১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নাম ধরে খুঁজে বের করে হত্যা করা হয় দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের। বাংলাদেশ যেন কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে সেটাই ছিল আলবদর-আলশামস বাহিনীর লক্ষ্য। বিজয়ের প্রাকমুহূর্তে নৃশংস হত্যাযজ্ঞের শিকার হন অনেক বুদ্ধিজীবী। তাদের মধ্যে পাঁচ বুদ্ধিজীবীর পরিবারের কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়ার শেষ সময় নিয়ে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা
সেলিনা পারভীন
১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর, শীতের সকাল। গোসলের আগে ছেলে ছোট্ট সুমন জাহিদের শরীরে তেল মাখিয়ে দিচ্ছিলেন সেলিনা পারভীন। চুলায় বসানো হয়েছিল রান্না। দরজায় এসেই কড়া নাড়তে শুরু করে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসররা। শাড়ি বদলানোর সুযোগও তিনি পাননি। যাওয়ার আগে শুধু সুমনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, মামার সঙ্গে খেয়ে নিও। আমি যাব আর চলে আসব। সেই ফিরে আসা আর সত্যি হয়নি। ফেরেননি সেলিনা পারভীন।
অকুতোভয়ী সেলিনা পারভীনের জন্ম ১৯৩১ সালের ৩১ মার্চ। জন্মের পর থেকেই জীবনযুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। এরই মধ্যে নিজের প্রতিভার আলো ছড়িয়েছেন সমানভাবে। গ্রামের পরিবেশে বড় হওয়ায় মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাকে। এরও প্রায় ১০ বছর পর আবার নতুন উদ্যমে লেখাপড়া শুরু করেন। চাকরি নেন ঢাবির রোকেয়া হলের হল পরিচালক হিসেবে। পরে যোগ দেন সে সময়ের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ললনা পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগে। ললনার সঙ্গে সঙ্গে কাজ করতেন সাপ্তাহিক ‘বেগম’-এও। নির্দিষ্ট বেতন বলতে যা বোঝায় তা তিনি পাননি। এরপরও ললনার জন্য বিজ্ঞাপন সংগ্রহ, যোগাযোগ তৈরি, অর্থ সংগ্রহসহ সব কাজই করে গেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। সারা দিন এত দৌড়াদৌড়ি করেও লেখালেখির নেশা ছাড়েননি। লিখতেন দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক পাকিস্তান ইত্যাদি অনেকগুলো পত্রিকায়। সরাসরি সংবাদ সংগ্রহ আর পত্রিকায় লিখতেন বলে স্বপ্ন দেখা শুরু করেন নিজের একটি পত্রিকার। অদম্য চেষ্টায় ১৯৬৯ সালে জন্ম দেন তৎকালীন অন্যতম সাড়া জাগানো পত্রিকা ‘শিলালিপি’র। এক হাতে প্রকাশক ও সম্পাদকের কঠিন দায়িত্ব সামলেছেন। সন্তান, সংসার, পত্রিকা সব সামলে যুক্ত হয়েছিলেন ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে। পল্টনের জনসভা থেকে শুরু করে শহীদ মিনার থেকে বের হওয়া নারীদের অগ্রভাগে সব সময় থাকতেন তিনি। শিলালিপিতে তত দিনে নিয়মিত লিখতেন বাঙালি বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিক্ষক ও সাহিত্যিকরা। এক কথায়, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতিপর্বে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। বাঙালি স্বাধীনতার অন্যতম মুখপাত্র হয়ে ওঠায় শিলালিপি ও সেলিনা আলবদরদের নজরে পড়ে গিয়েছিলেন। ২৫ মার্চ নারকীয় তাণ্ডব শুরু হলে এই শিলালিপিকেই অনবদ্য অস্ত্রে পরিণত করলেন তিনি। মুক্তি যোদ্ধাদের আশ্রয় ও রসদপ্রাপ্তির নির্ভরযোগ্য জায়গা ছিল সেলিনার বাসা। শিলালিপি বিক্রির অর্থ দিয়ে মুক্তি যোদ্ধাদের জন্য ওষুধ, কাপড় কিনতেন, নগদ অর্থসহ সব পৌঁছে দিতেন ক্যাম্পে। যুদ্ধের সময় সব পত্রিকার সঙ্গে সঙ্গে শিলালিপিও বন্ধ হয়ে যায়। পত্রিকা পুনঃপ্রকাশের জন্য চেষ্টা শুরু করলে রাজাকারদের নজরে পড়ে যান আরও স্পষ্টভাবে। শিলালিপি পরে তিন মাস পরপর বের করার অনুমতি পায়। তবে এতেও ছিল শর্ত, সবকিছু বদলে একদম নতুন আঙ্গিকে প্রকাশ করতে হবে শিলালিপি। এদিকে প্রচ্ছদশিল্পী হাশেম খানের তৈরি করা প্রচ্ছদে প্রকাশিতব্য শিলালিপির একটা সংখ্যা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। সেলিনা বুঝেছিলেন এবার তাকে কৌশলের আশ্রয় নিতে হবে। নতুনভাবে পত্রিকা ছাপানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন।
১৩ ডিসেম্বর, দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে। সিদ্ধেশ্বরীর ১১৫ নম্বর নিউ সার্কুলার রোডের বাড়ির ছাদে বসে লিখছিলেন সেলিনা। লেখার মাঝেই উঠে ছেলে সুমনের শরীরে তেল মাখিয়ে দিচ্ছিলেন। তখনই বাড়ির উল্টোদিকের বাড়ির সামনে ইপিআরটিসির ফিয়াট মাইক্রোবাস ও লরি থামে। সেখান থেকে একই রঙের পোশাক পরা ও কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা কিছু আলবদর কর্মী সেলিনাদের ফ্ল্যাটের দরজায় কড়া নাড়ে। দরজা খুলে দিলে তারা বেশ খানিকক্ষণ সেলিনার সঙ্গে কথা বলে তারা নিশ্চিত হয় ইনিই সাংবাদিক সেলিনা পারভীন। এরপর সেলিনাকে কোনো সময় না দিয়ে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। ছোট্ট সুমনের সঙ্গে সেই ছিল মায়ের শেষ দেখা। আর কখনো ফেরেননি সেলিনা পারভীন। তার গুলিবিদ্ধ ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ পাওয়া গিয়েছিল ১৮ ডিসেম্বর। খুব শীতকাতুরে ছিলেন সেলিনা, তার পায়ে তখনো পরা ছিল সাদা মোজা। সেটা দেখেই শনাক্ত করা হয়েছিল তাকে।
মুনীর চৌধুরী
দেশ কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কারও জীবনের নিশ্চয়তা নেই এ কথা মুনীর চৌধুরী বুঝতে পেরেছিলেন ২৫ মার্চের রাতেই। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে তিনি তখন থাকতেন নীলক্ষেতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোয়ার্টারে। সে রাতেই ১২টার দিকে প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হলে সবার মধ্যেই নেমে আসে আতঙ্ক। গোলাগুলির পরিমাণ এত বেশি ছিল যে তারা ভেবেছিলেন জানালার পাশে শুয়ে ঘুমালেও ছুটে আসা গুলিতেই মৃত্যু হবে তাদের।
সন্তানদের নিয়ে মুনীর ও স্ত্রী লিলি মেঝেতে শুয়ে রইলেন। কারফিউ উঠে গেলেও চারদিক থেকে পরদিন মৃত্যুর খবর আসতে থাকে। তারা থাকতেন সেন্ট্রাল রোডে। সেখান থেকে চলে গেলেন মুনীরের বোনের বাসা হাতিরপুলে। তবে মুনীর বেশিদিন সেখানে থাকেননি। আবারও চলে আসেন বাবার বাড়িতে। এরই মধ্যে তার বড় ছেলে ভাষণ যুদ্ধে চলে যায়। ভেতরে-ভেতরে ছেলে হারানোর শঙ্কায় ভীষণ মুষড়ে পড়েছিলেন মুনীর। মুনীর চৌধুরীর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি পালিয়ে যাননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অধ্যাপক যেন সরকারবিরোধী কাজে যুক্ত না হয় এ বক্তব্যসহ একটি চিঠি তাকে পাঠায় টিক্কা খান। আলাদাভাবে তার নামে এ রকম সতর্ক করে দেওয়া চিঠি পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজিরা দিতে হয়েছিল মুনীরকে। সে সময় তিনি অল্পবিস্তর লেখালেখিও করেছেন। মুনীরের মৃত্যুর পর কয়েকটি নাটক ও অনুবাদের খণ্ডাংশ পাওয়া যায়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মুনীরকে মৃত্যুভয় চেপে বসলেও স্ত্রী লিলির অনুরোধ সত্ত্বেও মাকে একা রেখে কোথাও যেতে চাইতেন না তিনি। ডিসেম্বর মাসের শুরুতে কথা ছিল সবাই মিলে একসঙ্গে ঢাকা ছাড়বেন। তার বোনের পরিবারেরও সঙ্গে যাওয়ার কথা ছিল বলে ১৪ ডিসেম্বর দিন ধার্য হয়। কিন্তু সেদিন সকালেই আবার কারফিউ দেওয়া হয় ঢাকায়। যদিও ১০ তারিখ থেকেই মিত্রবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করে ঢাকা। এতে একটু আশাও বুকে বেঁধেছিলেন মুনীর। রোজ বিবিসি শোনার অভ্যাস ছিল তার। সেদিনও মাটিতে শুয়ে বুকের ওপর একটি রেডিও রেখে বিবিসি শুনছিলেন আর নীরবে হাসছিলেন। স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘আর দেরি নেই। দেশ স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে। আর্মিরা সব দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে।’ ১৪ ডিসেম্বর দুপুর ১২টার দিকে খাওয়া-দাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন মুনীর। ঠিক সে সময় পাঞ্জাবি পরা বাঙালি একদল ২০-২৫ বছর বয়সী তরুণ গায়ে শাল জড়িয়ে মুনীরকে ডাকতে এলো। এদের মধ্যে একটি ছেলে বন্দুক বের করে মুনীরের পিঠে চেপে ধরল। একবার শুধু শরীর কেঁপে উঠেছিল তার। তিনি চলে গেলেন। যাওয়ার সময় একবারও পেছনে ফিরে তাকাননি। আর ফিরে আসেননি বাংলার এই কৃতী সন্তান।
ডা. আ ফ ম আবদুল আলীম চৌধুরী
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে সবাই যখন একে একে ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে, অল্প কয়েকজনের সঙ্গে আবদুল আলীম চৌধুরী রয়ে গিয়েছিলেন পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে। ২৫ মার্চের আগে থেকেই আলীম চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নানা তৎপরতা শুরু করেছিলেন। সে সময় তার বাসা ছিল ২৯/১ পুরানা পল্টনে, চেম্বার ছিল ৬২/২ পুরানা পল্টনে। যুদ্ধ শুরু হলে বাসাতেই রোগী দেখা শুরু করেছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে তার চেম্বারে অনেক মানুষ আটকা পড়েছিল। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি সবাইকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছেন। তাদের বাড়িতেও আশ্রয় নিয়েছিল অনেক মানুষ। সে রাতে তাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামও। ২৭ মার্চ কারফিউ কিছুটা শিথিল হলে তাকে শাড়ি-বোরকা পরিয়ে রিকশায় করে হোসনি দালানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আলীম চৌধুরী সব সময় বলতেন, ভেতর থেকে তারাই যদি গেরিলা যোদ্ধাদের সাহায্য না করেন তবে তারা আর কোথায় আশ্রয় পাবে? মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য তিনি একটি ক্যামোফ্লেজ হাসপাতাল খুলেছিলেন। গোপন জায়গার সে হাসপাতালের কথা জানত না পরিবারের কেউই। তার সঙ্গী ছিলেন ডা. ফজলে রাব্বী। নিজে একজন চিকিৎসক হয়েও অন্য চিকিৎসকদের কাছ থেকে তেমন কোনো সাহায্য তিনি পাননি। তাকে দেখলেই অন্যরা দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে ফেলত। ওষুধের ফ্যাক্টরি থেকে সরাসরি ওষুধ সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছাতেন তিনি।
জুলাই মাসের মাঝামাঝি তাদের বাড়িতে আশ্রয় নেন মাওলানা মান্নান। তখনই বাড়ির ক্লিনিকটা বন্ধ হয়ে যায়। খুব বিপদে পড়েছেন এমন বলে আশ্রয় নিলেও আলীম চৌধুরীর স্ত্রী শুরু থেকেই এই মানুষটিকে খুব একটা পছন্দ করতে পারেননি। তিনি বাড়িতে থাকা শুরুর পর থেকেই আর্মিদের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়। ডা. আলীম সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করেন এরা কারা আর কেনই-বা এখানে আসে। মান্নান তখন জবাবে বলেছিল, এরা সবাই আলবদর। তিনি আলবদরের অর্গানাইজার। তাকে পাহারা দেওয়ার জন্য সবাই এসেছে। কারণ মুক্তিযোদ্ধারা তাকে চিঠি দিয়েছে আপনি যদি ওপরে না থাকতেন তাহলে ওরা আমাকে বোমা মেরে উড়িয়ে দিত। এমন উত্তর আশা করেননি ডা. আলীম ও স্ত্রী নাসরিন। তাদের আর বুঝতে বাকি রইল না যে মান্নান নিজের জীবন বাঁচাতে তাদের ঢাল বানিয়েছে। মান্নান আলীমকে কথা দিয়েছিল, তার বা তার পরিবারের কারও ক্ষতি সে হতে দেবে না। কারণ তারা তাকে আশ্রয় দিয়েছেন। ১৫ ডিসেম্বর, ১৯৭১। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগের দিন বিকেল সাড়ে ৪টা। পিলখানায় মিত্রবাহিনী বোমা ফেলছে। একসঙ্গে বসে সে দৃশ্য দেখছেন ডা. আলীম ও নাসরিন। পাকিস্তানিরা তখন ধরাশায়ী, তাদের কাছে বিমান-বিধ্বংসী অস্ত্র নেই। তাদের সে অবস্থা দেখে আলীম খুব হাসছিলেন। ঠিক সে সময় তাদের বাড়ির সামনে কাদা লেপা একটি মাইক্রোবাস এসে দাঁড়ায়। আলবদর বাহিনীর সদস্যরা এসে কড়া ভাষায় তাদের ঘরের দরজা খুলতে বলে। আলীম দৌড়ে নিচে মান্নানের কাছে গেলেন। তিনি ভেবেছিলেন, মান্নান তার কথা রাখবে। তাকে এই বিপদ থেকে বাঁচাবে। মান্নান আলীমকে জানাল, তাদের সঙ্গে গেলে কোনো সমস্যা নেই। ঘরে এসে আলীম পোশাক বদলাতে চাইলে সে সময়টুকু তাকে দেওয়া হয়নি। ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। নাসরিন ছুটে গিয়েছিলেন মান্নানের কাছে। সে তাকে জানিয়েছিল, আলীম ছাড়া রাব্বীকেও আলবদর ধরে নিয়ে গেছে। চারপাশে এত বোম্বিং হচ্ছে। আহতদের চিকিৎসা করানোর জন্য তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কাজ শেষেই তারা ফিরে আসবেন। নাসরিন তার কথা সরল মনে বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু আর ফিরে আসেননি আলীম, ফেরেননি রাব্বীও। ১৬ তারিখ সকাল ৮টার দিকে চারদিকে সবাই জয়বাংলা সেøাগান দিলেও নাসরিন শান্ত হতে পারছিলেন না আলীম ফিরে না আসা পর্যন্ত। ১১টার দিকে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এসে মান্নানকে খুঁজতে শুরু করলে নাসরিন প্রথম জানতে পারেন তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। ১৮ তারিখ যখন লাশ নিয়ে আসা হয় তখন তিনি দেখেছিলেন, মানুষের জীবন বাঁচানো চিকিৎসক আলীম চৌধুরীর দুই হাত পেছনে রশি দিয়ে, দুই চোখ গামছা দিয়ে বাঁধা ছিল। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছিল বেয়নেটের আঘাতের ক্ষত। স্বাধীন দেশে নিঃশ্বাস নেওয়ার আগেই চিরতরে আলীম চলে গেছেন।
শহীদুল্লা কায়সার
১৯৬৯ সালে পান্না কায়সারের সঙ্গে শহীদুল্লা কায়সারের যখন বিয়ে হয়, তখন শহরে কারফিউ চলছিল। সে কারফিউয়ের মধ্যেই পান্না শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আরেক কারফিউয়ের দিন হারান স্বামী শহীদুল্লা কায়সারকে। যুদ্ধ শুরু হলে ১৭ মার্চ কায়েতটুলীর বাসায় শাশুড়িকে রেখে নিজেরা বিভিন্নজনের বাসায় থাকতেন। নভেম্বর মাসে সিদ্ধান্ত নিলেন মায়ের কাছে ফিরে যাবেন। মায়ের দোয়াতে সব বিপদ কেটে যাবে এমন আস্থা ছিল শহীদুল্লার। এ সিদ্ধান্তে আপত্তি তুলেছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী (শহীদুল্লা কায়সারের মামা)। তার আশঙ্কা অমূলক ছিল না। তিনি জানতেন রাজাকার-আলবদররা একটি নীলনকশা সাজাচ্ছে যেটাতে বাঙালির চরম ক্ষতি করা যাবে। আর এতে শহীদুল্লা কায়সারের বিপদ হতে পারে। তিনি অবশ্য এগুলোকে খুব একটা আমলে নেননি। মায়ের কাছেই থাকা শুরু করেন। ৩ ডিসেম্বর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলে শহীদুল্লা উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন, বিশ্বাস করতেন খুব দ্রুত স্বাধীন হবে দেশ।
১২ ডিসেম্বর নুরুল ইসলাম বাসায় এসে শহীদুল্লার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলেন। পান্নাকে জানান, আলবদরদের অত্যাচার বেড়ে গেছে। বাড়িতে থাকা কোনোভাবেই আর নিরাপদ নয়। ১৩ ডিসেম্বর দুই ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল হলে কাপড়-চোপড় গুছিয়ে চলে যান। পান্নাকে বলে যান, দেশ খুব দ্রুত স্বাধীন হতে যাচ্ছে। তিনিও ফিরে আসবেন। অল্প সময়ের মধ্যে আবারও ফিরে এসে জানান, যেখানে যেতে চেয়েছিলেন সেখানে সবাই মিলেই যেতে পারবেন। কারফিউ শিথিল হলেই পরদিন তারা রওনা হবেন। কিন্তু ১৪ ডিসেম্বর কারফিউ আর শিথিল হয়নি। বিকেলের দিকে মুখ বাঁধা অবস্থায় কয়েকজন তরুণ এসে তাদের বাড়িতে কড়া নাড়ে। শহীদুল্লা ভেবেছিলেন হয়তো দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে, মুক্তিযোদ্ধারা জানাতে এসেছেন। কিন্তু ভেতরে এসে তারা শহীদুল্লার হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে যায়। পান্নাও তার হাত চেপে ধরেছিলেন। শহীদুল্লা শুধু বলেছিলেন, ‘ভালো থেকো, আমি আবার ফিরে আসব’। ফিরে আসেননি শহীদুল্লা। ১৬ ডিসেম্বর অন্য শহীদের পরিবারের সঙ্গে পান্নাও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে কর্দমাক্ত গর্তে নেমে গলিত বিকৃত লাশ উল্টে-পাল্টে স্বামীকে খুঁজে ফিরেছেন, কিন্তু মেলেনি শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সারের লাশ।
জহির রায়হান
ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করাকালে কমিউনিস্ট আন্দোলন নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন জহির রায়হান। স্নাতক শেষ করে সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করলেও অভাব যেন বেড়েই যাচ্ছিল। লেখার সংখ্যা বাড়িয়ে দিলেন। ১৯৫৫ সালে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হওয়ার পর লেখার পরিমাণ কমিয়ে হাতে তুলে নেন ক্যামেরা। ১৯৫৭ সালে, জাগো হুয়া সাভেরা ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন, সিনেমাটি পরে অস্কারেও যায়। পূর্ব পাকিস্তান থেকে অস্কারে পাঠানো প্রথম সিনেমা ছিল এটি। সিনেমা জগতের হালহকিকত বুঝে নিতেই এই জগতের সঙ্গে আরও ভালোভাবে মিশে গেলেন। ১৯৭০ সালে এসে নির্মাণ করেন ‘জীবন থেকে নেয়া’। এই সিনেমার কারণে তৎকালীন পাকিস্তান শাসকদের কাছ থেকে নানারকম হুমকি পান। দেশে যুদ্ধ শুরু হলে চলে যান কলকাতায়। যুদ্ধের ময়দানে রাইফেল চালাতে না জানলেও থার্টি ফাইভ এমএম ক্যামেরা আর ক্যামেরার রিলকেই বানালেন অস্ত্র। কলকাতায় বসেই দেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে তথ্যচিত্র বানাতে লাগলেন। দুয়ারে দুয়ারে হাত পেতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ সংগ্রহের কাজও চালাতে লাগলেন। যুদ্ধের গোলাবারুদের জবাব দিচ্ছিলেন স্টপ জেনোসাইড, বার্থ অব নেশন, লিবারেশন ফাইটারস, ইনোসেন্ট মিলিয়নস বানানোর মাধ্যমে। বিশ্বের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানিদের বর্বরতার দৃশ্য। শুধু ক্যামেরাকে সম্বল করেই গড়ে তুলেছিলেন দুর্বার প্রতিরোধ। তাকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন বড় ভাই শহীদুল্লা কায়সার।
দেশ স্বাধীনের পরদিন ১৭ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসেন জহির। আনন্দ নিয়ে ফিরলেও বড় ভাইয়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর বুকে বিঁধতে লাগল। তিনি বিশ্বাস করতেন, বড় ভাই বেঁচে আছেন। আশা না হারিয়ে সারি সারি লাশের মিছিলে খুঁজতে লাগলেন ভাইকে। কিন্তু চারদিকে শুধু পচা-গলা লাশ। ভাই কোথাও নেই। কিন্তু তিনি দমে যাননি। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পেছনে কারা জড়িত ছিলেন এবং হত্যাকারীদের অনেকেরই গোপন আড্ডাখানা সম্পর্কেও তথ্য উদ্ঘাটন করেছিলেন জহির। শহীদুল্লা কায়সারকে যে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, সেই খালেক মজুমদারকে ধরিয়েও দিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি সকালে টেলিফোনে তিনি খবর পান যে মিরপুরের ১২ নম্বরে শহীদুল্লা কায়সারসহ অনেক বুদ্ধিজীবীকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। টেলিফোনে খবর পাওয়ার পরই জহির পরিচিত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে করে মিরপুরের দিকে রওনা দেন। পরনে ছিল ছাই রঙের প্যান্ট আর গাঢ় ঘিয়ে রঙের কার্ডিগান। সাদা রঙের শার্টের সঙ্গে পায়ে ছিল স্যান্ডেল। সেদিন মিরপুরে কারফিউ ছিল, রেইড করার জন্য ১২ নম্বর সেকশনেই যাচ্ছিল সেনাবাহিনীর সদস্যরা। তাদের সঙ্গে গিয়েছিলেন জহিরও। আনুমানিক বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিহারিদের অতর্কিত হামলায় ৪২ জন সেনা সদস্য নিহত হন। সেদিন বিকেলেই ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা আবারও ১২ নম্বর সেকশনে হামলা চালায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে কোনো পুরুষ মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি পুরো মিরপুর জনশূন্য করেও নিহত তিন-চারজন ছাড়া আর কারও লাশ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয় ৩০ জানুয়ারি রাতেই সব লাশ সরিয়ে ফেলে বিহারিরা। সেই সঙ্গে হারিয়ে যান জহির রায়হানও।
