বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রাখতে যে কয়টি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তার মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্প অন্যতম। দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ জোগান দেয় এই খাত। সম্ভবত এমন বিবেচনা থেকেই করোনা মহামারীর কবল থেকে অর্থনীতি রক্ষায় সরকার ঘোষিত প্রথম প্রণোদনা প্যাকেজটিই দেওয়া হয়েছিল তৈরি পোশাক শিল্প খাতকে। দেশের শীর্ষ রপ্তানিকারক শিল্প খাতটি রক্ষায় সরকারের ওই সিদ্ধান্ত প্রশংসিতও হয়েছে। প্রথম দফায় দেওয়া পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ নিয়ে গত এপ্রিল-মে-জুন মাসের বেতন-ভাতা দেওয়ার কথা কারখানামালিকদের। কিন্তু ওই তিন মাসেও বহু কারখানায় নানা অজুহাতে শ্রমিক ছাঁটাই এবং বেতন-ভাতা বকেয়া রাখার অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। এ অবস্থায় তৈরি পোশাক খাতের মালিকরা আবারও শ্রমিকদের আরও তিন মাসের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানান। সরকার এই খাতে আরও ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রণোদনা ঋণ বরাদ্দ দেয়। আশা করা হয়েছিল সরকারের এসব পদক্ষেপে এই খাতের শ্রমিকরা অন্তত এই মহামারীকালে প্রাপ্য বেতন-ভাতা-মজুরি পাবেন এবং অন্যায়ভাবে ছাঁটাইয়ের শিকার হবেন না। কিন্তু সরকারের এত প্রণোদনা সত্ত্বেও এই খাতের শ্রমিকদের বঞ্চনার যে শেষ হয়নি এখন তারই খবর মিলছে নানা গবেষণা প্রতিবেদনে।
শুক্রবার দেশ রূপান্তরে ‘১৪ লাখ পোশাকশ্রমিক পাননি প্রণোদনার টাকা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তৈরি পোশাক খাত নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদনের ফলাফল তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনটিতে। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি ওই গবেষণায় দাবি করেছে করোনা পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক খাত রক্ষায় সরকার যে প্রণোদনার অর্থ দিয়েছে তার ৮৪ শতাংশই মালিকদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার হয়েছে। শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধে সরকার যে প্রণোদনা দিয়েছিল সেই টাকা বণ্টনে বড় ধরনের গাফিলতি হয়েছে। অন্তত ১৪ লাখ ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক প্রণোদনার অর্থ পাননি। এ ছাড়া সরকার ও মালিকদের অসহযোগিতার কারণে আরও ১০ লাখ শ্রমিক বিদেশি সহায়তার অর্থ পাননি। বৃহস্পতিবার ‘তৈরি পোশাক খাতে করোনাভাইরাস উদ্ভূত সংকট : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি ভার্চুয়াল এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। টিআইবির এই গবেষণার ফল সত্যি হলে সেটা নিশ্চয়ই ভয়াবহ উদ্বেগের বিষয়। ফলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া প্রয়োজন।
টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার রপ্তানিমুখী শিল্পের এপ্রিল-জুলাই মাসের বেতন পরিশোধের জন্য ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা স্বল্প সুদে প্রণোদনা হিসেবে দেয়। যার মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের ২ হাজার ৪৪টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলে তৈরি পোশাক খাতের ঋণের পরিমাণ ৩৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীতকরণ ও সুদের হার কমানো হয়। করোনাকালে তৈরি পোশাক খাতে মোট প্রণোদনার ৯৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ (৬১ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা) দেয় সরকার। ১ দশমিক ৪০ শতাংশ (৮৭৫ কোটি টাকা) দেয় বিদেশি একাধিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা। সরকারের দেওয়া মোট প্রণোদনার ৫৯ হাজার ৯০ কোটি টাকা ভর্তুকি সুদে ঋণ সহায়তা প্যাকেজের আওতায় দেওয়া হয়। এই প্রণোদনা সহায়তা বিশ্লেষণ করে টিআইবি বলছে, এসব সহায়তার ৮৪ শতাংশ অর্থাৎ ৫২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা পোশাক কারখানা মালিকদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ এপ্রিল-জুলাই মাসে পোশাকশ্রমিকদের মোট বেতন ও ভাতা বকেয়া ছিল ১২ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। একই সময়ে শ্রমিকদের সহায়তায় বিদেশি প্রণোদনা ৮৭৫ কোটি টাকা বণ্টনে মালিকপক্ষ ও সরকারের বড় ধরনের অসহযোগিতার কারণে ওই টাকা থেকেও বঞ্চিত হন শ্রমিকরা।
ভয়াবহ বিষয় হলো মহামারীর মধ্যে সরকারি প্রণোদনার অর্থ পাওয়ার পরও বিপুলসংখ্যক পোশাকশ্রমিককে নির্মমভাবে ছাঁটাইয়ের শিকার হতে হয়েছে। টিআইবির দাবি, প্রণোদনা পাওয়া ৬৪টি কারখানার ২১ হাজার শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে সে সময়। আর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তৈরি পোশাক খাতে সব মিলিয়ে প্রায় ৬০-৬৫ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়। করোনা পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে শ্রমিকদের যেসব অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনটি তার সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। কারখানামালিকরা যে স্বচ্ছ আচরণ করেননি সে বিষয়টিও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। টিআইবি বলছে বাতিল হওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ কার্যাদেশ পুনর্বহাল হলেও বিজিএমইএ এ বিষয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। দেখা যাচ্ছে, শ্রমিকরা একদিকে আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, অন্যদিকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন। দুনিয়াজুড়ে মহামারীতে নাকাল পরিস্থিতির মধ্যেও যে শ্রমিকরা দেশের রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের চাকা ঘুরিয়ে গেলেন, তাদের এভাবে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করার অবশ্যই তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত।
