১০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাখতে হবে ব্যাংকগুলোকে

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২০, ১১:৫৬ পিএম

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে সৃষ্ট ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে পুরো বছর ঋণের কিস্তি পরিশোধে ছাড় দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ সময়ে কেউ ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করলেও শ্রেণিমানের কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় খেলাপি হওয়া থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছেন গ্রাহকরা। আবার খেলাপি ঋণ না বাড়ায় পরিচালন মুনাফার বড় অংশই নিট মুনাফায় নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে ব্যাংকগুলো। ফলে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত ব্যাংকের নিট মুনাফাও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে দেখা গেছে।

তবে খেলাপি না হওয়ার সুযোগ শেষ হলে আগামী বছর বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী বছরের প্রথমার্ধে ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকের ভিত্তি যাতে দুর্বল না হয়ে পড়ে, সে জন্য সাধারণ প্রভিশন বা সঞ্চিতি সংরক্ষণের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে বিতরণকৃত সব ঋণের বিপরীতে ১ শতাংশ অতিরিক্ত সঞ্চিতি সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি সঞ্চিতি হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে।

চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের ঋণ স্থিতির বিপরীতে বাড়তি এ সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে। অতিরিক্ত সঞ্চিতিকে ‘স্পেশাল জেনারেল প্রভিশন কভিড-১৯’ নামে ব্যাংকের ব্যালেন্সশিটে পৃথকভাবে প্রদর্শন করতে হবে।

গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি’ বিভাগ থেকে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রজ্ঞাপনে ব্যাংকগুলোর নগদ আদায় ব্যতিরেকে ঋণের ওপর আরোপিত সুদ আয় খাতে নেওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রকাশ করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতের বিনিয়োগ বা ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৬৩ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড ঋণ ৯ লাখ ২৪ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা এবং এসএমএ ঋণ ৪৪ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। এই হিসাবে ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত ৯ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা নিরাপত্তা সঞ্চিতি হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর বাইরে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯৪ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা।

গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় ইতিপূর্বে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঋণ শ্রেণীকরণের বিষয়ে চলতি বছরের ঋণের শ্রেণিমান বিরূপমানে শ্রেণীকরণ করা যাবে না। তবে কোনো ঋণের শ্রেণিমানের উন্নতি হলে তা যথাযথ নিয়মে শ্রেণীকরণ করা যাবে। কিস্তি পরিশোধের জন্য বর্ধিত সময়ের সুবিধাপ্রাপ্ত ঋণের ওপর আরোপিত সুদ আয় খাতে স্থানান্তরকরণ এবং ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের বিষয়ে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হবে বলে ওই সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জানানো হয়েছিল। এ অবস্থায় গতকাল ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি সুদৃঢ় রাখা ও দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, যেসব ঋণ কিস্তি পরিশোধের জন্য বর্ধিত সময়ের সুবিধাপ্রাপ্তির কারণে অশ্রেণীকৃত অবস্থায় রয়েছে, সেসব ঋণের বিপরীতে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আরোপিত সুদ নগদ আদায় ব্যতিরেকে আয় খাতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ঋণের সম্ভাব্য আদায় ঝুঁকি পর্যালোচনাপূর্বক কয়েকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গতকালের নির্দেশনা অনুযায়ী, ঋণের স্থিতি ১০ কোটি টাকা বা তার বেশি হলে আরোপিত সুদ আয় খাতে স্থানান্তরের জন্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা (যৌক্তিকতা উল্লেখপূর্বক) অডিট কমিটির সুপারিশসহ পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। ঋণের স্থিতি ৫ থেকে ১০ কোটি টাকার মধ্যে হলে আরোপিত সুদ আয় খাতে স্থানান্তরের জন্য শাখাপ্রধানের সুপারিশসহ ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। আর ঋণের স্থিতি ৫ কোটি টাকার কম হলে আরোপিত সুদ আয় খাতে স্থানান্তরের জন্য অনুমোদন দিতে হবে শাখাপ্রধানের সুপারিশসহ তার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ।

উল্লিখিত বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কোনো ঋণের বিপরীতে আরোপিত সুদ আয় খাতে স্থানান্তর করা না হলে তা ইন্টারেস্ট সাসপেন্স হিসেবে স্থানান্তর করতে হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ঋণের বিপরীতে সুনির্দিষ্ট সঞ্চিতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ঋণের শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিংয়ের বিধান অনুযায়ী আবশ্যিক প্রভিশন হিসাবায়নপূর্বক যথারীতি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। আর সাধারণ প্রভিশন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ঋণের শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিংয়ের বিধান অনুযায়ী আবশ্যিক প্রভিশন হিসাব করে তা সংরক্ষণ করতে হবে। এ ছাড়া ৩১ ডিসেম্বর ভিত্তিক হিসাব চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে এসএমএ ঋণসহ সব অশ্রেণীকৃত ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত ১ শতাংশ জেনারেল প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত বিশেষ এ প্রভিশন অন্য কোনো খাতে স্থানান্তর করা যাবে না বলে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণসংক্রান্ত হিসাবায়ন এবং আয় খাতে স্থানান্তরের সামগ্রিক পর্যালোচনা অনুমোদনসংক্রান্ত তথ্যাদি সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা শাখায় সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল স্বল্পতম সময়ের মধ্যে এ-সংক্রান্ত তথ্যাদি যাচাই-বাছাই করতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত