করোনার তান্ডবে বিপর্যস্ত পৃথিবী। এ মহাদুঃসময়ে আশার শুভবার্তা নিয়ে এসেছে করোনা ভ্যাকসিন বা টিকা। ইতিমধ্যেই গোটা তিনেক ভ্যাকসিন সাধারণ মানুষকে দেওয়া শুরু হয়েছে। আরও কয়েকটি চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিকে। তারপরও করোনা ভ্যাকসিনের নানা বিষয় নিয়ে মানুষের মনে বিভিন্ন প্রশ্নের উদয় হচ্ছে। এর আগে অন্যসব রোগ প্রতিরোধে যে ভ্যাকসিনগুলো মানুষকে দেওয়ার জন্য অনুমোদিত হয়েছে সেগুলো তৈরি করতে পাঁচ থেকে দশ বছর সময় লেগেছিল। ভ্যাকসিনের দুটো দিক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো মানবদেহে এর কাক্সিক্ষত কার্যকারিতা। অন্যটি হচ্ছে ভ্যাকসিনটিকে অবশ্যই নিরাপদ হতে হবে। এ দুটো বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বিজ্ঞানীরা গবেষণার কতগুলো ধাপ ঠিক করেছে। সেগুলো সম্পন্ন করতে অনেক সময় লেগে যায়। কিন্তু কভিড-১৯ মহামারীর কালে দ্রুত ভ্যাকসিন দরকার। তাই বিজ্ঞানীরা ৫-১০ বছরের সময়কালটিকে কমিয়ে ১২ থেকে ১৮ মাসে পুনর্নির্ধারণ করেছেন। এভাবে এখন করোনা ভ্যাকসিন অতি অল্প সময়ে তৈরি হয়েছে। এজন্য এ ভ্যাকসিন নিয়ে মানুষের মনে বেশকিছু প্রশ্নের উদয় হয়েছে। আমরা এখানে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করব।
এক. করোনাভাইরাস ঘন ঘন রূপান্তরিত হয়। রূপান্তরিত সব ভাইরাসের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন কার্যকর হবে কি?
: গবেষণায় দেখা গেছে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের যেসব রূপান্তর হয়েছে সেসবগুলোতে ভাইরাসের মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রয়েছে। বর্তমানে সবগুলো রূপান্তরিত ধরনের ওপর উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনগুলো শতভাগ কার্যকর বলে প্রমাণিত। তবে ভবিষ্যতে করোনাভাইরাসের কোনো রূপান্তরিত রূপ বা ভ্যারিয়েন্ট এখনকার সব ভ্যাকসিন প্রতিরোধী হয়ে উঠবে কি না সেটা এখনই বলা সম্ভব নয়। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
দুই. ভ্যাকসিন যেভাবে তৈরি হয়েছে তাতে এটি গ্রহণ করলে মানুষের শরীরে কভিড-১৯ অথবা কভিড-১৯-এর উপসর্গ তৈরি হবে কি?
: এর উত্তর হচ্ছে প্রথাগত পদ্ধতিতে তৈরি ভ্যাকসিনে এমনটা হবে না। কারণ এ পদ্ধতিটি দীর্ঘ পরীক্ষিত। দ্বিতীয়ত দুটো পদ্ধতিতে তৈরি ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের কোনো পর্যায়ে এরকম কোনো লক্ষণ দেখতে পাওয়া যায়নি। তাই এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ভ্যাকসিন নিলে কারও করোনা রোগ বা রোগের লক্ষণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
তিন. করোনা আক্রান্ত কেউ কি ভ্যাকসিন নিতে পারবে?
: করোনা আক্রান্ত বা করোনাভাইরাসবাহী ব্যক্তি ভ্যাকসিন নিতে পারবে। ভাইরাস প্রবেশ করলে বা করোনা আক্রান্ত হলে ব্যক্তির শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। ভাইরাসটিকে বডি (নড়ফু) বললে এটিকে প্রতিরোধ করতে শরীরের ভেতর যে বস্তুটি তৈরি হয় তাকে বলা হয় অ্যান্টিবডি (ধহঃরনড়ফু)। প্রবেশের পর শরীরের ভেতর ভাইরাসের সঙ্গে অ্যান্টিবডির যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধে অ্যান্টিবডি জিতে গেলে ব্যক্তিটি করোনা থেকে মুক্ত হয়। ভ্যাকসিনের কাজ হলো শরীরের ভেতর অ্যান্টিবডি তৈরি করা। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ভ্যাকসিন দিলে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। এ ভ্যাকসিনের অ্যান্টিবডি আগের অ্যান্টিবডির (করোনাভাইরাসের কারণে যেটি তৈরি হয়ে আছে) সঙ্গে মিলে করোনাকে দ্রুত পরাস্ত করে ফেলবে। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি তাড়াতাড়ি করোনামুক্ত বা সুস্থ হয়ে উঠবে। তবে এ বিশ্লেষণটি পুরোপুরি তত্ত্বভিত্তিক। প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্তের জন্য করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ভেক্টরভিত্তিক এবং ‘এমআরএনএ’ উভয় ধরনের ভ্যাকসিনের গ্রহণযোগ্য আকৃতির ট্রায়াল হতে হবে। প্রাপ্ত উপাত্তের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এরকম কোনো ট্রায়াল পরিচালিত হয়নি।
চার. করোনাজয়ী ব্যক্তির শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে তাকে কি ভ্যাকসিন দেওয়া হবে? হলে কেন?
: করোনা থেকে সুস্থ হওয়া ব্যক্তিকে ভ্যাকসিন দেওয়া যাবে। করোনাভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় তার নাম ‘মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি’। এটি করোনাভাইরাসকে প্রতিরোধ করে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এ অ্যান্টিবডিটি শরীরে সর্বোচ্চ ছয় মাস থাকে। ভ্যাকসিন নেওয়ার ফলে তৈরি হয় ‘স্পাইক’ অ্যান্টিবডি। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এটি শরীরে কমপক্ষে ১২ মাস থাকে। ভ্যাকসিন নিলে দুই ধরনের অ্যান্টিবডি দ্বারা শরীর সুরক্ষিত থাকবে। মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি কমে গেলেও স্পাইক অ্যান্টিবডি শরীরকে সুরক্ষা দেবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও বিস্তর গবেষণা করতে হবে। কেননা এখন পর্যন্ত করোনাজয়ীদের ওপর ভ্যাকসিনের কোনো ট্রায়াল হয়নি।
পাঁচ. সজঘঅ ভ্যাকসিন নিলে শরীরের উঘঅ এর পরিবর্তন হবে কি?
: ডিএনএ জীবদেহের গঠন ও ক্রিয়াকলাপের জিনগত বা জিনেটিক নির্দেশ ধারণ করে। জেনেটিক প্রযুক্তিতে তৈরি হলেও এমআরএনএ-ভ্যাকসিন শরীরের ডিএনএ’র ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। বর্তমান বা আগের কোনো গবেষণায় এরকম কোনো প্রমাণ বা ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। করোনা ভ্যাকসিন তৈরির অনেক আগে থেকেই এমআরএনএ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলে আসছে।
ছয়. শিশু ও গর্ভবতী নারীরা ভ্যাকসিন নিতে পারবে কি?
: এখনো পর্যন্ত উদ্ভাবিত কোনো করোনা ভ্যাকসিনের ট্রায়াল বা পরীক্ষা শিশু ও গর্ভবতী নারীর ওপর করা হয়নি। ইতিমধ্যে ভ্যাকসিন উদ্ভাবকদের কেউ কেউ এ ধরনের ট্রায়ালের ঘোষণা দিয়েছে। এসব ট্রায়ালের ফলাফল আসা পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে গর্ভবতী নারী ও শিশুকে ভ্যাকসিন দেওয়া নিরাপদ হবে কি না।
সাত. বৃদ্ধদের ওপর ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কেমন হবে?
: সাধারণভাবে যেকোনো ভ্যাকসিন বয়স্ক মানুষের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরিতে কম কার্যকর হয়। করোনা ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে অনুরূপ ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। ৬৫ বছরের বেশি বয়স্ক মানুষদের নিয়ে আরও বিস্তৃত ট্রায়াল সম্পন্ন করার পরই শুধু বলা যাবে করোনা ভ্যাকসিন বয়স্কদের ওপর কতটা কার্যকর হবে। তবে কোনো কোনো উদ্ভাবক প্রতিষ্ঠান বলেছে তাদের ভ্যাকসিন বয়স্কদের শরীরেও সমান কার্যকর। এর ওপর ভিত্তি করে কোনো কোনো দেশে বয়স্কদের ভ্যাকসিন প্রদানের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আট. ভ্যাকসিনের প্রয়োজনীয় ডোজ নেওয়ার পরও কেউ কি করোনা ছড়াতে পারে?
: করোনা ভ্যাকসিনের প্রয়োজনীয় ডোজ নেওয়ার পর ব্যক্তির শরীরে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হবে। এতে তার শরীরে ভাইরাস প্রবেশ করলেও সে উপসর্গবিহীন থাকবে। ক্ষেত্রবিশেষে অতিমৃদু লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। কিন্তু উভয় অবস্থাতেই তার দ্বারা ভাইরাস চারপাশে ছড়াবে। তাই বলা যায় ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও একজন ব্যক্তি ভাইরাস ছড়াতে পারে।
নয়. আর কতদিন মাস্ক পরতে হবে? স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে?
: আমরা জানি ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও একজন ব্যক্তি ভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই ভ্যাকসিন পেয়েছে এবং পায়নি এমন সবাইকে মাস্ক পরতে হবে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তবে দেশের ৭০-৮০% মানুষের ভ্যাকসিন নেওয়া সম্পন্ন হলে তখন আর স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রয়োজন থাকবে না। কোনো জনগোষ্ঠীর ৭০%-এর বেশি মানুষ বিশেষ একটি সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন হলে তখন পুরো জনগোষ্ঠীটি ওই রোগটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠে। একে বলা হয় ‘গোষ্ঠী প্রতিরোধ’ বা ‘হার্ড ইমিউনিটি’ (Herd Immunity)।
দশ. ভ্যাকসিন নেওয়ার পর অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না সেটা কি টেস্ট করে বোঝা যাবে?
: করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। সেটা শনাক্ত করার জন্য অ্যান্টিবডি টেস্ট করা হয়। এই জাতীয় টেস্ট দ্বারা নিউক্লিওক্যাপসিড অ্যান্টিবডি শনাক্ত করা যায়। কিন্তু ভ্যাকসিন শরীরের ভেতর স্পাইক অ্যান্টিবডি তৈরি করে। সাধারণ অ্যান্টিবডি টেস্ট দিয়ে স্পাইক অ্যান্টিবডি শনাক্ত করা যায় না। তাই ভ্যাকসিন নেওয়ার পর সাধারণ অ্যান্টিবডি টেস্ট করলে তার ফল নেগেটিভ বা নেতিবাচক হবে।
করোনাভাইরাসের বৈশিষ্ট্য, বিশেষ করে এর পরিবর্তনশীল স্বভাবের বিষয়ে এখনো অনেক কম জানা গেছে। অন্যদিকে সদ্য উদ্ভাবিত করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে শত প্রশ্ন রয়েছে। সেগুলোর প্রমাণনির্ভর কোনো উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। এজন্য নানা ধরনের আরও ট্রায়াল হতে হবে এবং আরও বহুমাত্রিক গবেষণা পরিচালনা করতে হবে। সেসবের প্রাপ্ত ফলাফল থেকে ক্রমান্বয়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর বেরিয়ে আসবে।
লেখক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
