এক লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে দুই বছর সময় লেগে যাওয়ায় বিষয়টিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) আল মাহমুদ ফায়জুল কবীর। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ফরেনসিক বিভাগ পরিদর্শন শেষে এ মন্তব্য করেন তিনি।
২০১৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চার চিকিৎসকের ‘ভুল অস্ত্রোপচারে’ রওশন আরা নামে এক নারী মারা যান। ওই লাশের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট প্রায় দুই বছর পর সম্প্রতি শাহবাগ থানায় জমা দেয় ঢামেক ফরেনসিক বিভাগ। পরে নিহতের ছেলে বাদী হয়ে বিএসএমএমইউর চার চিকিৎসকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে গতকাল ঢামেক ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদের কক্ষে যান কমিশনের পরিচালক আল মাহমুদ ফায়জুল কবীরের নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি দল।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক আল মাহমুদ ফায়জুল কবীর বলেন, ২০১৮ সালের ৩ নভেম্বর রওশন আরার (৫৫) মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। কিন্তু ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন দুই বছর পর গত মাসের ৭ তারিখে শাহবাগ থানায় পাঠানো হয়। অথচ ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর মধু নামে এক নারীর ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয় ২০১৯ সালের ২১ জুলাই। দেখা যায়, রওশন আরার মৃতদেহের পরে ময়নাতদন্ত করেও মধু নামের ওই নারীর ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আগে প্রদান করা হয়। তাহলে রওশন আরার মরদেহের প্রতিবেদন জমা দিতে এত সময় লাগল কেন? এ বিষয়ে ঢামেক ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদের কাছে জানতে চাওয়া হয়। তখন তিনি বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পুলিশ এসে তদবির করে নিয়ে যেতে হয়। তাছাড়া প্রতিবেদনটি মিসিং হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। তাই আমরা তদন্ত করে দেখছি, পুলিশ কেনইবা এতদিন প্রতিবেদনটি নিল না আর ফরেনসিক বিভাগও কেন নিজ দায়িত্বে প্রতিবেদনটি পাঠাল না?
এক প্রশ্নের জবাবে ফায়জুল কবীর বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনটি দিতে সিরিয়াল মেইনটেন হয়নি। ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকদের ব্যাখ্যাও আমরা বিবেচনা করব। দেরি হওয়ার কারণ থানা পুলিশের নাকি ফরেনসিক বিভাগের? ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেতে ফরেনসিক বিভাগ তদবিরের কথা বললেও মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক বলেন, সরকারি কোনো কাজ রিসিভ করলে তা প্রেরণের দায়িত্ব তার। প্রাথমিকভাবে ফরেনসিক বিভাগ লোকবলের দোহাই দিচ্ছে। আমরা সবকিছুই তদন্ত করে দেখব।
তিনি আরও বলেন, মায়ের লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেতে ছেলে বারবার ফরেনসিক বিভাগে এসেছিলেন। কিন্তু তাকে বিভিন্ন অজুহাত দেখানো হয়েছে বলে আমাদের জানিয়েছে। এসব বিষয় জানতে আগামী সপ্তাহে শাহবাগ থানায় যাব। থানা পুলিশের বক্তব্যও শুনব। কেননা প্রতিটি সরকারি কাজে প্রতিবেদন, চিঠি যথাসময়ে পাওয়ার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। এই ভুক্তভোগীর পরিবার যেহেতু যথাসময়ে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনটি পায়নি, তাহলে অবশ্যই এখানে তাদের সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছি।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট দিতে দুই বছরেরও বেশি সময় লাগল কেন এ বিষয়ে ঢামেক ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, রওশন আরার মৃতদেহের ময়নাতদন্ত শেষে তখনই (২০১৮ সালে) আমরা নিহতের পরিবার ও সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেছিলাম। মৃতদেহে একটি কিডনি পাইনি, সেটি তখনই জানিয়েছিলাম। আমরা যদি মিডিয়ার সামনে তখনই সব বলে দিতে পারি, তাহলে আমাদের এখানে লুকানোর কী থাকবে। আমাদের দেওয়া রিপোর্ট সংক্রান্ত কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। শুধু রিপোর্ট দিতে দেরি হওয়াটাই সমস্যা। আমরা এখানে (ঢামেক মর্গে) সারা দেশ থেকে আসা মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করি। রিপোর্ট দিই। ছাত্রদের পড়াতে হয়, পরীক্ষা নিতে হয়। প্রায়ই কোর্টে গিয়ে আমাদের চিকিৎসকদের সাক্ষী দিতে হয়। অল্পসংখ্যক লোক দিয়ে কাজ করি। তাই দেরি হয়। তাছাড়া হিস্ট্রোপ্যাথলজি থেকে রিপোর্ট আসতে এক বছর দেরি হয়েছে। সেখান থেকে রিপোর্ট আসার পরপরই নিয়ম অনুযায়ী আমরা প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করে রেখেছি, পুলিশ আসার পর পুলিশের কাছে দিয়েছি। অনেক সময় পুলিশ বা কোর্ট তাগাদা দেয়, তখন অগ্রাধিকার দিয়ে সেই রিপোর্টটি আগে দেওয়া হয়। আলোচিত কোনো মামলায় পুলিশ রিক্যুইজিশন দেয়, এটিতে থানা পুলিশের কাছ থেকে আমরা লিখিত কোনো রিক্যুইজিশন পাইনি। পুলিশও দেরি করে নিতে এসেছে।
ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, এরকম সমস্যা সমাধানে আমাদের আধুনিক ফরেনসিক ল্যাব করতে হবে, তাহলে দুই থেকে চার মাসের মধ্যে যেকোনো ময়নাতদন্ত রিপোর্ট দিতে পারব। ফরেনসিক বিভাগে একসঙ্গেই ভিসেরা, হিস্ট্রোপ্যাথলজিসহ সব টেস্ট করানো যায়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পুলিশের হাতে দিয়ে থাকি। পরিবারের কাছে নয়। তিনি বলেন, রওশন আরার দুটি কিডনির অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু সার্জিক্যালি অ্যাবসেন্স ছিল। মাথায় টিউমার ছিল। টিউমারটি আমরা হিস্ট্রোপ্যাথলজিতে পাঠিয়েছিলাম। ভিসেরা সংগ্রহ করেছিলাম। ওই নারীর হার্ট স্বাভাবিকের চেয়ে বড় ছিল। প্রতিবেদনে আমরা উল্লেখ করেছি ‘সার্জিক্যালি বোথ কিডনি অ্যাবসেন্স’। তবে রিপোর্টে কোনো মিথ্যার প্রতিফলন হয়নি। আমরা মনে করি, এতে বিচার কাজে কোনো বিঘœ ঘটবে না।
প্রসঙ্গত, দুই বছর পর গত ৭ নভেম্বর রওশন আরার জমা দেওয়া ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতে মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়। খবরটি আমলে নিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন মৃত নারীর ছেলে রফিক সিকদারের বক্তব্য শোনে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
