যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল বসে আছে এক বছর

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২০, ০২:১৫ এএম

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার কার্যক্রমে গতি নেই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) যেখানে বছরে গড়ে চারটি করে রায় হতো সেখানে গত এক বছর ধরে কোনো রায় নেই। ট্রাইব্যুনালের সবশেষ রায় হয় গত বছর ১১ ডিসেম্বর। মামলার সবশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের (আর্গুমেন্ট) শুনানিও হয় না দীর্ঘদিন। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর সুপ্রিম কোর্টে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে আসামিপক্ষের ২৯টি আপিল।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজের এ ধীরগতি নিয়ে হতাশ অনেকেই। তবে প্রসিকিউটররা বলছেন, ট্রাইব্যুনালের একজন বিচারকের অসুস্থতা ও করোনার কারণে বিচারকাজ ধীরগতিতে হচ্ছে। কারণ প্রচলিত ফৌজদারি আইনে প্রযুক্তির মাধ্যমে ভার্চুয়াল শুনানির বিধান থাকলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে সে সুযোগ নেই।

আইনি বিধান বিশ্লেষণ প্রসিকিউটররা বলেন, ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ আমলে নেওয়া, অভিযোগ গঠন ও রায় দিতে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের বিধান অনুযায়ী তিনজন বিচারকের উপস্থিতি প্রয়োজন। বর্তমান ট্রাইব্যুনালে একজন বিচারক গুরুতর অসুস্থ হয়ে দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন। সংগত কারণে রায় দিতে বিলম্ব ও বিচারকাজ ধীরগতিতে হচ্ছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাইব্যুনালের বিচারক বিচারপতি মো. আমির হোসেন গুরুতর অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যান। তিনি এখনো সেখানে চিকিৎসাধীন। এছাড়া করোনাভাইরাসসৃষ্ট রোগ কভিড-১৯-এর সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে গেল মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ বন্ধ ছিল লম্বা সময়। পরবর্তীকালে পর্যায়ক্রমে ট্রাইব্যুনালের বেশ কয়েকজন প্রসিকিউটর ও নিরাপত্তায় নিয়োজিত এপিবিএনের (আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন) বেশ কয়েকজন সদস্য বিভিন্ন সময়ে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হন। এর প্রভাব পড়ে বিচার প্রক্রিয়ায়। গত ৮ আগস্ট সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু হলেও শুধু জামিন শুনানিসহ বিচারাধীন মামলাগুলোর সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্কসহ অন্যান্য আইনি বিষয়ের জন্য নতুন করে শুনানির তারিখ নির্ধারণ হয়। গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ার কথা জানানো হলেও সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য, জব্দ তালিকা শনাক্তকরণ ব্যক্তির সাক্ষ্য এবং আসামিদের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসংক্রান্ত আবেদন ও আদেশ এবং জামিন শুনানি হচ্ছে ট্রাইব্যুনালে। এছাড়া মামলার অন্যান্য প্রক্রিয়ার জন্য সময়ের আবেদন করা হচ্ছে। সাক্ষীদের বয়স বিবেচনায় করোনার ঝুঁকি এড়াতে ঢাকার বাইরে থেকে সাক্ষীদের আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান প্রসিকিউটররা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্বাভাবিক বিচারকাজের সম্ভাবনা দেখছেন না তারা।

২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম রায়ে (ট্রাইব্যুনাল-২) জামায়াতের রুকন ও পলাতক আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির রায় হয়। একই বছরে নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১১ মাসে আরও নয়টি মামলার রায় আসে। এরপর সাত বছরে এসেছে ৩১টি মামলার রায়। গত বছর ১১ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালের সবশেষ রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজশাহীর বোয়ালিয়ার আবদুস সাত্তার ওরফে টিপু সুলতানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ময়মনসিংহের খলিলুর রহমানসহ ১১ জনের মামলার রায় গত ২৬ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালের এক আদেশে অপেক্ষমাণ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর (প্রশাসন) জেয়াদ আল মালুম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১৯ সালের পুরোটা সময় এবং চলতি বছর মার্চ পর্যন্ত বিচার কার্যক্রম খুবই সচল ছিল। গত বছর পাঁচটি রায় হয়েছে। কিন্তু করোনা ও একজন বিচারক অসুস্থ থাকায় অভিযোগ আমলে নেওয়া, অভিযোগ গঠন ও রায় এ তিনটি বিষয়ে অগ্রগতি হচ্ছে না। সংগত কারণেই রায় প্রদানের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের ধীরগতি লক্ষণীয়। কিন্তু এর বাইরে যেসব প্রক্রিয়া সেগুলো দুজন বিচারকের পক্ষে আইনি বিধান মেনে যেগুলো করা সম্ভব সেগুলো হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘মামলাসংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের সবাই ঢাকার বাইরে থেকে আসবেন। করোনার এ সময়ে তাদের ট্রাইব্যুনালে আনা খুবই বিপজ্জনক। যেজন্য সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক নিয়মিত হচ্ছে না।’

একাত্তরে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ পুরনো হাইকোর্ট ভবনে যাত্রা শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এক দশকের বেশি সময়ে মোট ৪১টি মামলার রায় হয়েছে ট্রাইব্যুনালে। এসব রায়ে ৬৯ জনের মৃত্যুদণ্ডসহ আমৃত্যু কারাদণ্ড ও বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে ৯৫ জনের। এর মধ্যে শীর্ষ ছয় যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানিয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের ৩৬টি মামলার এখন পর্যন্ত বিচার নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। একটি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে রয়েছে যুক্তিতর্কের (আর্গুমেন্ট) পর্যায়ে।

প্রসিকিউটর রানা দাসগুপ্ত দেশ রূপান্তরের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালে ভার্চুয়ালি শুনানির কোনো সুযোগ নেই। প্রচলিত ফৌজদারি মামলাতে ভার্চুয়াল শুনানি করা যায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে ভার্চুয়াল শুনানির কোনো সুযোগ নেই। সব মিলিয়ে করোনার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল এভাবেই চলবে বলে আমার ধারণা।’

এদিকে ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড, আমৃত্যু কারাদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ২৯টি আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে আপিল বিভাগে। মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতের এটিএম আজহার ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের করা রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) আবেদনের ওপর শুনানি বিচারাধীন।

অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন সম্প্রতি জানান, কভিড পরিস্থিতির কারণে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা আদালতে আসতে পারছেন না। যে কারণে স্বাভাবিক বিচারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলেই আপিলগুলোর শুনানির উদ্যোগ নেবেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত