রুপালি পর্দার ‘তিনকন্যা’র পরিবারে বইছে আনন্দের বাতাস। বড় কন্যা সুচন্দা পাচ্ছেন চলচ্চিত্র অঙ্গনের সবচেয়ে বড় সম্মাননা। ২০১৯ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা দেওয়া হবে তাকে। তাই ছোট দুই বোন যারপরনাই আপ্লুত।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ঢালিউড অভিনেত্রী ববিতা বলেন, ‘আমি অত্যন্ত খুশি বড় আপার এই স্বীকৃতিতে। এই পুরস্কার আমিও পেয়েছি কয়েক বছর আগে। তিনি চলচ্চিত্র জগতেও আমার অনেক সিনিয়র। আমার চলচ্চিত্রে আসার পেছনে তার আর দুলাভাই জহির রায়হানের অবদান সবচেয়ে বেশি। চলচ্চিত্র জগতেও তার অবদান কম নয়। ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘মনের মতো বউ’, ‘আলেয়া’, ‘নয়নতারা’, ‘চাওয়া পাওয়া’র মতো বিখ্যাত সিনেমার নায়িকা তিনি। অনেক বড় পরিচালকের সঙ্গে দারুণ সব সিনেমা উপহার দিয়েছেন। তার অভিনয়প্রতিভা নিয়ে আর কী বলব? সে কথা সবাই জানেন। চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও সফল হয়েছেন, ‘হাজার বছর ধরে’র মতো সিনেমা নির্মাণ করেছেন। যদিও তার এই সম্মাননা আরও আগে পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বেটার লেট দেন নেভার। তাই দেরিতে স্বীকৃতি পেলেও আমাদের সবাই ভীষণ আনন্দিত। সবাই দোয়া করবেন আপার জন্য, তিনি যেন সুস্থ ও দীর্ঘজীবী হন।’
বড় বোনের পুরস্কার প্রাপ্তিতে ছোট বোন চম্পার আনন্দ যেন ধরে না। তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার শিল্পীজীবনকে পূর্ণতা দেয়। আমরা তিন বোনই অভিনয়ের জন্য এই পুরস্কার পেয়েছি অনেকবার। কিন্তু আজীবন সম্মাননা তো একবারই পাওয়া যায়। বড় দুই বোনই পেলেন, আমি খুব খুশি। তাদের দেখানো পথে হেঁটেই আজকের চম্পা হয়েছি। তারাই আমার সত্যিকারের আইডল। সুচন্দা আপার এই পুরস্কার শুধু তার একার নয়, আমাদের পুরো পরিবারের। সবাই আপার জন্য দোয়া করবেন, যেন সুস্থ ও সুন্দর থাকেন।’
সুচন্দা অবশ্য বিষয়টিকে একটু আলাদাভাবে দেখছেন। তিনি বললেন, ‘এতদিন অনেকে প্রশ্ন করত, আপনাকে কেন আজীবন সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে না? তখন প্রায়ই মনে হতো, আমি কি তাহলে চলচ্চিত্র অঙ্গনে কোনো অবদান রাখতে পারিনি! অবশেষে এই প্রশ্নের মুখোমুখি আমাকে আর হতে হবে না। আমার অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এটাই আনন্দের।’
তবে এখনকার চলচ্চিত্র জগত নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত। বলেন, ‘যে চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য সম্মাননা পেলাম, সেই চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিই এখন ভালো নেই। তবে আমি নিরাশ নই। পরাধীন দেশে থেকেও আমরা যদি চলচ্চিত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, মানুষের ভালোবাসা আদায় করতে পারি, তাহলে কেন স্বাধীন দেশে পারব না। চলচ্চিত্রে এখন সমিতির নামে দলাদলি বন্ধ করতে হবে। প্রকৃত শিল্পীদের কাজের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে হবে, উৎসাহ দিতে হবে, অনুপ্রাণিত করতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’
বাংলাদেশের সিনেমা তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে কীভাবে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা একক ব্যাপার নয়। শুধু ভালো ছবি বানালেই চলবে না। ভালো প্রেক্ষাগৃহ লাগবে। সাধারণ মানুষের যে আগ্রহ মরে গেছে, সেটাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। আর মেয়ে দর্শকেরা হলে যেতে না পারলে সিনেমার উন্নতি হবে না।’
চলচ্চিত্র থেকে অনেক বছর দূরে আছেন সুচন্দা। কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিনয় করার কোনো পরিস্থিতিই তো নেই। এখন তো আমি নায়িকার চরিত্র করতে পারব না। করতে হবে সিনেমার অন্য কোনো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কিন্তু এখন কি কোনো সিনেমার গল্পে সে রকম চরিত্র রাখা হয়? তাহলে কীভাবে কাজ চালিয়ে যাব?’ তিনি আরও বলেন, ‘অভিনয়ের সুযোগের অভাব শুধু নয়, আমি নিজেকে অন্যদিকে নিয়ে গেছি। যখন নায়িকা ছিলাম তখন চলচ্চিত্রের সোনালি যুগ ছিল। অনেক ক্ল্যাসিক সিনেমা করেছি। পাকিস্তানি সিনেমার সঙ্গে পাল্লা দিয়েছি। একটা সময় মনে হলো আমিও চলচ্চিত্র পরিচালনা ও প্রযোজনা করব। পাকিস্তানি আমল থেকেই প্রযোজনা শুরু করি। প্রযোজক মানে শুধু টাকা লগ্নি নয়, দর্শক কী ধরনের সিনেমা পছন্দ করেন, আমি দর্শককে কী ধরনের সিনেমা দেখাব, এসব জ্ঞান থাকতে হয়। নয়ত চলচ্চিত্র জগত টিকে থাকে না। এখন এ ধরনের লোকের অভাব।’
সুচন্দা অভিনীত ‘হাজার বছর ধরে’ সিনেমাটি বেশ কয়েকটি শাখায় জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। এরপর আর তাকে পরিচালনায় পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ‘ইচ্ছে ছিল পরিচালনায় নিয়মিত হব। হাজার বছর ধরে সরকারি অনুদানের সিনেমা। এ সিনেমা দিয়ে আমি শিখিয়েছি কীভাবে সরকারি অনুদানের সিনেমা প্রপারলি করতে হয়। এরপর জহির রায়হানের বিখ্যাত উপন্যাস বরফ গলা নদীর চিত্রনাট্য সরকারি অনুদানের জন্য জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু তখন বলা হয়, একবারের বেশি সরকারি অনুদান পাওয়া যায় না। কিন্তু এখন তো অনেকে প্রায় প্রতি বছর পাচ্ছেন! যাই হোক, এই সিনেমাটি নির্মাণ করা আমার একটি স্বপ্ন। সরকারি অনুদান না পেলেও এটি আমি দর্শককে দেখাব ইনশাআল্লাহ।’
এখন সময় কীভাবে কাটে? সুচন্দা বলেন, ‘আমার ছোট্ট জগত আছে। ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি সবাই দেশে থাকে। তারা বিদেশ পছন্দ করে না স্থায়ীভাবে থাকার জন্য। তাদের সঙ্গেই আমার দিব্যি মজার সময় কেটে যায়। এখন তো করোনা, স্বাভাবিক সময়ে আমি কিছু সামাজিক উন্নয়নমূলক সংঠনের জন্য কাজ করতাম। এসব করেই সময় পার হয়।’
