আটকে রাখার পর ৩৫ বিদেশি সাংবাদিক বহিষ্কার

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০২:৩৪ এএম

অ্যাব রোজেনথাল একাত্তরের বাংলাদেশ-বান্ধব সাংবাদিক। ৫৬ বছর একটানা নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ কাজ করেছেন। ১৯৪৩ সালে সিটি কলেজ অব নিউ ইয়র্কে অধ্যয়ন কালেই এ পত্রিকায় কাজ শুরু করেন, শুরুতে ক্যাম্পাসের জন্য লিখতেন, তাকেই নিয়মিত ক্যাম্পাস করেসপন্ডেন্ট করা হয়। অল্পদিন পরেই ১৯৪৪ এর ফেব্রুয়ারিতে তিনি স্টাফ রিপোর্টার হলেন। ১৯৫০ দশকের প্রায় পুরোটাই এবং ষাটের দশকের প্রথমাংশে তিনি নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিদেশ সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছেন।

১৯৫৪ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দায়িত্ব দিয়ে তাকে নয়া দিল্লি পাঠানো হয়। ১৯৫৮-তে তাকে বদলি করা হয় পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে, তিনি পূর্ব ইউরোপ এবং পোল্যান্ডের সংবাদ প্রেরণ করতেন। বিশ^স্ত সংবাদের জন্য তিনি আমেরিকান মিডিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। পোলিশ নেতা লেডিসলাভ গোমুলকার নেতৃত্বের বিভিন্ন দুর্বলতা তুলে ধরে প্রতিবেদন পাঠালে ক্ষিপ্ত সরকার তাকে ওয়ারশ থেকে বহিষ্কার করে। তাকে পোল্যান্ড থেকে বহিষ্কারের যে দাপ্তরিক কারণ উল্লেখ করা হয় তাও স্মরণযোগ্য ‘তিনি অত্যন্ত গভীরে প্রবেশ করে আমাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, পার্টি এবং নেতৃত্বের ভেতরের খবর লিখে পাঠিয়েছেন। পোলিশ সরকার এ ধরনের অনুসন্ধানী গোয়েন্দা প্রতিবেদন সহ্য করতে রাজি নয়।’

পূর্ব ইউরোপবিষয়ক প্রতিবেদনের জন্য অ্যাব রোজেনথাল আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন বিভাগের শ্রেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে ১৯৬০ সালে পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৬৯ সালে তিনি নিউ ইয়র্ক টাইমসের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হলেন, তিনি একই সঙ্গে পত্রিকার সংবাদ প্রকাশনার ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতেন। ১৯৭০-এর দশকে তারই নির্দেশিত গাইড লাইন ধরে ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির সংবাদ প্রকাশিত হতো। তার দুঃসাহসিক সিদ্ধান্তেই ১৯৭১-এ মার্কিন সরকারের গোপনীয় দলিলপত্র পেন্টাগন পেপার্স প্রকাশের ঝুঁকি নেন, এতে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এর প্রকাশনা বন্ধ করতে নিক্সন প্রশাসন আদালতের দ্বারস্থ হয়। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় কোনো সংবাদের প্রকাশনা রহিত করার কোনো অধিকার সরকারের নেই।

তিনি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত নিউ ইয়র্ক টাইমসের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন, ১৯৯৯ পর্যন্ত পত্রিকার নিয়মিত কলাম লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

কলামিস্ট ওয়েজলি প্রুডেন লিখেছেন, অ্যাব সহকর্মীদের ভালোবাসা ও নিন্দা দুই-ই পেয়েছেন। যারা তার প্রত্যাশিত কাজের মান রক্ষা করতে পেরেছেন তারা তাকে ভালোবেসেছেন কিন্তু সিটি এডিটর, ম্যানেজিং এডিটর এবং এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে যারা তার প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি তারা তাকে অপছন্দ করেছেন। তাকে নিয়ে সমালোচনার অত্যন্ত তাজা একটি ক্ষেত্র হচ্ছে তার ইরাক যুদ্ধ সমর্থন; আফগানিস্তান, ইরান, সিরিয়া ও সুদানের ব্যাপারে তার অনমনীয়তা।

অ্যাব রোজেনথালের পুরো নাম আব্রাহাম মাইকেল রোজেনথাল, জন্ম ২ মে ১৯২২ কানাডার ওন্টারিওতে একটি ইহুদি পরিবারে, ১০ মে ২০০৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার এপিটাফে লেখা আছে ‘হি কেপ্ট দ্য পেপার স্ট্রেইট’ তিনি পত্রিকাটিকে সোজা রেখেছেন।

অ্যাব রোজেনথাল অনেক শত্রু সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে কোনো শত্রুই তার সমকক্ষ ছিলেন না।

নিউইয়র্ক টাইমস-এ ২৮ মার্চ ১৯৭১ প্রকাশিত প্রতিবেদন

৩৫ জন বিদেশি সাংবাদিক বহিষ্কার

ঢাকার একটি হোটেলে ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় আটকে রাখার পর সামরিক কর্তৃপক্ষ ৩৫ জন বিদেশি সাংবাদিককে গতকাল (২৭ মার্চ, ১৯৭১) পূর্ব পাকিস্তান থেকে বের করে দিয়েছে।

উত্তর ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে বের হলে তাদের গুলি করার হুমকি দিয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সাংবাদিকরা হোটেল থেকে দেখতে পেয়েছেন, পূর্ব পাকিস্তানি বিদ্রোহীদের সমর্থনকারী নিরস্ত্র বেসামরিক লোকজনকে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা গুলি করছে। করাচির উদ্দেশে সাংবাদিকদের উড়োজাহাজে তোলার আগে নিউ ইয়র্ক টাইমসের সংবাদদাতা সিডনি শনবার্গসহ অন্য সাংবাদিকদের তল্লাশি চালানো হয়। তাদের নোটবই, ছবির ফিল্ম ও ফাইল বাজেয়াপ্ত করা হয়।

বহিষ্কৃত সাংবাদিকরা যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্স, জাপান, রাশিয়ার সংবাদপত্রসহ অন্যান্য গণমাধ্যমে কর্মরত।

ঢাকায় অবস্থানকালে সাংবাদিকদের সংবাদ পাঠাতে বা কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

সিডনি শনবার্গ বলেছেন, যখন সাংবাদিকদের আবাসন ইন্টারকন্টিনেন্টাল এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেলকে জিজ্ঞেস করা হয়, বিদেশি সাংবাদিকদের কেন চলে যেতে হবে? তিনি জবাবে বলেন, ‘সেটা আমাদের ব্যাখ্যা করার কথা নয়, এটা আমাদের দেশ।’

তারপর তিনি ঘুরে তাকালেন এবং অবজ্ঞার হাসি হেসে বললেন, ‘আমরা চাই আপনারা চলে যান। এখানে থাকাটা আপনাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। ব্যাপারটা হবে খুব রক্তাক্ত।’

দ্য টাইমসের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এএম রোজেনথাল প্রতিবাদ জানিয়ে পাকিস্তান সরকারের কাছে একটি টেলিগ্রাম পাঠান :

‘ঢাকা থেকে নিউ ইয়র্ক টাইমসের সংবাদদাতা সিডনি শনবার্গ এবং আরও ৩০ জন বিদেশি সংবাদদাতা বহিষ্কারের অপ্রত্যাশিত ও নজিরবিহীন ঘটনায় আমরা বিস্মিত। এটি আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

‘শনবার্গ ও অন্যদের ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে হুমকির মুখে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে এবং তাদের জানানো হয়েছে যে সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য তারা যদি হোটেল ভবনের বাইরে যান, তাহলে তাদের গুলি করা হবে।

‘শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকদের সব কাগজপত্র ও ফিল্ম বাজেয়াপ্ত করে তাদের বের করে দেওয়া হয়। আমাদের কি বিশ্বাস করতে হবে যে এটা সামরিক কর্তৃপক্ষের একটি ভুল মাত্র? আমরা বিশ্বাস করি, আপনাদের সরকার অবিলম্বে এ ভুল শোধরানোর ব্যবস্থা নেবে।’

একটি সত্য স্বীকার করতেই হবে যে, কোনো সংবাদপত্রের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি সহায়ক না হন তাহলে এককভাবে কোনো বিদেশি সংবাদদাতার পক্ষে একটি আন্দোলনের প্রতি সমর্থনসূচক সংবাদ বারবার প্রকাশ করা সম্ভব নয়। শুধু সিডনি শনবার্গ প্রেরিত সংবাদগুলোও যদি বিবেচনা করা হয়, আমাদের এ স্বীকৃতি দিতেই হবে আব্রাহাম মাইকেল রোজেনথালের সক্রিয় সমর্থন ছাড়া তা কখনো সম্ভব ছিল না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত