ছেলের সামনে কারাফটকে মা-বাবার বিয়ে

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২০, ০২:০৬ এএম

শনিবার, বেলা প্রায় সাড়ে ১১টা। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত একটি নসিমন এসে থামে। বাহনটির ১৪ যাত্রীকে এক এক করে কারা ফটকে ঢোকানো হয়। কারা তত্ত্বাবধায়কের নির্দেশে তাদের বসানো হয় তারই কার্যালয়ে। এর কিছুক্ষণ পরেই সেখানে ঘটে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ধর্ষণ মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামির সঙ্গে বিয়ে হয়েছে ভুক্তভোগী নারীর। ওই কারাগারে এমন বিয়ের ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। শুধু তাই নয়, গতকাল শনিবারের এই বিয়েতে উপস্থিত ছিল বর-কনের ৮ বছরের ছেলেও!

ধর্ষণ মামলার আসামি ও ভুক্তভোগীর মধ্যে বিয়ের আয়োজন করতে রাজশাহী কারাগারের তত্ত্বাবধায়কের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। গত ২২ অক্টোবর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। বিয়ের পর সে বিষয়ে ৩০ দিনের মধ্যে লিখিতভাবে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। আদালত উভয়পক্ষের সম্মতিতে এ আদেশ দেয়। তারই প্রেক্ষিতে কারা কর্র্তৃপক্ষ আট বছর ধরে কারাবন্দি দিলীপ খালকো (৩০) ও ভুক্তভোগী ওই নারীর (২২) বিয়ে সম্পন্ন করে গতকাল।

কনেসহ দুই পরিবারের সদস্যরা কারাগারে আসার আগেই উপস্থিত ছিলেন হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রার কৃষ্ণা দেবী এবং পুরহিত পরিমল চক্রবর্তী। কনেপক্ষ আসার পর কারাগার থেকে বর দিলীপ খালকোকে আনা হয়। তারপর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার সুব্রত কুমার বালার উপস্থিতিতে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সিনিয়র জেল সুপার কনেকে একটি নতুন শাড়ি উপহার দেন। দুই পরিবারের সবাইকে মিষ্টিমুখ করান।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে দিলীপ বলেন, বিয়ে করে ভালোই লাগছে। সবাই দোয়া করবেন। যেন সুখে-শান্তিতে সংসার করতে পারি।

আর কনেও বাকি জীবনটা ভালোভাবে যেন কাটাতে পারেন সেই দোয়া চান।

সিনিয়র জেল সুপার সুব্রত কুমার বলেন, উচ্চ আদালত আমাদের দিলীপের বিয়ে সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে। তিন দিন আগে আদেশের কপি পাওয়ার পরই দুইপক্ষকে ডাকি। সুষ্ঠুভাবে বিয়েও সম্পন্ন হলো। এখন যত দ্রুত সম্ভব বিয়ের কাগজপত্র উচ্চ আদালতে পাঠানো হবে।

দিলীপ কুমার এবং ভিকটিম সম্পর্কে খালাতো ভাই-বোন। তাদের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ২০১১ সালে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। কিন্তু ওই ব্যক্তি বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানালে ওই বছরের ২৫ অক্টোবর গোদাগাড়ী থানায় মেয়েটি ধর্ষণের মামলা করেন। মামলায় আসামির বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি রাজশাহীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠন করা হয়। বিচার শেষে ওই বছরের ১২ জুন ওই ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে আদালত। রায়ে বলা হয়, যখন ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, তখন ওই মেয়ের বয়স ছিল ১৪ বছর। সেই বয়সেই তার কোলে আসে পুত্র সন্তান। মেয়েটির আর পড়াশোনা করা হয়নি। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা মেয়েটি কৃষিশ্রমিক হিসেবে নতুন জীবন শুরু করে। দিনে দিনে বড় হতে থাকে তার সন্তান। দিলীপেরও আট বছর জেল খাটা হয়ে গেছে। এতদিন পর দুই পরিবারের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। কনের সম্মতিতেই আদালত তাদের বিয়ের আদেশ দেয়। এখন বিয়ের কাগজপত্র উচ্চ আদালতে গেলে জামিন পেতে পারেন দিলীপ খালকো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত