করোনা পরিস্থিতির কারণে পিছিয়ে যাচ্ছে ২৬তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা। আগামী ১ জানুয়ারি থেকে মাসব্যাপী এই মেলা আয়োজনের কথা ছিল। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ধাক্কার কারণে তা পেছানোর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। মেলার সম্ভাব্য তারিখ ও প্রস্তুতি বিষয়ে আজ রবিবার বৈঠক করবে ইপিবির পরিচালনা পর্ষদ। কর্র্তৃপক্ষ চাইছে, বাতিল না করে সুবিধামতো সময়ে মেলা আয়োজন করতে। ইপিবি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এছাড়া স্থগিত হয়েছে বাংলা অমর একুশে গ্রন্থমেলা। মেলা পরিচালনা কমিটির সঙ্গে আলোচনা না করে এককভাবে বাংলা একাডেমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে অভিযোগ করে প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রকাশক সমিতি। আজ রবিবার উভয় সমিতির নেতৃবৃন্দ বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সভায় মিলিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বাণিজ্যমেলার বিষয়ে ইপিবির সচিব (ভারপ্রাপ্ত) মাহমুদুল হাসান গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চাইছি বাণিজ্যমেলার আয়োজন করতে। বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতির ওপর। আগামী ৪ মাস পর করোনা পরিস্থিতি কোথায় যাবে সেটা এখনো কেউ বলতে পারছে না। তবে আমরা এপ্রিল-মে মাসকে সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ধরে রাখছি। এর মধ্যে মেলার প্রস্তুতি সেরে রাখব। যদি করোনা পরিস্থিতি এই সময়েও খারাপের দিকে থাকে তাহলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’
১৯৯৫ সাল থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় ইপিবি প্রতি বছরের শুরুতে এই মেলার আয়োজন করে থাকে। গত ২৫টি মেলা অস্থায়ীভাবে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। ২০০৭ সালে সেখানেই একটি স্থায়ী মেলা কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তা স্থানান্তর করে রাজধানীর পূর্বাচলে করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু পুরোপুরি কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় এতদিন আগারগাঁওয়েই মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ায় আগামী মেলা রাজধানীর পূর্বাচলে স্থায়ী মেলাকেন্দ্রে আয়োজিত হবে।
দেশের রপ্তানি বৃদ্ধি ও পণ্যের প্রচারণার কথা মাথায় রেখে তৎকালীন সরকার বাণিজ্যমেলার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু আয়োজনের পর থেকে কখনোই এই মেলা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে পারেনি বলে অভিযোগ রপ্তানিকারকদের। বিদেশি ক্রেতাদের আনতে ব্যর্থ হওয়া, নিম্নমানের স্থানীয় পণ্যের খুচরা দোকানদারদের স্টল বরাদ্দ দেওয়া, রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানকে স্টল না দেওয়া ও স্টল বরাদ্দে অনিয়মসহ নানা অভিযোগ ছিল ব্যবসায়ীদের। খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিও ২৫তম মেলার উদ্বোধনকালে বলেছিলেন, ‘এই মেলা কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নেই। তবে আগামীবার থেকে পূর্বাচলে এটি অনুষ্ঠিত হলে তখন থেকে পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মানের চেষ্টা করা হবে।’
এবারের মেলায় কোনো পরিবর্তন আসবে কি নাএমন প্রশ্নের জবাবে ইপিবি সচিব মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আমাদের থেকে এতদিন যারা স্টল নিয়েছে তারাও কিন্তু রপ্তানি করে এমন ঘোষণা দিয়েই নিয়েছে। তবে এবার আমরা অনেক যাচাই-বাছাই করব। সর্বোচ্চ চেষ্টা করব রপ্তানিকারকদেরই কেবল স্টল দিতে। তাছাড়া ওখানে (পূর্বাচল) নিম্নমানের খুচরা বিক্রেতারা সুবিধাও করতে পারবে না। করোনা পরিস্থিতি ভালো থাকলে আমরা এবারের মেলায় সর্বোচ্চ মান এবং বিদেশি ক্রেতা উপস্থিতির চেষ্টা করব। কেবল সত্যিকারে রপ্তানিকারকরাই যাতে স্টল পায় সেই দিকে সর্বোচ্চ খেয়াল রাখব।’
বইমেলা স্থগিত কর্র্তৃত্ববাদী সিদ্ধান্ত : অমর একুশে গ্রন্থমেলা স্থগিত করাকে বাংলা একাডেমির কর্র্তৃত্ববাদী সিদ্ধান্ত বলে বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রকাশক সমিতি। গতকাল শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে প্রকাশকদের প্রতিনিধিত্বকারী দুই সংগঠন পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি এবং জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি এ প্রতিবাদ জানায়। আজ রবিবার উভয় সমিতির নেতৃবৃন্দ বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সভায় মিলিত হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকাশকদের দুই সমিতির সভাপতি মো. আরিফ হোসেন ও ফরিদ আহমেদ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলা একাডেমি কর্র্তৃপক্ষ একতরফা মিটিংয়ে আসন্ন ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২১’ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ বইমেলার সার্বিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘অমর একুশে বইমেলা পরিচালনা পর্ষদ’ বিষয়টি ওয়াকিবহাল নয়। এছাড়া প্রকাশকদের প্রতিনিধিত্বকারী দুই সংগঠন পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি এবং জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি কারও সঙ্গেই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি। অমর একুশে বইমেলা আমাদের ঐতিহ্যের অহংকার। অথচ এরকম একটি আয়োজন স্থগিতের একতরফা কর্র্তৃত্ববাদী সিদ্ধান্ত নিল বাংলা একাডেমি।’
এর আগে শুক্রবার এক সভা শেষে অমর একুশে বইমেলা স্থগিতের কথা জানায় বাংলা একাডেমি। একই সঙ্গে ভার্চুয়ালি মেলা আয়োজনের প্রস্তাবনাসহ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়ার কথা জানায়। মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বাংলা একাডেমির নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে আগামী অমর একুশে গ্রন্থমেলা স্থগিত করা হয়েছে। আপাতত ভার্চুয়ালি মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বইমেলার বিষয়ে এখনো তো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দুটি প্রস্তাবনা এসেছে। একটি হলো মেলা পিছিয়ে দেওয়া, দ্বিতীয়টি ভার্চুয়ালি আয়োজন করা। আমি মনে করি, করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় মেলা পিছিয়ে নেওয়া যেতে পারে। মার্চ অথবা এপ্রিল মাসে বইমেলা আয়োজন করা যেতে পারে।’
অনন্যা প্রকাশনীর কর্ণধার মনিরুল হক বলেন, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। লন্ডন ও নিউইয়র্কে ভার্চুয়ালি বাংলাদেশ বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোতেও সাফল্য আসেনি। বাংলা একাডেমির এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমরা একমত নই। বাংলা একাডেমি আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, ‘আয়োজক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলা একাডেমি প্রথমে সিদ্ধান্ত নেবে। তারপর সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় অর্থাৎ সরকারের সঙ্গে আলাপ করা হবে। তারপরই প্রকাশকদের সঙ্গে আলাপ করা হবে। করোনা পরিস্থিতিতে ফিজিক্যালি অমর একুশে গ্রন্থমেলা আয়োজন করা সম্ভব নয়। এ কারণে আমরা মেলা পিছিয়ে দেওয়ার জন্য রবিবার (১৩ ডিসেম্বর) সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় বরাবর একটি চিঠি পাঠাব। যেহেতু ফেব্রুয়ারি মাস আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের মাস, সেহেতু আমাদের কিছু আনুষ্ঠানিকতা থাকবেই। সেসব আয়োজন ভার্চুয়ালিই করা হবে। সেই সঙ্গে ভার্চুয়ালি একটি বইমেলার আয়োজন করার চিন্তা রয়েছে।’
