কোম্পানির দাস হতে চান না ভারতের কৃষকরা

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২০, ১১:১৪ পিএম

শুধু বাংলাদেশই নয়, গোটা দুনিয়ার কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর কৃষকদের সমস্যার শেষ নেই। কৃষিতে শোষণ, উৎপাদিত কৃষিপণ্যের উপযুক্ত মূল্যের অভাব, কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির মতো ঘটনা কম-বেশি প্রতিটি দেশে লেগেই আছে। কৃষক নির্যাতন, শোষণ, বঞ্চনার এ যাত্রা এখন নয় বরং ক্ষুধার অন্ন জোগানে মানুষ যখন থেকে ফসল উৎপাদনের সঙ্গে লড়াই শুরু করেছে, তখন থেকেই কৃষকদের মাথার ওপর যেন অবিচারের খড়গ দাঁড়িয়েই আছে। কিন্তু ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে ভারত আর পাকিস্তান নামে দুই রাষ্ট্রের স্বাধীনতার পরও এই অঞ্চলে কৃষকদের বঞ্চনা কিংবা কৃষকদের ওপর শোষণ-নির্যাতনের সমাপ্তি ঘটেনি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশে কৃষকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটলেও শোষণ-বঞ্চনা এখনো অব্যাহত আছে।

অতিসম্প্রতি ভারতের বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংসদে কৃষকবিরোধী তিনটি বিল পাস করেন। অথচ মোদি সরকার বলছে কৃষকদের সুরক্ষা ও তাদের উন্নয়নে এসব বিল পাস করা হয়েছে। বিল তিনটি নিয়ে আলোকপাত করলে বোঝা যাবে সেসব কতটা কৃষক স্বার্থের অনুকূলে?

প্রথম বিলটি হচ্ছে The Essential Commodities (Amendment)Bill 2000। এই বিল অনুযায়ী চাল, আটা, আলু, চিনি, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেলসহ মোট ২০টিরও বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং মজুদ করার ঊর্ধ্বসীমাও তুলে দেওয়া হয়েছে। অথচ ১৯৫৫ সালের এই আইনের উদ্দেশ্যই ছিল, অভাবের সময় সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে খাদ্যশস্য ক্রয় করে গণবণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষদের মধ্যে বিতরণ করবে। কিন্তু এখন থেকে কৃষকদের কাছ থেকে এই সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কেনার জন্য সরকার আর বাধ্য থাকবে না, এর বদলে করপোরেট ব্যবসায়ীরা এখন থেকে যত ইচ্ছা নিত্য পণ্যাদি কিনে অনির্দিষ্টকালের জন্য গুদামজাত করে কৃত্রিমভাবে বাজারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। এখানে স্পষ্ট, এই বিলে কৃষকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে করপোরেট ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষা করা হয়েছে।

দ্বিতীয় বিলটি হচ্ছে The Farmers Agreement of Price Assurance and farm services bill 2020, যার গালভরা নাম দেওয়া হয়েছে ‘মূল্য নিশ্চয়তা’! এই বিল নাকি কৃষকদের আয় নিশ্চিত করবে! কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি পেপসিকো, আদানি, রিলায়েন্স-এর মতো বড় বড় কোম্পানিরা চুক্তি করতে পারবে। আসলে ব্রিটিশ আমলের সেই নীলকর সাহেবদের নীলচাষের প্রথা একটু ঘুরিয়ে ফিরে আসছে নতুন আঙ্গিকে! অর্থাৎ বড় বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নিত্যপণ্য  কেনাবেচায় কৃষকদের সঙ্গে চুক্তি হবে। চুক্তি হওয়ার পর কোনো কারণে উৎপন্ন ফসল পছন্দ না হলে তা কিনতে কিংবা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে ফসল নষ্ট হলে সেই আর্থিক ক্ষতির দায় নিতে কোম্পানিগুলোর কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না। বিলে আছে, সে ক্ষেত্রে ক্ষতির মূল্য না পেলে কৃষকরা আইনের আশ্রয় নিতে পারবে। কিন্তু আপনার কি মনে হয়, আদানি, পেপসিকো, রিলায়েন্স-এর সঙ্গে গরিব কৃষকদের কোর্টের আইনি লড়াই করার সক্ষমতা আছে? কী অদ্ভুত আইন! করপোরেট কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে কৃষক চাষাবাদ করবে, আর কৃষকের উৎপাদিত ফসল তারা তাদের খেয়ালখুশি মতো কেনাকাটা করবে। এতে কীভাবে কৃষকের স্বার্থ রক্ষা হবে? অথচ সরকার বলছে, কৃষকের উৎপাদিত পণ্য উপযুক্ত মূল্যে বিক্রি করার নিশ্চয়তা এই আইনে আছে।

তৃতীয় বিলটি হচ্ছে The farmers produce trade and commerce bill-2000। এই  বিলের ফলে ক্রেতা ব্যবসায়িক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কৃষকরা সরাসরি মুক্তভাবে কেনাবেচা করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সরকার কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করবে না। অর্থাৎ স্বামীনাথ কমিশনের সুপারিশ মতে উৎপাদন খরচের দেড়গুণ মূল্য কৃষকদের জন্য সুনিশ্চিত করতে হবে, সেই দায় থেকে সরকার হাত তুলে নিল। এমনকি এই বিলে বিদ্যুতের সরবরাহ সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণ, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতে কৃষকের অনুকূলে ভর্তুকি বন্ধেরও উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ তিনটি বিলেই প্রত্যক্ষভাবে কৃষকের স্বার্থবিরোধী সব কিছুই বিদ্যমান আছে। অথচ সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, কৃষি ও কৃষকের স্বার্থেই এই বিল পাস করা হয়েছে।

ভারতের জনসংখ্যার শতকরা ৫২ ভাগ পরিবার সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল, সে দেশের কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ১৪.৬৫ কোটি পরিবারের মধ্যে ৫৪.৬০ শতাংশ পরিবার ভূমিহীন। যে দেশের কৃষকরা দেনার দায়ে আত্মহত্যা করে, অথচ আইন করে ২০১৬ সালের পর থেকে সেসব রিপোর্ট প্রকাশ করা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমন বাস্তবতায় সে দেশের নিপীড়িত, শোষিত কোটি কোটি কৃষক আদৌ কি করপোরেট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে পারবে? কস্মিনকালেও যা সম্ভব নয়। ফলে ভারতের কৃষক সংগঠনগুলো এই বিল তিনটি বাতিলের জন্য সরকারের ওপর চাপ দিতে থাকে। মোদি সরকার কৃষক সংগঠনগুলোর দাবির প্রতি ন্যূনতম সাড়া না দেওয়ায় কৃষকরা বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেয়।

গত ২৬ নভেম্বর পাঞ্জাবের কৃষকদের ডাকা আন্দোলনে সাড়া দিয়ে হরিয়ানা, উত্তরাখ-, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ ও কেরালার কৃষকরা একাট্টা হয়ে ‘দিল্লি চলো’ অভিযান সফল করে। প্রায় ১২ লাখ কৃষক ও ৯৬ হাজার ট্রাক্টর নিয়ে বিশাল এই কৃষকের ঢল দিল্লির পথে পা বাড়ায়। তবে কৃষকের এই অভিযান বন্ধে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিপুল সংখ্যক পুলিশ দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে। এমনকি এই শীতের সময় সমবেত কৃষকদের ওপর জলকামান দিয়ে পানি দেওয়া, কাঁদানে গ্যাস, টিয়ারশেল পর্যন্ত নিক্ষেপ করে। কিন্তু বিশাল এই কৃষক কাফেলাকে শেষ পর্যন্ত ঠেকাতে পারেনি শাসকরা। এমনকি অপ্রশিক্ষিত কৃষককে জলকামানে উঠে জলকামান বন্ধ করতেও দেখা গেছে। কী এক অভূতপূর্ব কৃষক আন্দোলন! সাম্প্রতিককালে এ ধরনের কৃষক আন্দোলনের কোনো চিত্র কোনো দেশেই চোখে পড়ে না। দিল্লির মূল সড়কগুলো আন্দোলনরত কৃষকরা বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। শেষ পর্যন্ত দিল্লি ঢোকার সব মূল রাস্তা কমবেশি বন্ধ করে দিল্লিকে অবরুদ্ধ করে ফেলে।

ভারতের কৃষকরা মূলত নতুন আইনের অধীনে করপোরেটদের দাসে পরিণত হতে চায় না। ইতিহাস সৃষ্টি করা এই কৃষক জাগরণ সামাল দিতে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং তোমারসহ অন্য মন্ত্রীরা রাতদিন সভায় বসতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত কৃষক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেন। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে বিল তিনটির সংশোধনের আশ্বাস দিলেও তা প্রত্যাখ্যান করে বিল তিনটি পুরোপুরি বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন কৃষক নেতারা। বাস্তবে তারা গত দু’মাস রাস্তায় থেকে খেয়ে না খেয়ে এই আন্দোলনে শরিক হয়েছেন। এমনকি সরকারের তরফে কৃষক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ভোজের আমন্ত্রণ দিলেও তা তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ ধরনের নজিরবিহীন ঘটনা ইদানীংকালে চোখে পড়ে না। ব্রিটিশবিরোধী কৃষক আন্দোলনের পর সংগঠিত ও পরিকল্পিত এই কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস ভারতের কৃষকরা সৃষ্টি করলেন।

ভারতকাঁপানো এই কৃষক আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অপরাধে দিল্লির শাহিনবাগে এনআরসি-সিএএ বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী ৮৪ বছর বয়সী বিলকিস বানুকে গ্রেপ্তার করেছে দিল্লি পুলিশ। হাড় কাঁপানো শীতে দিল্লির শাহিনবাগের সিএএ-বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন ৮৪ বছর বয়সী বিলকিস বানু। এই বয়সে কৃষকদের স্বার্থে রাজপথের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার ঘটনা কদাচিৎ নজরে পড়ে না। ফলে মুক্তিপাগল এই নেত্রীর নাম স্থান পেয়েছে টাইম ম্যাগাজিনের পাতায় ২০২০ সালের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের মধ্যে।

দিল্লির কৃষক আন্দোলন দমনে মোদি সরকার দিল্লিতে জোরজবরদস্তি করার অনুমতির জন্য দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী তা অনুমোদন তো দেনইনি, উল্টো ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এত বড় কৃষক আন্দোলনের পরও মোদি সরকার সংসদে পাস হওয়া বিল তিনটি প্রত্যাহার করার কোনো সদিচ্ছা দেখাচ্ছে না। কারণ পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার ধারক ও কট্টর ধর্মীয় মতবাদের সমর্থক কোনো নেতার পক্ষে কোটি কোটি কৃষকের স্বার্থরক্ষার চেয়ে করপোরেট ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এটা সামন্তযুগ নয় যে, জমিদার জোরদারদের মতো কৃষক নির্যাতন করে তারা করপোরেটদের স্বার্থরক্ষা করতে পারবে! বাস্তবে তা কোনোদিনও সম্ভব হবে না। ইতিমধ্যেই ভারতের সব বামপন্থি সংগঠন ও ৫০০-এর মতো কৃষক সংগঠন একাট্টা হয়েছে। আশা করছি, শেষ পর্যন্ত যেন ভারতের কোটি কোটি কৃষকের স্বার্থরক্ষায় মোদি সরকার বিল তিনটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। এটাই এখন গোটা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের প্রত্যাশা।

লেখক কৃষিবিষয়ক লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত