জাকির জাফরানের হাতে বাংলা সনেটের ‘পুনরুজ্জীবন’

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২০, ০৬:৫২ পিএম

সুপ্ত সুমন

চতুর্দশপদী কবিতা বা সনেটের উৎপত্তি ইতালিতে। গানের মতো করে লেখা হতো সনেট। কবিতার এ ধারায় একটি দৃশ্য বা অধরাকে ধরার চেষ্টা করা হতো। ইতালিতে উৎপত্তির পর ইংল্যান্ডে এসে এর ভিন্ন ধরন দেখা দেয় শেক্‌সপিয়ারের হাত ধরে। এরপর বাংলায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা লিখে হয়েছেন অমর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সনেটে বিভিন্ন পরীক্ষা চালিয়েছেন। আধুনিক কবিতায় অনেকেই সনেট লিখেছেন, লিখছেন।

তবে বাংলাদেশে আল মাহমুদের বিখ্যাত ‘সোনালী কাবিন’র পর আর তেমন দেখা মিলছিল না সনেটের। ‘সোনালী কাবিন’ লেখা হয় স্বাধীনতারও আগে, ১৯৬৬ সালে। দীর্ঘ সময়ে কবিতার এ ধারার দেখা মিলল জাকির জাফরানের হাত ধরে।

সনেটকে অনেকে কবিতার আভিজাত্য বলে মনে করে থাকেন। সাধারণত তিন ধরনের সনেট পাওয়া যায় বিশ্বে। এর একটি আদি পেত্রাকীয় ধারা, যার হাত ধরে সনেটের উৎপত্তি বলে ধরা হয়। তিনি ১৪ চরণের কবিতাকে আট ও চার এ দু'ভাগে ভাগ করতেন। পরবর্তীতে শেক্‌সপিয়ারের সনেট চার ভাগে বিভক্ত হয়। ফরাসি ধারারও সনেট আছে তাও চার ভাগের, যদিও কিছু ভিন্নতা রয়েছে। তবে রবীন্দ্রনাথ বাংলায় অনেক ওলট-পালট করেছেন সনেট লিখতে গিয়ে।

সনেট মূলত কবিতার এমন এক ফরম যা একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে রেখে লিখতে হয়। ফলে সবার পক্ষে এসব লেখা সম্ভব হয় না। সনেট লেখার সুপ্ত বাসনা অনেকেরই মধ্যে থাকে। সবাই সফল হতে পারেন না। সম্প্রতি ‘জোৎস্নাসম্প্রদায়’ নামে কবি জাকির জাফরানের লেখা সনেটগুচ্ছ বিশদ আলোচনার দাবি রাখে।

তার ৭২ পৃষ্ঠার বইয়ে ৬৬টি সনেট আছে। সনেটগুলো পড়লে মনে পড়বে ইংরেজ কবি কোলরিজ’র কথা। তিনি বলেছিলেন, সনেট হলো সেই কবিতা যার মধ্যে একান্ত অনুভূতিগুলোর প্রকাশ পায়।

জাকির জাফরানের অনুভূতিগুলো বেশ বড়। তার ক্যানভাসটা বিশাল। পড়তে পড়তে মনে হবে তিনি যেন বিশাল এক আকাশ এঁকে ফেলছেন। সেই আকাশ অবশ্য বাংলাদেশের আকাশ। তার লেখায় বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে নিভৃত কোনো পল্লির কথাও আছে। আছে হিউয়েন সাঙ, ইবনে বতুতা, শরীয়তুল্লাহ, ফকির মজনু শাহ পলাশীর যুদ্ধসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গ। আছে এখানকার লোকায়ত পির, আউলিয়াদের কথা।

রামমোহন, বিদ্যাসাগর, হাজী মোহসিন সমতট, গঙ্গারিডি, হরপ্পা, বঙ্গবাহিত বাংলাদেশকে তিনি ইতিহাস থেকে তুলে এনে গেঁথেছেন কাব্যে।

ভিন্ন ভিন্ন সনেটে তিনি একেকটি বিষয় উত্থাপন করে তার ইঙ্গিত দিয়ে শেষ করেছেন। অর্থাৎ একটি সফল প্রকল্প শক্ত হাতে সম্পাদন করেছেন জাকির জাফরান।

তার কবিতা নিয়ে আলোচনার সময় কবিতা থেকে বাক্য বা চরণ উল্লেখ করার লোভ সামলানো মুশকিল হয়।  তার সব কবিতাই উদ্ধৃত করার মতো। তিনি যে বিমূর্ততার পথে হেঁটেছেন তা-ও কিন্তু না। অনেক মেটাফোরের ব্যবহার আছ বলা যাবে না। যা আমাদের চেনা, চোখের সামনে প্রাত্যহিকভাবে ধরা দেয়, অর্থাৎ যা বাংলা ভাষাভাষীদের নর্ম ও সংস্কৃতিতে সহজে চেনা- সেসবই তার কবিতার উপজীব্য। আবহমান বাংলার ফুল-জল-ইতিহাস সবকিছু কাব্যিক সুষমায় তিনি পাঠকের সামনে হাজির করেন।

আবার তার কবিতায় পাঠক এক মহাকাব্যিক দৃশ্যপটে নিজেকে দেখতে পাবেন। যেমন- ‘জল খাবো, ওগো তুমি ঠোঁটে করে নিয়ে আসো জল।/বেহুলার বুক থকে, সাবিত্রীর শিলা-ব্রত থেকে নিয়ে আসো জল। একেকটি পূর্ণিমার পর নাকি মৃত্যু হয় প্রতিটি কবির, তারপর আসে এক অচেনা ভ্রমর, ফুঁকে দেয় প্রাণ, বেঁচে ওঠে কবি’।

জাকির জাফরানের ভাষা অসাধারণ এবং আধুনিক। তিনি কেনো জটিল, কঠিন, দুর্বোধ্য ভাষা ব্যবহারের পথে হাঁটেন নাই। এখন যারা কবিতা লিখছেন বাংলায়, এপার কিংবা ওপারে- তাদের মধ্যে ভাষা খুঁজে না পাওয়ার, দৃশ্যের অবতারণা করতে না পারা অথবা কবিতাকে তারা কোন গড়নে তৈরি করবেন- সেই সংকট রয়েছে।

আশার কথা হলো, জাকির জাফরান এসব সমস্যামুক্ত। তিনি বড় পরিসরের কবিতা লিখতে পারেন দারুণ পারঙ্গমতায়। তিনি ইউরোপ আশ্রিত রোমান্টিকতার দিকে নিজেকে চালিত করেন নাই। তার মধ্যে ইউরোপীয় একাকিত্ব, বিষণ্নতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ- এসব পাওয়া যাবে না। তিনি লোকাল। কী ইতিহাস, পুরান, রূপকথা, মহাকাব্য, লোককাহিনি তার কবিতার বিষয় হয়ে উঠতে পেরেছে কোনো অসংগতি ছাড়াই- খুব সাবলীলভাবে।

তিনি খুব আগ্রহোদ্দীপকভাবে বাংলাদেশকে একটা রাষ্ট্র নয় জনপদ হিসেবে দেখেছেন। এই জনপদের প্রকৃতি ও মিথ তার কবিতায় এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে একে অপরের সঙ্গে যে বর্তমানে বিভেদের যে বাস্তবতায় আমরা বাস করছি, ঐতিহাসিকভাবে তাকে নস্যাৎ করে দেন জাকির জাফরান।

তার কাব্যময়তা মনোমুগ্ধকর। পড়ার পর আবিষ্ট হতে হবে পাঠককে। যেমন- ‘তুমি ছিলে ময়ূরাক্ষী নদীর কিনারে, সেই থেকে নদীতীরে জগৎ গড়েছি’। বা ‘শরীর গীতিকা হয়ে ওঠে যদি কুহকিনী রাতে- স্বার্থক সে রাত’।

অথবা, ‘পানি কেটে কেটে বানাই অতীত’। পানি কেটে কেটে অতীত বানানোর যে মেটাফোর তা একটা তত্ত্বও হাজির করে বলে মনে হবে। কবিতা মানে আসলে কী? কবিতা পানির ওপর দাগ কাটার মতো কিছু। সে একটা অনুরণন তৈরি করবে, একটা অনুভূতি জাগাবে, একটা ছাপ সৃষ্টি করবে- সহসা মিলিয়ে যাবে। অর্থাৎ কবিতা সৃষ্টি করবে, সুন্দরকে, শব্দকে সে শ্রবণ উপযোগী করবে। পানির ওপর দাগ কাটার মতো কবিতা শিল্প ও সুষমামণ্ডিত হবে- জাকির জাফরান তা আমাদের জানাতে চান।

কবিতায় বাংলার দেহ ভাবকেও তিনি আশ্রয় করেছেন। এই দেহ মানে যৌনতা নয়। এই দেহ হচ্ছে ভান্ডার। দেহের মধ্যে সবকিছু হাজির আছে। তার কবিতায় আছে- ‌‘হেঁয়ালি চাঁদের ডাকে পাথরের প্রেমের ভুমা জ্বলে।/গুহা থেকে দেখেছিলে এক পেয়ারা গাছের নিচে/জেগে উঠেছিল আরো ছোট ছোট গাছ- সেই থেকে/ বীজের ধারণা নিয়ে তুমি বুঝি চুম্বন করেছ/ জলজান্তা পুরুষের ঠোঁট। সেই থেকে ক্ষণে ক্ষণে/ নিজেকেও ভেবেছ বুঝি অনন্ত কৃষির কোনো ঘর,/ তুমি চারা, তুমি বৃক্ষ, তুমি অনতহীন বীজখলা’।

সভ্যতার উষালগ্নের এক দৃশ্যকল্প এসব। সভ্যতা মানে প্রযুক্তির ঝনঝনানি এড়িয়ে নিজেকে আলগোছে তুলে রেখে কবি নিভৃতে লিখেছেন প্রকৃতি আর মানুষের সংসারের কথা। মানুষ তার কবিতায় এক গোত্র। গোত্রপতি হয়ে একেক সময় একেক ব্যক্তি এসে হাজির হয়েছেন। একেক ঘটনায় আন্দোলন তৈরি হয়েছে। যার দাগ থেকে গেছে ইতিহাসে, জলে ও জমিনে।

সেই দাগ যত গভীরেই তার প্রভাব তৈরি করুক না কেন, তাকে তুলে আনবেনই জাকির জাফরান। তিনি কাব্যিক, রোমান্টিক, কিন্তু ভীষণভাবে আবার একগুঁয়েও। আর সুচতুরভাবে রাজনৈতিক।

তার কবিতার মঙ্গল হোক, পাঠক সমাদৃত হোক। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত