নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের পর তার ভিডিওচিত্র ফেইসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া ও ধর্ষণচেষ্টার মামলায় স্থানীয় দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার হোসেনসহ ১৪ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এছাড়া নির্যাতনের শিকার ওই নারীকে ধর্ষণের মামলায় দেলোয়ার ও তার সহযোগী আবুল কালামের বিরুদ্ধে আলাদা আরেকটি অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে পিবিআইয়ের দুই পরিদর্শক মামুনুর রশিদ পাটোয়ারী ও সিরাজুল মোস্তফা নোয়াখালীর মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে অভিযোগপত্র দুটি জমা দেন। তারা ওই দুই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।
এদিকে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের পর দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি হওয়া ওই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী এক মালয়েশিয়া প্রবাসী ছিলেন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার সময় পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের বিশেষ সুপার ইকবাল হোসেন এবং নোয়াখালী পিবিআইয়ের সুপার মিজানুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে গতকাল বেলা সোয়া ১১টার দিকে পিবিআইয়ের নোয়াখালী কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। সেখানে সংস্থাটির বিশেষ সুপার ইকবাল হোসেন জানান, নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন ও ধর্ষণচেষ্টা এবং ধর্ষণের ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে করা দুই মামলার অভিযোগপত্রে এজাহারে নাম থাকা নয়জনের মধ্যে একজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আর এজাহারে নাম আসেনি এমন আরও ছয়জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে ১০ জন গ্রেপ্তার এবং চারজন পলাতক।
বিবস্ত্র করে নির্যাতন ও ধর্ষণচেষ্টা মামলায় মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে মালয়েশিয়া প্রবাসী স্থানীয় জামালউদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে জানিয়ে ইকবাল হোসেন বলেন, ‘জামালউদ্দিন ঘটনার পেছনে থাকায় মামলার এজাহারে তার নাম উঠে আসেনি। তবে তদন্তকালে বিভিন্ন সাক্ষীর সাক্ষ্য, গ্রেপ্তার আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, জব্দ করা আলামত এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তাকে মামলায় প্রধান হোতা হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।’
জামালউদ্দিন ছাড়াও অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে আবদুর রব ওরফে চৌধুরী মিয়া, মিজানুর রহমান তারেক ও মোস্তাফিজুর রহমান আরিফ পলাতক। তাদের সঙ্গে অভিযুক্ত অন্য ১০ আসামি হলেন দেলোয়ার হোসেন দেলু, নূর হোসেন বাদল, মো. আবদুর রহিম, মোহাম্মদ আলী ওরফে আবুল কালাম, ইসরাফিল হোসেন মিয়া, মাইনউদ্দিন সাজু, সামছুদ্দিন ওরফে সুমন, নূর হোসেন রাসেল, আনোয়ার হোসেন সোহাগ ও মোয়াজ্জেম হোসেন ওরফে সোহাগ মেম্বার। তারা সবাই কারাবন্দি। এ মামলায় গ্রেপ্তার অন্য দুই আসামি রহমত উল্লা ও মাঈন উদ্দিন সাহেদকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে রহমতকে মামলার এজাহারে আসামি করা হয়েছিল। আর সাহেদকে তদন্ত চলাকালে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
ওই মামলার দুই আসামি দেলোয়ার হোসেন দেলু ও মোহাম্মদ আলী ওরফে আবুল কালামের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলার অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। তারা বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন। তাদের মধ্যে আবুল কালাম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে বেগমগঞ্জের একলাশপুর ইউনিয়নের জয়কৃষ্ণপুর গ্রামে ঘরে ঢুকে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন, ধর্ষণের চেষ্টা ও ভিডিও ধারণ করে স্থানীয় দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার হোসেন ওরফে দেলুসহ ১৪ থেকে ১৫ জনের একদল দুর্বৃত্ত। ঘটনার ৩২ দিন পর গত ৪ অক্টোবর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ভিডিওচিত্রটি ফেইসবুকে ছড়িয়ে দেয়। ওই ভিডিও ভাইরাল হলে সন্ত্রাসীদের ভয়ে পালিয়ে বেড়ানো ওই নারীকে উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর নির্যাতনের শিকার নারী বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে আলাদা তিনটি মামলা করেন। গত ৭ অক্টোবর মামলাগুলোর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পিবিআইকে। তদন্ত করতে ৬৯ দিন সময় লেগেছে। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলার তদন্তে সময় লেগেছে ৫৭ দিন।
ধর্ষণ মামলার বিষয়ে পিবিআই জানিয়েছে, প্রথম দফায় ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে ঘরে ঢুকে ওই নারীকে (৩৭) ধর্ষণ করেন দেলোয়ার। এরপর গত ৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় আবু কালামের সহযোগিতায় বাড়ির পাশের একটি স্থানে দ্বিতীয় দফায় ধর্ষণ করা হয়। কালাম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। দ্বিতীয় দফায় ধর্ষণের ১৪৭ দিন পর দেলোয়ারের নির্দেশে তার বাহিনীর লোকজন ওই নারীকে ‘বিবস্ত্র’ করে মারধর ও ধর্ষণের চেষ্টা করে।
