ময়নাতদন্তের দুই বছর পর প্রতিবেদন: দেরির কারণ খুঁজছে মানবাধিকার কমিশন

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০৩:৩৬ পিএম

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হওয়া চিত্র পরিচালক রফিক সিকদারের মা রওশন আরার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেতে দুই বছর সময় লাগার কারণ তদন্ত করছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।

বিষয়টি তদন্তে বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদের কার্যালয়ে যান মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) আল মাহমুদ ফায়জুল কবীর ও উপপরিচালক এম রবিউল ইসলাম।

ময়নাতদন্তের ২ বছর পর প্রতিবেদন জমা দেওয়ায় ভুক্তভোগীর পরিবারের মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক।

এক ঘণ্টা বৈঠকের পর বেরিয়ে যাওয়ার সময় মানবাধিকারের পরিচালক আল মাহমুদ ফায়জুল কবীর বলেন, “২০১৮ সালের ৩ নভেম্বর ময়নাতদন্তের জন্য মৃতদেহটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে আসে। আর সেই মৃতদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন শাহবাগ থানায় পাঠানো হয় গত মাসের ৭ তারিখ। অথচ ১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর মধু নামে এক নারীর ময়নাতদন্তের পর প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয় ১৯ সালের ২১ জুলাই। এখানেই দেখা যায় রওশন আরার মৃতদেহের পর ময়নাতদন্ত করা লাশেরও প্রতিবেদন পেয়ে যায় অনেক আগে।”

“কিন্তু রওশন আরার প্রতিবেদন পেতে ২ বছরেরও বেশি সময় লেগেছে। আমরা ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললাম। তিনি বলছেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পুলিশের এখানে এসে তদবির করে নিয়ে যেতে হয়। তা ছাড়া প্রতিবেদনটি মিসিং হওয়া সম্ভাবনা থাকে। আমরা তদন্ত করে দেখছি পুলিশ কেনইবা এত দিন প্রতিবেদনটি নিল না, আর ফরেনসিক বিভাগই কেন নিজ দায়িত্বে পাঠালেন না। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনটি দিতে সিরিয়াল মেইনটেন হয় নাই। ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকদের ব্যাখ্যাটাও আমরা বিবেচনা করবো, দেরি হওয়ার কারণ থানা-পুলিশের নাকি ফরেনসিক বিভাগের তাও খতিয়ে দেখবো।”

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেতে তদবির কেন করতে হবে? জবাবে মানবাধিকার পরিচালক বলেন, “এটা ওনাদের বক্তব্য, এটা সরকারি বিধিমালা বা কোনো নিয়ম নেই। সরকারি কোনো কাজ রিসিভ করলে তা প্রেরণের দায়িত্ব তার। প্রাথমিকভাবে ফরেনসিক বিভাগ ওনাদের লোকবলের দোহাই দিচ্ছে। আমরা সবকিছুই তদন্ত করে দেখবো। মৃত নারীর ছেলে আমাদের কাছে তার জবানবন্দিতে বলেছেন তিনি বারবার ফরেনসিক বিভাগে এসেছেন। কিন্তু বিভিন্ন অজুহাত দেখানো হয়েছে তাকে। আমরা আগামী রবি বা সোমবার শাহবাগ থানায় যাবো, থানা-পুলিশের বক্তব্যও শুনবো যে ওদেরও প্রতিবেদনটি নিতে কেন দেরি হলো। প্রতিটা সরকারি কাজে প্রতিবেদন, চিঠি যথা সময়ে পাওয়ার অধিকার প্রতিটা নাগরিকের রয়েছে, এই ভুক্তভোগীর পরিবার যেহেতু যথা সময়ে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনটি পায়নি তাহলে অবশ্যই এখানে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে বলে আমি প্রাথমিকভাবে মনে করছি।”

এ বিষয়ে ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, “রিপোর্ট দিতে আমাদের চেষ্টায় কোনো ত্রুটি ছিল না। ডা. কবির সোহেল, ডা. প্রদীপ বিশ্বাস ও আমিসহ তিন সদস্য কমিটি করে রওশন আরার মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করি। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে ডা. কবির সোহেল বরিশাল বদলি হয়ে যায়। আর হিস্টোপ্যাথলজি থেকে রিপোর্ট আসতে ১ বছর দেরি হয়। হিস্টোপ্যাথলজি থেকে রিপোর্ট আসতে দেরি হওয়ায় আমাদের প্রতিবেদনটি দেরি হয়। এ ছাড়া নিয়ম অনুযায়ী আমরা প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করে রেখেছি, পুলিশ আসার পর তাদের কাছে দিয়েছি।”

ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, “রওশন আরার মৃতদেহটি আমাদের কাছে যখন আসে ময়নাতদন্ত শেষে আমরা মৃতের পরিবার ও সাংবাদিকদের ব্রিফিংও করেছিলাম। মৃতদেহে কী কী পাওয়া গেছে ও কী কী পাওয়া যায়নি তা আমরা সবাইকে জানিয়েছি। মৃতদেহে আমরা একটি কিডনিও পাইনি। আমরা যদি মিডিয়ার সামনে তখনই সব বলে দিতে পারি তাহলে আমাদের এখানে লুকানোর কী থাকবে। আমি মনে করি আমাদের দেওয়া রিপোর্ট সংক্রান্ত কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না, তবে সমস্যা এটা হতে পারে যে রিপোর্ট দিতে দেরি হয়েছে। এখানে আমাদের বিভাগে লিমিটেশন আছে, এখানে আমরা সারা দেশের ময়নাতদন্ত করি। রিপোর্ট দিই। ছাত্রদের পড়াতে হয়, পরীক্ষা নিতে হয়। সারা দেশে কোর্টে গিয়ে আমাদের বিভাগের চিকিৎসকদের সাক্ষী দিতে হয়। অল্পসংখ্যক লোক দিয়ে কাজ করি।”

মৃত নারীর ছেলে বারবার ফরেনসিক বিভাগে ঘুরেও প্রতিবেদন পাননি— এই বিষয়ে বলেন, “আমরা রিপোর্টটি পুলিশের কাছে দিই। পরিবারের কাছে দিই না। সব মিলিয়ে এই রিপোর্টের বিষয়ে আমাদের কোনো গাফিলতি ছিল না, সিস্টেমের জন্য দেরি হয়ে গেছে। হিস্টোপ্যাথলজি পেতে দেরি হওয়া, ডাক্তার বদলি হয়ে যাওয়া ও পুলিশ রিপোর্টটি নিতে দেরি করে ফেলছে।”

ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, “এই রকম সমস্যা সমাধানে আমাদের আধুনিক ফরেনসিক ল্যাব করতে হবে, এমনটি করতে পারলে ২ থেকে ৪ মাসের মধ্যে যে কোনো ময়নাতদন্ত রিপোর্ট চলে আসবে। আমিই আমার বিভাগে একসঙ্গেই ভিসেরা, হিস্টোপ্যাথলজিসহ সব টেস্ট করতে পারবো। তাহলে রিপোর্টটিও আরও অথেনটিক হবে।”

রিপোর্টের বিষয়ে বলেন, “মৃতদেহে ময়নাতদন্তে দুইটা কিডনির অস্তিত্ব ছিল, সার্জিক্যালি অ্যাবসেন্স ছিল কিডনি ২টা। মাথায় টিউমার ছিল। টিউমারটি আমরা হিস্টোপ্যাথলজিতে পাঠিয়ে ছিলাম। ভিসেরা সংগ্রহ করেছিলাম। ওই নারীর হার্ট সাধারণ আকারের চাইতে বড় পেয়েছি। প্রতিবেদনে আমরা উল্লেখ করেছি ‘সার্জিক্যালি বোথ কিডনি অ্যাবসেন্স’।”

২০১৮ সালে বিএসএমএমইউর ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুর রহমান দুলালের অধীনে চিকিৎসাধীন রওশন আরার মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে তার ছেলে রফিক সিকদার অভিযোগ করে, মায়ের দুটি কিডনিই তাদের না জানিয়ে কেটে ফেলা হয়েছে। এ অভিযোগে পুলিশ মৃতদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। তদন্তের পর ডা. সোহেল মাহমুদও জানান, রওশন আরার দুটি কিডনিই নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত