একাত্তরের প্রিয় বন্ধু বিবিসির মার্ক টালি

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২০, ০২:০৩ এএম

যা আমাদের অনেকেরই আজানা, তা হচ্ছে একাত্তরের সবচেয়ে প্রিয় ইথার-বন্ধু বিবিসির মার্ক টালির মায়ের জন্ম বাংলাদেশে। তাহলে বাংলাদেশ তার জন্য মাতৃভূমির চেয়ে কম কীসে। তার পূর্বপুরুষ আফিম বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আর মার্ক টালির জন্ম কলকাতায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে বাংলাদেশের মানুষের মতো তারাও স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন। পাকিস্তানে পরিস্থিতি নিয়ে ভাষ্য দিচ্ছেন মার্ক টালি, ব্রিটিশ পত্রপত্রিকায় পূর্বপাকিস্তান পরিস্থিতির সারাংশ উপস্থাপন করছেন মার্ক টালি, পূর্বপাকিস্তান থেকে রিপোর্ট পাঠাচ্ছেন মার্ক টালি।

তিনি ১৯৬৪ সালে বিবিসিতে চাকরি নেন। ১৯৬৫ সালে চলে আসেন দিল্লিতে। ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার সময়টুকু বাদে এখন পর্যন্ত ভারতেই আছেন। তার অবদান বাংলাদেশ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ রেখেছে। ঢাকা থেকে পাঠানো তার একটি প্রতিবেদন এবং বুশ হাউজ লন্ডন থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত একটি ভাষ্যের অনুবাদ উপস্থাপন করা হলো।

ঢাকা থেকে প্রতিবেদন

১ জুলাই, ১৯৭১। ঢাকা ও ঢাকার আশপাশে বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ী, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলোচনার পর এটা আমার কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সর্বশেষ রাজনৈতিক কর্মসূচি পূর্বপাকিস্তানের জন্য আরও হতাশাব্যঞ্জক। যেসব মন্তব্য আমি মানুষের কাছে শুনেছি, তার সারকথা হচ্ছেপ্রেসিডেন্টের ভাষণে পূর্বপাকিস্তানের জন্য কিছুই নেই। অনেকেই মনে করেন পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ এবং সশস্ত্র বাহিনীকে উৎসাহ জোগানোর জন্যই প্রেসিডেন্টের ভাষণটি তৈরি করা হয়েছে। যারা সত্যিই সমস্যার একটি সমাধান খুঁজছিলেনপ্রেসিডেন্টের ভাষণে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের প্রতি নিন্দাসূচক বক্তব্য তাদের হতাশ করেছে। সশস্ত্র বাহিনীর জন্য তার ভূয়সী প্রশংসাকেও ভীষণ সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। প্রেসিডেন্টের ভাষণে ইসলাম ধর্মের ওপর জোরালো বক্তব্য সময়োচিত হয়নি। যেসব হিন্দু এখনো এখানে আছে তা তাদের ভয় বাড়িয়ে দেবে এবং তা নিশ্চয়ই শরণার্থীদের দেশে ফিরে আসতে উৎসাহ দেবে না। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, যুক্তিসঙ্গত কারণেই বাঙালিরা সেনাবাহিনীকে বিশ্বাস করে না। ঢাকা থেকে ৫০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে আটটি গ্রাম ধ্বংস করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সন্দেহাতীতভাবে আবার প্রমাণ করেছে প্রতিহিংসায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ তারা বন্ধ করেনি। সেনা-নির্যাতনের যে গুজব ঢাকা ও চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে সেনাবাহিনী নির্মমভাবে মানুষকে ক্যান্টনমেন্টে ধরে আনছে, তারা আর ফেরত যাচ্ছে না, ধর্ষণ সমানে চলছে, বলপূর্বক অর্থ আদায় ও মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়া অব্যাহত রেখেছেএইসব সেনা-আচরণ সবসময় হাতেনাতে প্রমাণ করা না গেলেও সারা বিশ্বই তাদের এসব অপকর্ম সম্পর্কে অবহিত।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর পক্ষে জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়া অসম্ভব। তাছাড়া আস্থা ফিরে পেতে তাদের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতেও দেখা যাচ্ছে না। রাস্তায় ভীতসন্ত্রস্ত সশস্ত্র পাঞ্জাবি পুলিশের টহল, মাঝেমধ্যে সেনাবাহিনীকে দেখা যায় মেশিনগান উঁচিয়ে টহল দিচ্ছে। টেলিগ্রাফ অফিসে ঢোকার সময় লোকজনকে তল্লাশি করা হচ্ছে, রাস্তাঘাটেও তল্লাশি চলছে। আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে পাছে সেনাবাহিনীর চোখে পড়ে যায়। বাজারে তুলনামূলকভাবে অল্পকিছু চাঞ্চল্য রয়েছে, বাজারে লোকের সংখ্যা আগের চেয়েও অনেক কম আর রাত্রিকালীন রাস্তাঘাট জনশূন্যই থাকছে। অফিসে হাজিরা কিছুটা বেড়েছে, তবে দেখা যাবে হিন্দু কর্মচারীদের কেউই অফিসে ফেরেনি। আসলে সেনাবাহিনী যে ক্ষতিসাধন করেছে তা পূরণের কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। উর্দুভাষী ও বাঙালিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিরোধ অত্যন্ত তীব্র। এ অবস্থায় মূলত পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্কিত একটি সরকার যে জনগণের আস্থা ফিরে পাবে তা একেবারেই অসম্ভব।

ভাষ্য : পাকিস্তানের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমস্যা

৭ জুন ১৯৭১।

রবিবার (৬ জুন) ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছেন, পাকিস্তানের শাসকদের এটি বোঝানো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব যে, সশস্ত্র বলপ্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্রের জন্য মানুষের তাড়নাকে দাবিয়ে রাখা যায় না। এখন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যাটি ভারতের জন্য বৈধ একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চল্লিশ লাখ শরণার্থী এসে গেছে, বিপুল সংখ্যায় প্রতিদিনই আসছেভারতের জন্য অভ্যন্তরীণ হলেও সমস্যাটি অতিকায়। ভারত সরকার মনে করে, যত শিগগির সম্ভব এবং শরণার্থীদের অবশ্যই পূর্বপাকিস্তানে ফিরে যেতে হবে; কারণ এদের স্থায়ীভাবে ঠাঁই দেওয়ার মতো স্থান কিংবা সম্পদ কোনোটিই তাদের নেই। কিন্তু ভারত এটাও মনে করে, যতক্ষণ-না তাদের মনে এই আস্থা জন্মাবে যে, পূর্বপাকিস্তান তাদের জন্য নিরাপদ ততক্ষণ এই শরণার্থীদের ফিরে যেতে রাজি করানো সম্পূর্ণ অসম্ভব।

ভারত সরকার মনে করে শরণার্থীদের স্বদেশে ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্যআন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টির যৌক্তিকতা রয়েছে।

পাকিস্তান সরকার যে সমস্যার মুখোমুখি তা হচ্ছে, কেমন করে পূর্বাঞ্চলে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনবে; প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দু’সপ্তাহ আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, শিগগিরই তিনি বেসামরিক শাসনে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দেবেন। সময় পার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এর মধ্যেও ইসলামাবাদ থেকে কোনো ঘোষণা আসেনি। পাকিস্তান সরকারের অবস্থানটি হচ্ছেগত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ বৈধই রয়েছে। তবে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে যারা অভিযুক্ত তাদের পরিষদের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু সংবাদদাতাদের কাছ থেকে যেসব প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে, তাতে এমন কোনো আশাপ্রদ কিছু মনে হচ্ছে না যে, ইয়াহিয়া খানের প্রস্তাব করা কোনো সমাধানে সমর্থন জোগাতে আওয়ামী লীগের সদস্যরা এগিয়ে আসবেন।

বেসামরিক কোনো সরকারের অধীন সেনাবাহিনী সাময়িকভাবে প্রশাসন চালানোর ভার নিতে পারলেও তা আদৌ সম্ভব হবে কি-নাএ নিয়ে ঘোর সন্দেহ রয়েছে। কারণ সেনাবাহিনীর প্রতি পূর্বপাকিস্তানের জনগণের আদৌ কোনো বিশ্বাস আছে বলে মনে হয় না।

ভারত সরকার এবং বিভিন্ন শ্রেণির লোকজন মনে করে, পাকিস্তানকে সাহায্যদাতা দেশগুলো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে সাহায্য দিতে অস্বীকার করার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যদি-না প্রেসিডেন্ট সন্তোষজনক কোনো রাজনৈতিক সমাধানে উপনীত হন। স্পষ্টতই এ প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় অসুবিধাজনক দিকএখানে অনুমান করা হচ্ছে যে সমস্যাটির একটি সন্তোষজনক সমাধান রয়েছে। দ্বিতীয় অসুবিধাটি হচ্ছে পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে সাহায্য বন্ধ করার মানে কার্যত পূর্বপাকিস্তানকে সাহায্য করা। তৃতীয় অসুবিধাটি হচ্ছেসাহায্যদাতা দেশগুলো উদ্বিগ্ন, সাহায্যকে আবার না রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। তা সত্ত্বেও কোনো সন্দেহ নেই পাকিস্তান সরকারের অন্যান্য কাজের জন্য যেমনপূর্বপাকিস্তানকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিতেও সাহায্যের প্রয়োজন হবে।

যেসব দেশ পূর্বপাকিস্তানের বিষয় নিয়ে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়, সেসব দেশ পাকিস্তানের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা ছাড়া অন্য কিছুই করতে যাবে না। জাতিসংঘও পূর্বপাকিস্তানে ত্রাণ কার্যক্রমকে সহায়তা করা ছাড়া আর কিছু করতে পারছে বলেও মনে হয় না। কাজেই সমস্যাটির যে প্রকৃতি তাতে এটা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নিজেকেই সমাধান দিতে হবে। কিন্তু ইয়াহিয়া খান যদি দ্রুত এ সমস্যা সমাধানে হাত না-দেন তাহলে ভয়ের কথা হচ্ছে ভারত সরকার শরণার্থীর এই চাপ সহ্য করতে না পেরে পাকিস্তানের ব্যাপারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে বসবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত