প্রথম অনুমোদিত ফাইজারের টিকা বাংলাদেশে আসছে না

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০২:৩৩ এএম

বিশ্বের প্রথম করোনা টিকা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফাইজার ও জার্মান কোম্পানি বায়োএনটেক উদ্ভাবিত টিকাকে সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটিতে যারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন, আগামী সপ্তাহ থেকেই তাদের এ ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হবে। বিবিসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এ তথ্য জানায়।

গতকাল বুধবার যুক্তরাজ্যের ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা পণ্যের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমএইচআরএ বলেছে, ফাইজারের করোনার টিকা নিরাপদ। আর ফাইজার/বায়োএনটেকের দাবি, তাদের উদ্ভাবিত করোনার টিকা ৯৫ শতাংশ কার্যকর। ইতিমধ্যে এ টিকার চার কোটি ডোজের ক্রয়াদেশ দিয়েছে যুক্তরাজ্য। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ফাইজার ও বায়োএনটেক প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ করে জানায়, তাদের ভ্যাকসিনটি কভিড-১৯ থেকে ৯০ শতাংশ সুরক্ষা দেয়। আর এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই। গত ১৮ নভেম্বর ফাইজার-বায়োএনটেক টিকাটির চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে তাদের উদ্ভাবিত টিকা ৯৫ শতাংশ কার্যকর বলে দাবি করা হয়।

করোনার প্রথম টিকা হিসেবে ফাইজার/বায়োএনটেকের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বিশ্বে রোগটি নিয়ন্ত্রণে মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হলো। তবে হাতেগোনা কয়েকটি দেশ বাদে বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশেই এ টিকার সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা না থাকায়, এ সুসংবাদ অন্য দেশগুলোর জন্য সরাসরি কোনো কাজে আসছে না।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগের সরকারি কর্মকর্তা ও ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, মূলত সংরক্ষণ অবকাঠামোর অভাবেই এ টিকা বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা নেই। বিশেষ করে সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য মাইনাস ৮০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার যে কোল্ডচেইন ও ফ্রিজার ভ্যান দরকার, তা বাংলাদেশে নেই। এমনকি ভারত ও পাকিস্তানসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই এ তাপমাত্রার কোল্ডচেইন নেই। এজন্য ফাইজারের সঙ্গে কোনো চুক্তিও করেনি বাংলাদেশ।

সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় বেসরকারিভাবেও বাংলাদেশে ফাইজারের টিকা আনার কোনোই সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন দেশের বেসরকারি ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তারা। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বাংলাদেশে যতগুলো ভ্যাকসিন এ পর্যন্ত আনা হয়েছে, সবই ২-৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার কোল্ডচেইনে রাখা হয়। ফাইজারের টিকার জন্য যে তাপমাত্রার কোল্ডচেইন দরকার, সেটা সরকারি ও বেসরকারি কারও কাছেই নেই। তাছাড়া ফাইজার পৃথিবীর সব দেশে এ ভ্যাকসিন দেবেও না। মাত্র সাতটি দেশে সরবরাহ করবে। তাছাড়া এ ভ্যাকসিনের দামও বেশ চড়া। ফাইজার-বায়োএনটেক জানিয়েছে, তাদের তৈরি টিকার প্রতি ডোজের দাম পড়তে পারে ২০ ডলার করে। সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি বলছে, সেটি সত্যি হলে মডার্নার চেয়ে ফাইজারের টিকার দাম কম হতে পারে। মডার্নার টিকার দাম ৩৭ ডলার হতে পারে।

নির্দিষ্ট তাপমাত্রার কোল্ডচেইন না থাকায় ফাইজারের সঙ্গে বাংলাদেশ এ টিকা আনার ব্যাপারে কোনো চুক্তি করেনি বলে জানান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান। তিনি গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের কোল্ডচেইন নেই বলে আমরা তো তাদের সঙ্গে যাইনি। কারণ ফাইজার সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার কোনো কোল্ডচেইনের ব্যবস্থা বাংলাদেশে করা যাচ্ছে না। ভারত ও পাকিস্তানেও ব্যবস্থা নেই। একটা ভ্যাকসিন টাকা দিয়ে কিনে আনতে হবে। টেম্পারেচার (সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রা) যথাযথ না থাকলে ভ্যাকসিন নষ্ট হয়ে যাবে।

একইভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফাইজারের টিকা সংরক্ষণে যে টেকনিক্যাল দিক, অর্থাৎ যে তাপমাত্রার কোল্ডচেইনে রাখতে হয়, সেটা আমাদের নেই। সে কারণে আমরা ভ্যাকসিনটা আনতে পারব না। তবে সরকার চাইলে আস্তে-ধীরে এ ধরনের কোল্ডচেইন ডেভেলপ করতে পারে।

তবে ফাইজারের টিকার অনুমোদনের মধ্য দিয়ে এক ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করবে বিশ্বের মানুষ উল্লেখ করে এ কর্মকর্তা বলেন, ফাইজারের ভ্যাকসিন অনুমোদনের মধ্য দিয়ে একটি সুবিধা হলো যে একটা ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলো। মানবদেহে প্রয়োগ করার পর কী অবস্থা হয়, সেটার অবজারভেশনাল স্টাডি (পর্যবেক্ষণ তথ্যাদি) আমরা পাব। ওরা কীভাবে দিচ্ছে, কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি না, সেসব অবজারভেশন অবশ্যই আমাদের জন্য ভালো।

তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বড় কথা ওরা (ফাইজার/বায়োএনটেক) পৃথিবীর অন্যান্য দেশকে দিচ্ছে এমনটাও নয়। ওরা ওদের জন্যই উৎপাদন করেছে। কারণ হচ্ছে যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গ্লোবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স-গ্যাভির সঙ্গে যে চুক্তি আছে পৃথিবীর যে ভ্যাকসিনই উৎপাদন হবে, সেটার একটা অংশ গ্যাভিকে দিতে হবে। গ্যাভি সেই ভ্যাকসিন বিভিন্ন দেশের সক্ষমতা অনুযায়ী দেবে। এখন গ্যাভি কী করে সেটাই দেখার বিষয়।

বাংলাদেশ এখন গ্লোবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স-গ্যাভি থেকে টিকা পেতে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই প্রধান কর্মকর্তা বলেন, আমরা গ্যাভিকে ৭ ডিসেম্বর চিঠি দেব যে আমাদের বরাদ্দ ভ্যাকসিন কোনটা সেটা জানতে। সেটার প্রস্তুতি আমরা নিচ্ছি। সচিব মহোদয়ের নেতৃত্বে একটা মিটিং হবে। ওই মিটিংয়ের পর ই-মেইলের মাধ্যমে আমরা গ্যাভিকে পাঠিয়ে দেব। ওই চিঠিতে আমরা জানতে চাইব গ্যাভি সারা পৃথিবীতে যে ঘোষণা দিয়েছে, পৃথিবীর যে ভ্যাকসিনই বের হোক না কেন, সেটার একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাকসিন গ্লোবাল অ্যালায়েন্সকে দিতে হবে। সেই নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাকসিন গ্লোবাল অ্যালায়েন্স যেসব দেশকে দিতে চায়, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে একটি। তারা বিভিন্ন দেশের সক্ষমতা অনুযায়ী, অর্থাৎ ওই দেশে ওই ভ্যাকসিনটা দেওয়ার মতো অবকাঠামো আছে কি না, সে অনুযায়ী তারা সরবরাহ করবে। আমরা তো এখন পর্যন্ত জানি না কোন ভ্যাকসিনটা গ্যাভি পাবে ও কতটুকু পাবে। আমরা এতদিন পর্যন্ত গ্যাভির ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য যা যা করার সব করেছি। বিভিন্ন পদক্ষেপ পূরণ করেছি। এখন চূড়ান্তভাবে এ চিঠিতে জানতে চাইব আমাদের ভাগেরটা আমাদের কবে দেবে, কীভাবে দেবে।

এমনকি বেসরকারি উদ্যোগেও বাংলাদেশে ফাইজারের করোনার টিকা আনার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন বেসরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালের মার্কেটিং ডিরেক্টর রিজভি উল কবির। তিনি গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় ফাইজারের টিকা বেসরকারি উদ্যোগেও আমদানির কোনো সম্ভাবনা নেই। তাছাড়া যুক্তরাজ্য তো সব দেশকে দেবেও না। আমেরিকা, ইউকে, জার্মানি, ফ্রান্সসহ পৃথিবীর মাত্র সাতটা দেশে দেবে ফাইজার। সব দেশে দিচ্ছেও না। পৃথিবীর খুব কম দেশেই ফাইজারের ভ্যাকসিন সংরক্ষণ ব্যবস্থা আছে।

বেসরকারিভাবেও ফাইজারের টিকা না আনার কারণ হিসেবে এ কর্মকর্তা বলেন, ফাইজারের ভ্যাকসিন সংরক্ষণের জন্য মাইনাস ৭১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার কোল্ডচেইন দরকার হয়। এ পরিমাণ তাপমাত্রা নিশ্চিত করতে হলে মাইনাস ৮০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার ওয়্যারহাউজ এবং যে গাড়িতে ভ্যাকসিন নেওয়া হবে, সেখানেও এ তাপমাত্রার ব্যবস্থা থাকতে হবে। ইংল্যান্ড ও আমেরিকাতে এ সুবিধা আছে। আমাদের দেশে এ ব্যবস্থা নেই। আমরা এ পর্যন্ত যত ভ্যাকসিন বাংলাদেশে এনেছি সেগুলো ২-৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার কোল্ডচেইনে রাখলেই হয়। মাইনাস ৮০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার শুধু একটা ওয়্যারহাউজ করলেই হবে না, এয়ারপোর্ট থেকে আনতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে, সেখান থেকে সারা বাংলাদেশে সরবরাহের জন্য মাইনাস ৮০ ডিগ্রি তাপমাত্রার ফ্রিজার ভ্যান বা গাড়ি লাগবে, যেখানে যাবে সেখানে ভ্যাকসিন দেওয়ার সময় একই তাপমাত্রার প্রিজার্ভ ব্যবস্থা লাগবে বাংলাদেশের এ অভিজ্ঞতা নেই। বাংলাদেশে কারোরই নেই। সরকারের কাছেও নেই।

বিশেষজ্ঞরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না ও যুক্তরাজ্যের ফাইজার যে এমআরএনএ প্রযুক্তিভিত্তিক টিকা তৈরি করেছে, তা সংরক্ষণ করতে হবে মাইনাস ৭০-৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। কিন্তু বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও শিশুদের টিকা সংরক্ষণ ও বিতরণের জন্য যে ব্যবস্থা, তাতে সর্বনিম্ন মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার কোল্ডচেইন আছে। এমআরএনএ টিকা সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণের জন্য নিজেদের সক্ষমতা বাংলাদেশের রাতারাতি অর্জন করার সম্ভাবনা কম। কারণ এটি খুবই ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। আর এজন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক রেফ্রিজারেটর স্বল্প সময়ে পাওয়া যাবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত