার বলেও মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। এ ব্যাপারে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ জন্য বাজেট লাগবে। সরকার যদি এ ক্ষেত্রে এক টাকা বরাদ্দ করে, তাহলে এক হাজার টাকা খরচ থেকে বাঁচতে পারে। যেসব চিকিৎসক কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং করেন, তাদের জন্য টেলিফোন বিল বরাদ্দ করবে। এ বিষয়টা বোঝানোই যাচ্ছে না। মহামারী প্রস্তুতি মানে শুধু হাসপাতালের প্রস্তুতিই নয়, হাসপাতালের প্রস্তুতি শেষধাপ। শনাক্তের পর ফলোআপ ও কোয়ারেন্টাইনের মাধ্যমে রোগীর সংখ্যা কমাতে কমাতে শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে যাওয়া। তা হলে হাসপাতালের ওপর চাপ কম পড়বে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি শনাক্ত রোগীদের ফলোআপ করা যায়, তাহলে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কমে যাবে। তারও আগে দরকার সংক্রমণ কমানোর ওপর জোর দেওয়া। এই বিশেষজ্ঞ জোর দিয়ে বলেন, সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে হলে এসব কাজে জনবল, লজিস্টিক ও আরও সম্পদ সন্নিবিষ্ট করা। মূলত ফলোআপ করতে না পারার কারণেই মৃত্যু বাড়ছে। উচিত যত রোগী শনাক্ত হচ্ছে, প্রত্যেককে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফলোআপ করা। তা না হলে মৃত্যুর সংখ্যা ঠেকানো মুশকিল।
রোগীদের ঠিকমতো ফলোআপ কেন করা যাচ্ছে না কেন, জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফলোআপ করার জন্য অর্থেরও ব্যাপার আছে। কেস ট্র্যাকিং করতে হয়। ট্র্যাক করার জন্য জনবল ও লজিস্টিক লাগবে। সফটওয়্যার লাগবে। ট্র্যাকিংয়ের জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি ও ব্যবস্থা লাগবে। ট্র্যাক ছাড়া উপায় নেই। কারণ সবাইকে তো কোয়ারেন্টাইন করা সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে মানুষের মধ্যেও সচেতনতা দরকার।
মৃত্যু কমানো যাচ্ছে না কেন, জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই প্রধান কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সবাই নানা রকম পরামর্শ দিচ্ছে। আমরাও চেষ্টা করছি। কিন্তু মানুষ তো বেপরোয়া। কোনোভাবেই সংগমনিরোধ (সামাজিক দূরত্ব রক্ষা) করা যাচ্ছে না। এটাই আমাদের সর্বনাশ করছে। গ্রামে তো বাদই দিলাম, শহরেই মানানো যাচ্ছে না।
এই কর্মকর্তা জানান, মৃত্যুহার সর্বোচ্চ ঢাকা, বগুড়া ও চট্টগ্রাম শহরে। বাকিগুলোতে ও রকম না। ঢাকায় নারীর তুলনায় পুরুষরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী মানুষের মধ্যে যাদের অন্যান্য রোগ রয়েছে, তাদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। যারা যুবক, তারা কোনো কিছু আমলে নিচ্ছে না। বাইরে যাচ্ছে, আসছে। তাদের দ্বারা ঘরের মধ্যে বেশি বয়সী মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।
যতক্ষণ পর্যন্ত কার্যকর ভ্যাকসিন না আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মাস্ক ব্যবহার ও সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে চলাটাই একমাত্র উপায় বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তিনি বলেন, নাক-মুখ ছাড়া এই ভাইরাস ঠেকানোর কোনো উপায় নেই; বিশেষ করে মাস্কের কোনো বিকল্প নেই। সামাজিক মেলামেশাও কমাতে হবে। অথচ এখন সেটা আরও বেড়েছে। মসজিদে মাস্ক ব্যবহার হচ্ছে না।
অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম মৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়ে বলেন, যে কথাটা বারবার করে বলা হচ্ছে, যাদের বয়স বেশি, অর্থাৎ পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়স, যাদের ক্যানসার, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপসহ অন্যান্য রোগ রয়েছে, তারা যদি করোনা পজিটিভ হয়, তা হলে যেন কিছুতেই ঘরে বসে না থাকে। এখন যেটা হচ্ছে, তারা যখন হাসপাতালে আসছে, খুব খারাপ অবস্থায় আসছে। এর আগে তারা বাসায় থেকে নানা ধরনের ওষুধ খাচ্ছে, জেনারেল চিকিৎসা নিচ্ছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। বারবার করে বলা হচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট বয়সী মানুষদের শনাক্তের সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে আসতে। কিন্তু সেটা শুনছে না।
সামনে মৃত্যু আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করে দেন ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাধারণত সংক্রমিত হওয়ার তিন-চার সপ্তাহ পর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। গত তিন-চার সপ্তাহে সংক্রমণ পরিস্থিতি একটু কম ছিল। হয়তো কোনো কোনো রোগী তার আগে থেকেই অসুস্থ ছিল। দেশে মৃত্যুর সংখ্যাটা কখনো কমছে, কখনো বাড়ছে। কাজেই সংক্রমণ বেড়ে গেলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে। এখন সংক্রমণ আবার বাড়ছে। মৃত্যুর ক্ষেত্রে এটার প্রভাব আরও তিন-চার সপ্তাহ পরে বুঝতে পারব। তবে এখন যে মৃত্যুর সংখ্যা, সেটা যদি গত তিন সপ্তাহ আগের সংক্রমিত রোগীর ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, তাহলে এখন যে সংক্রমণ একটু বাড়তির দিকে, সেই অনুপাতে মৃত্যুর সংখ্যাটা আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে।
