দেশে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে ২৪ শতাংশ। সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থা নারীর প্রতি সহিংসতার এমন তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করেছে। যদিও চলতি বছরের বেশিরভাগ সময়ই বাংলাদেশ করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত ছিল। বৈশ্বিক এই মহামারীর সময়ও ভয়ংকরভাবে নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সমীক্ষায় এটাই উঠে এসেছে। বিষয়টি অবশ্যই দুর্ভাগ্যজনক, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আমাদের দেশে নানাবিধ কারণে ধর্ষণ, নারীর প্রতি সহিংসতাসহ নানাবিধ অপরাধ ক্রমবর্ধমান। দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এর নানাবিধ কারণও বিদ্যমান। এসব কারণের অন্যতম পারিবারিক সুশিক্ষার অভাব, সমাজে উত্তম নীতি ও আদর্শের যথাযথ মূল্যায়ন না থাকা, ক্ষেত্রবিশেষ নারীর অমর্যাদাকর উপস্থাপনা, বিচারহীনতা ও অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় ইত্যাদি। দেশে নানাবিধ অপরাধ প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণ বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। যা উদ্বিগ্ন করে তুলেছে দেশের সচেতন মানুষকে। নারীর প্রতি সহিংসতা বর্বরতা ছাড়া আর কিছুই নয়। ধর্ষণ হলো, এই বর্বরতার সবচেয়ে কুৎসিততম রূপ। কোনো সভ্য সমাজে ধর্ষণের মতো কুৎসিত কাজ চলতে পারে না। তবে আশার কথা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে সবাই ধর্ষণের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকটি মামলার রায়ও দেওয়া হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ; এসবের প্রতিকারের উপায়ের কথা ভাবলে প্রথমেই আসে অপরাধীদের কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়টি। এই শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি ব্যাপকভাবে জানাতে হবে। সবাই যদি শাস্তি কার্যকর করার ঘটনা জানতে পারে, তবে সামাজিকভাবে এর প্রভাব সৃষ্টি হবে। সবাই বুঝবে এ ধরনের কাজ করলে কঠিন শাস্তি রয়েছে, তা আর এড়ানো যাবে না।
নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে বহুমুখী কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন। ইসলামের দৃষ্টিতে শারীরিক ও মানসিক যেকোনো ধরনের সহিংসতা হারাম। সহিংসতা সৃষ্টি হওয়ার কারণ ও উপকরণগুলোও হারাম। অন্যসব ধর্মও নারীর প্রতি যেকোনো ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে। নারী যেন কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার না হয় তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ধর্মগুলো বিভিন্ন বিধান দিয়েছে, বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। অথচ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্মের নামে নারীরা নির্যাতিত হয়, সহিংসতার শিকার হয়। এর মূলে রয়েছে পুরুষের নারীকে বশীভূত রাখার অসুস্থ মানসিকতা এবং কখনো কখনো ধর্মের অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহার।
ইসলাম পরিপন্থী এসব বর্বর নির্যাতন বন্ধের উপায় খুঁজে বের করে সমস্যার সমাধানকল্পে ধর্মপ্রাণ জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। ইসলামে নারী নির্যাতন অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং এর প্রতিকারের উপযুক্ত বিধান রয়েছে। ইসলাম নারীর সম্ভ্রমকে শুধু নারীর অধিকার হিসেবেই দেখে না, বরং নারীর মর্যাদাকে পুরো মানবসমাজের পবিত্র সম্পদ হিসেবে দেখে ও তা রক্ষা করাকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করে। কারণ নারী হলো মানবসমাজের সূতিকাগার। নারীই জন্ম দেয় সমাজের শান্তি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের সব কারিগর ও বিধায়ককে। তাই নারীর সম্ভ্রম নষ্টকারী তথা নারী নির্যাতনকারীর জন্য ইসলাম সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান দিয়েছে।
নারীর সর্বোত্তম একটি পরিচয় তিনি মা। আর একটি পরিচয় তিনি মেয়ে। আর একটি পরিচয় তিনি বোন। আরেকটি পরিচয় তিনি স্ত্রী। স্ব স্ব স্তরে সবার নিজস্ব একটি পরিচয়, মর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব ও সীমা রয়েছে। প্রত্যেকে নিজ নিজ সীমার মধ্যে থেকে ইসলামি বিধানমতো জীবনযাপন করলে সমাজে অনাচার এবং নারীর প্রতি সহিংসতা অনেকটাই কমে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধের জন্য ধর্মপালন ও আইন প্রয়োগ ছাড়াও আমাদের প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ করতে পারবে। যার মাধ্যমে নারী পাবে সহিংসতার প্রতিকার। গড়ে উঠবে সহিংসতামুক্ত একটি সুন্দর সমাজ। তাই নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে পরিবার ও সমাজ তথা আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সঙ্গে সহিংসতা প্রতিরোধে নারীদেরও সোচ্চার হতে হবে। নারীদের কথা বলতে হবে নিজের অধিকার আদায়ে। নির্যাতনকারী সমাজের যেই হোক না কেন, জোরালো কণ্ঠে কথা বলতে হবে তাদের বিরুদ্ধে। সচেতন হতে হবে নিজেদের প্রকৃত অধিকার প্রসঙ্গে। সচেতন হতে হবে শিক্ষা ও চিন্তায়। সর্বোপরি নারীকে যখন শুধু নারী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখা হবে তখনই অনেকাংশে কমে আসবে নির্যাতন।
মনে রাখতে হবে, যে সমাজে নারীর মূল্যায়ন হয় না যেখানে নারীর নিরাপত্তা নেই; সেই সমাজ কোনো দিন আদর্শ সমাজ হতে পারে না। সেই সমাজ থেকে আদর্শ মানুষের সৃষ্টি হতে পারে না। নারী নির্যাতকদের সামাজিকভাবে বয়কট করা হয় না বলেই সমাজে ধর্ষক ও নারী নির্যাতক সৃষ্টি হয়। সুতরাং নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনরোধে সামাজিকভাবে সমবেত সোচ্চার হতে হবে। পরিবার থেকে সবাইকে নারীর প্রতি সম্মান-শ্রদ্ধাবোধ শেখাতে হবে।
লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক
