করোনাভাইরাসের সংক্রমণে অন্যান্য খাতের মতো বিনিয়োগেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (বিডা) নিবন্ধিত শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবে ধস নেমেছে। চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বিডায় বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে প্রায় ৯৩ শতাংশ। একই সময়ে স্থানীয় বিনিয়োগ প্রস্তাবও আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। তবে করোনা সংক্রমণের শুরুর অবস্থা থেকে বর্তমানে স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়তে দেখা গেছে। করোনা সংক্রমণ দীর্ঘায়িত হওয়ায় চলতি বছরের পরবর্তী প্রান্তিকেও বিদেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিডা জানিয়েছে, চলতি বছর জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে নয়টি শতভাগ ও ১১টি যৌথ বিনিয়োগের জন্য মোট ২০টি নিবন্ধিত বিদেশি শিল্পে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে ৪৪টি শতভাগ বিদেশি ও যৌথ বিনিয়োগ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ৪০১ কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে দেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব কমেছে ৯২ দশমিক ৬১ শতাংশ বা ১৬ হাজার ১১৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশে করোনা সংক্রমণের শুরুর সময়কাল থেকে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বিদেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। চলতি বছর এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আটটি নিবন্ধিত শিল্পে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, যা পরবর্তী জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের চেয়ে ৬৯ শতাংশ বেশি।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিদেশি বিনিয়োগের এ নাজুক পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশ নয়, এ মহামারীতে সব দেশেই বিনিয়োগে খরা চলছে। সবাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। দীর্ঘ লকডাউনের কারণে অনেক দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের মুনাফা কমে গেছে; কেউ কেউ বড় লোকসানের মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় কেউ আর অন্য দেশে বিনিয়োগ করছে না। তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। এ অবস্থা কাটতে সময় লাগবে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বিডায় ২১৩টি নিবন্ধিত শিল্প প্রতিষ্ঠানের মোট বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে ১৩ হাজার ৯৫১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। অন্যদিকে ২০১৯ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ২৪৯টি নিবন্ধিত শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে ২০১৯ সালের তুলনায় চলতি প্রথম প্রান্তিকে বিডায় মোট বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে ৭২ দশমিক ১৬ শতাংশ।
অবশ্য বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবে যে হারে ধস নেমেছে, সে তুলনায় স্থানীয় বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। যদিও ২০১৯ সালের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অস্বাভাবিক হারে স্থানীয় বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে। তবে চলতি বছর এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের তুলনায় তা বাড়তে দেখা গেছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি বছর জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে নিবন্ধিত ১৯৩টি স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ১২ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব আসে। যা আগের বছরের একই সময়ে ২০৫টি স্থানীয় শিল্পে বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ ছিল ৩২ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে নিবন্ধিত স্থানীয় শিল্পের বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে ২০ হাজার ৫০ কোটি টাকা বা ৬১ দশমিক ২৮ শতাংশ। তবে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের তুলনায় জুলাই-সেপ্টেম্বর বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব কমলেও স্থানীয় শিল্পে তা বেড়েছে।
করোনা সংক্রমণের কারণে দেশে টানা ৬৬ দিন লকডাউন থাকায় স্থানীয় বিনিয়োগ পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় এ সময় নতুন বিনিয়োগ অনেকটা থমকে দাঁড়ায়। ফলে চলতি বছর এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে স্থানীয় বিনিয়োগের পরিমাণ নেমে আসে মাত্র ১ হাজার ৮২৬ কোটি টাকায়। লকডাউন-পরবর্তীতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে স্থানীয় বিনিয়োগ পরিস্থিতিরও কিছুটা উন্নতি লক্ষ করা যায়। চলতি জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে স্থানীয় শিল্পে বিনিয়োগ প্রস্তাব আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৫৯৩ শতাংশ বা ১০ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা বেড়েছে।
চলতি জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে কেমিক্যাল শিল্প খাতে, যা দেশি-বিদেশি মোট বিনিয়োগ প্রস্তাবের ২৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। এছাড়া শিল্প খাতে ২৬ দশমিক ১ শতাংশ, প্রকৌশল খাতে ১৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ, বিবিধ খাতে ১৬ দশমিক ৯২ শতাংশ, খাদ্য ও অনুষঙ্গ খাতে ৬ দশমিক ২২ শতাংশ, গ্লাস ও সিরামিক ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং সেবা খাতে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এসব শিল্পে মোট ২৬ হাজার ৫০৫ জনের কর্মসংস্থান হবে বলে বিডা জানিয়েছে।
গত ২৯ অক্টোবর জাতিসংঘের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংস্থা-আঙ্কটাডের বিশ্ব বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, করোনাভাইরাসের মহামারীতে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে যে ধস নেমেছে, তার ধাক্কা উন্নত দেশ থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত সব দেশের ওপরই পড়েছে। ২০২০ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) বিশ্বে এফডিআই প্রবাহ কমেছে ৪৯ শতাংশ। এ ছয় মাসে বাংলাদেশে ১১৬ কোটি ৪৩ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছে, যা গত বছর একই সময়ের চেয়ে ১৯ শতাংশ কম।
