দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় আশা জাগাচ্ছে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় দ্রুততম সময়ে ফল পাওয়া যায় বলে করোনা রোগী শনাক্তে এটা খুবই সহায়ক হবে বলে আশা করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। আজ শনিবার থেকেই দেশে বিনামূল্যে করোনার অ্যান্টিজেন পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। প্রথম দফায় যেসব জেলায় সংক্রমণ বেশি কিন্তু আরটিপিসিআর পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই, এমন ১০টি জেলায় এ পরীক্ষা চালু হচ্ছে। এসব জেলার সদর হাসপাতালে করোনার উপসর্গ নিয়ে আসা মানুষ পরীক্ষার জন্য নমুনা দিতে পারবে এবং ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই ফল জানতে পারবে। অ্যান্টিজেন পরীক্ষায় যাদের করোনা নেগেটিভ আসবে, তাদের নমুনা আরটিপিসিআর টেস্ট করার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে আর যাদের পজিটিভ আসবে তাদের নিশ্চিতভাবে করোনা আক্রান্ত বলে ধরে নেওয়া হবে। অ্যান্টিজেন পরীক্ষা সরকারিভাবে বিনামূল্যে করা হবে বিধায় সাধারণ মানুষ এ পরীক্ষায় উৎসাহী হবে বলেও আশা করা হচ্ছে। সারা দেশে এভাবে অল্প সময়ে করোনা আক্রান্তদের শনাক্ত করতে পারলে করোনার শীতকালীন দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কেন্দ্রীয় ঔষধাগার ইতিমধ্যেই অ্যান্টিজেন পরীক্ষা শুরুর বিষয়ে সার্বিক প্রস্তুতি শেষ করেছে। প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মকর্তারা জানান, পরীক্ষার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার বায়োসেন্সর কোম্পানির এক লাখ ‘স্ট্যান্ডার্ড কিউ’ কিট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার। আরও এক লাখ কিট আগামী সপ্তাহের মধ্যেই দেশে এসে পৌঁছবে। অবশিষ্ট কিট কেনার প্রক্রিয়াও শেষ হয়েছে। এগুলো শেষ হতে হতে বাকি কিট চলে আসবে। এছাড়া নমুনা সংগ্রহ ও নির্ভুল পরীক্ষার জন্য জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের গত বুধবার রাজধানীতে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। প্রথম দফায় শনিবার থেকে যে ১০ জেলায় অ্যান্টিজেন পরীক্ষা শুরু হচ্ছে সেগুলো হলো গাইবান্ধা, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, যশোর, মেহেরপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, পটুয়াখালী ও সিলেট। ক্রমান্বয়ে ধীরে ধীরে বাকি জেলাগুলোতেও অ্যান্টিজেন পরীক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে এখনই অ্যান্টিজেন পরীক্ষা শুরু হচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন অ্যান্টিজেন টেস্টে কেউ যদি নেগেটিভ হয়, তাকে আরটিপিসিআর টেস্ট করতেই হবে। তাই যেসব জায়গায় আরটিপিসিআর টেস্ট আছে, সেখানে আমরা এখনই অ্যান্টিজেন টেস্ট দিচ্ছি না।
অ্যান্টিজেন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় কোনো ব্যক্তি জীবাণুবাহিত কোনো অসুখে আক্রান্ত কি না। কারোর শরীরে করোনার অ্যান্টিজেন পাওয়া গেলে বুঝতে হবে করোনার ভাইরাস ইতিমধ্যে তার শরীরে প্রবেশ করেছে। কিন্তু সেই ব্যক্তির শরীর করোনার রোগ প্রতিরোধে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারছে কি না, তা দেখার জন্য করা দরকার অ্যান্টিবডি টেস্ট। করোনায় আক্রান্ত অনেকে উপসর্গহীন বলে রোগী জানেনই না যে তার করোনা হয়েছে। কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে হয়তো তিনি ঠিকও হয়ে গিয়েছেন, কিন্তু টের পাননি। তার মানে শরীরে অ্যান্টিজেনের প্রবেশমাত্র দেহ সতর্ক হয়ে গিয়েছে। এ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডি টেস্ট করলে ধরা পড়বে যে, তার শরীরে এ অসুখের অ্যান্টিবডি আছে কি না। প্লাজমা থেরাপির আগেও ডোনারের বা করোনায় আক্রান্ত হয়ে যিনি সেরে উঠেছেন শরীরে কোন মাত্রায় অ্যান্টিবডি রয়েছে, সেটা দেখতেও অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা জরুরি। সেটা দেখেই আক্রান্তের শরীরে প্লাজমা থেরাপি শুরু করা হয়। এসব কারণেই জনস্বাস্থ্যবিদরা অনেক দিন ধরেই সরকারকে অ্যান্টিজেন পরীক্ষার পাশাপাশি অ্যান্টিবডি পরীক্ষা শুরু করার পরামর্শ দিয়ে আসছেন।
করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির বিশেষজ্ঞরাও করোনা শনাক্ত ও করোনার চিকিৎসায় গতি আনতে অ্যান্টিজেন পরীক্ষার পাশাপাশি অ্যান্টিবডি পরীক্ষা চালুর সুপারিশ করেছিলেন। তবে দেরিতে হলেও অ্যান্টিজেন পরীক্ষার শুরুর খবর ইতিবাচক। এ পরীক্ষার আরেকটি সুবিধা হলো এতে অ্যান্টিজেন কিট ছাড়া কোনো বিশেষ ধরনের প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি দরকার হয় না বলে মাঠপর্যায়েই এ পরীক্ষা চালানো সম্ভব। এর ফলে করোনা রোগী শনাক্ত ছাড়াও আরেকটি সুবিধা পাওয়া যাবে। হাসপাতালগুলোতে অন্যান্য সমস্যা নিয়ে চিকিৎসার জন্য আসা রোগীদের বিশেষ করে জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের তাৎক্ষণিক অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করে ফেললে চিকিৎসকরা নিশ্চিত হতে পারবেন যে এই রোগী করোনায় আক্রান্ত কি না। এমনটা ঘটলে নন-কভিড বা সাধারণ হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা সেবায় জটিলতা নিরসন হবে। রোগী করোনামুক্ত হলে তার স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া যাবে। আর যদি রোগী করোনা পজিটিভ হয় তাহলে তাকে করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া যাবে। এমতাবস্থায় করোনা শনাক্তে সারা দেশে অ্যান্টিজেন টেস্টের সুবিধা বিস্তৃত করার পাশাপাশি এ সুবিধাটি সাধারণ হাসপাতালগুলোকেও দেওয়া প্রয়োজন।
