কুসংস্কার ইমানের জন্য ক্ষতিকর

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৬:৪৫ এএম

যাবতীয় ‘কুসংস্কার’ মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কুসংস্কার হলো নিছক ধারণা, কল্পনাভিত্তিক প্রমাণহীন বিশ্বাস এবং সেই বিশ্বাসপ্রসূত ভিত্তিহীন প্রথা। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিবেকহীন অন্ধবিশ্বাস এবং অন্ধ অনুকরণের ফলে পূর্বপুরুষদের দীর্ঘদিনের লালিত রীতিনীতি, প্রবাদ-প্রবচন মানুষের মস্তিষ্কে কু-বিশ্বাসের ভিত মজবুত করে। যা সমাজে ছড়িয়ে আছে সভ্যতা, বিভিন্ন মতবাদ, সামাজিকতা ও শাস্ত্রের নামে। সমাজ, গোত্র, জাতি ও অঞ্চলভেদে কুসংস্কারে বিশ্বাসের মাত্রায় রয়েছে ভিন্নতা। ব্যক্তিগত কিংবা সামাজিক কোনো কুসংস্কারের সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। বিদায় হজের ভাষণে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ‘জাহেলি যুগের সকল কু-প্রথা আমার পায়ের নিচে নিক্ষেপ করা হলো।’  ইবনে মাজা : ৩০৭৪

ইসলাম সবসময় কুসংস্কারে বিশ্বাসের বিপরীতে। কেননা এগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে আল্লাহতায়ালার একত্ববাদের বিপরীতে হয়। সৃষ্টি রহস্য, আসমান-জমিন, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, খেলাধুলা, বিনোদন, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, পশু-পাখি, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, জীব-জন্তু থেকে শুরু করে জীবনের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে কুসংস্কারের ছায়া নেই। সমাজে প্রচলিত হিসেবে পালন করা কুসংস্কারগুলো ধীরে ধীরে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে আল্লাহতায়ালা ব্যতীত কোনো এক শক্তিকে বিশ্বাসের অবলম্বন করে ধাবিত হয়। সেই শক্তিকে কার্যসম্পাদনের নির্দেশক ভাবা হয়। যেমন, বাচ্চাদের দাঁত পড়লে তা ইঁদুরের গর্তে দেওয়া হয়। কোনো প্রাণীর আওয়াজকে বিপদের কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। ব্যাঙ ডাকলে বৃষ্টি হয়। হাতির ছবি ঘরে থাকলে সৌভাগ্য আসে। কালো বিড়াল কিংবা পেঁচা দেখলে দুর্ভাগ্য হয়। ডান হাতের তালু চুলকালে টাকা আসে। কাকের ডাক কারও মৃত্যুর সংবাদ বহন করে। টিকটিকির আওয়াজকে কথার সত্যায়ন মনে করা। পরীক্ষার আগে ডিম খেতে নেই। জোড়া কলা খেলে যমজ বাচ্চা হয়। দোকানে সকাল-সন্ধ্যা আগরবাতি জ¦ালাতে হয়, শুরুতে বাকি দিতে নেই এমন অসংখ্য কুসংস্কার সমাজে ঘিরে আছে।

কুসংস্কারের ভিত্তিতে পালিত প্রত্যেকটি কাজের ক্ষেত্রে তাওহিদের দাবি উপেক্ষিত। অজ্ঞতা, মূর্খতা ও অন্ধ আনুগত্য মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞানকে গ্রাস করার ফলে কুসংস্কারের উৎপত্তি ও বিকাশ হয়েছে। কিছু কিছু কুসংস্কার তো সরাসরি শিরক ও কুফরের পর্যায়ের। ইসলামি বিদ্বানদের অভিমত হলো, যে হৃদয় ও মস্তিষ্ক কোরআন-সুন্নাহর আলো থেকে বঞ্চিত; তা-ই নানাবিধ বিভ্রান্তি ও কুসংস্কারের প্রজননক্ষেত্র। অথচ ইসলামের অন্যতম শিক্ষা হচ্ছে সুরুচি ও সুনীতি। এর বিপরীত, অনাচার ও অশ্লীলতা। কিন্তু কুসংস্কারগুলো সুরুচি, সুনীতি ও সুন্দরের বিপরীত। সুতরাং অনাচার থেকে মুক্তি পেতে আমাদের অবশ্যই ফিরতে হবে আলোর দিকে। মানবজাতিকে সর্ববিধ অন্ধকার থেকে মুক্ত করার জন্যই কোরআনের আগমন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, ‘এটি সেই কিতাব যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যেন তুমি মানুষকে বের করে আনো অনেক অন্ধকার থেকে এক আলোর দিকে।’  সুরা ইবরাহিম : ১

কোরআনে কারিমে আরও বলা হয়েছে, ‘তিনি আল্লাহ, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছুই তিনি জানেন। তিনি দয়াময় মেহেরবান। তিনিই আল্লাহ, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনিই বাদশাহ, অতি পবিত্র, শান্তিদাতা, নিরাপত্তাদাতা, রক্ষাকর্তা, সবার ওপর বিজয়ী, নিজ হুকুম জারি করায় শক্তিমান এবং অহঙ্কারের অধিকারী। মানুষ তার সঙ্গে যে শিরক করছে তা থেকে আল্লাহ পবিত্র। তিনিই আল্লাহ, যিনি সৃষ্টির পরিকল্পনাকারী, তা বাস্তু‘বায়নকারী ও সে অনুযায়ী রূপদাতা। সব ভালো নাম তারই। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই তার পবিত্রতা ঘোষণা করছে। তিনি মহাশক্তিশালী ও সুকৌশলী।’  সুরা হাশর : ২২-২৪

মূলত পৃথিবীতে যা কিছু পরিচালিত হয়, তা সবই আল্লাহতায়ালার নির্দেশনাতে হয়। দ্বিতীয় কোনো পক্ষ অথবা শক্তির প্রভাব অমূলক, নিরর্থক। যদি অনুরূপ কোনো শক্তি কিংবা পক্ষকে বিশ্বাস করা হয় তাহলে এটা শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুতরাং কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যাবে না যে, এটার বদৌলতে এরূপ হয়েছে; বরং তিনি রাজাধিরাজ, সবকিছুর পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপক। অথচ হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো কিছুকে অপয়া, অশুভ মনে করা শিরক।’  সুনানে আবু দাউদ : ৩৯১০

কুসংস্কার অন্তরের বিশ্বাস এবং মুখে প্রকাশ কিংবা কর্মে সম্পাদনের দ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে। ফলে শিরকের মতো বড় পাপের রোষানলে পড়লে পরকালীন জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে।’  সুরা নিসা : ৪৮

লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত