প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষা পদ্ধতি

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২০, ০৯:৩৪ পিএম

সম্প্রতি সরকার ২০১২ সালের শিক্ষানীতির আওতায় নতুন শিক্ষাক্রম প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের একটি হচ্ছে প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘সামেটিভ’ পরীক্ষা পদ্ধতি বাদ দিয়ে ‘ফরম্যাটিভ’ পরীক্ষা পদ্ধতি প্রণয়নের জন্য প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। এতদিন আমাদের প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতি ছিল সামেটিভ বা ‘সামষ্টিক’ মূল্যায়ন। যার অর্থ সারা বছর শেষে একটি পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে দেখা হতো শিক্ষার্থীরা পরের শ্রেণিতে পড়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে কি না। এ ধরনের পরীক্ষা পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বছর শেষে একজন শিক্ষার্থী যদি প্রত্যাশিত যোগ্যতা অর্জন করতে না পারে, তাহলে তার আর কোনো সুযোগ থাকে না। শিক্ষার্থীর জীবন থেকে পুরো একটি বছর নষ্ট হয়ে যায়। সেই বিবেচনা থেকে ‘ফরম্যাটিভ’ বা ‘ধারাবাহিক’ মূল্যায়ন পদ্ধতি সবসময়ই অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ও ফলপ্রসূ।

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে পরীক্ষা বা অ্যাসেসমেন্ট কী আর এর উদ্দেশ্যই বা কী সেই আলোচনা জরুরি। একই সঙ্গে জরুরি আমাদের প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতির চর্চা ও ধরন কী সেই আলোচনা। আমাদের প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতিতে মূলত শিক্ষার্থী কতটুকু পারে বা পারল তা যাচাই করা হয়। এই পারা না পারার মোটামুটি ৮০ ভাগই থাকে মুখস্থবিদ্যার দক্ষতা। আমাদের প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতির ধরনের কারণে সারা বছর ধরে শেখার চেয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাস করা বা ভালো নাম্বার পাওয়াটাই শতকরা ১০০ ভাগ শিক্ষার্থীর মূল উদ্দেশ্য থাকে। যে কারণে আমাদের শিক্ষকরাও সারা বছর পরীক্ষাকে সামনে রেখেই পড়ান। যে প্রশ্নগুলো পরীক্ষায় আসবে সেগুলোতে জোর দেন। একটু উঁচু ক্লাসে সিলেবাস, শর্ট সিলেবাস আর নিচু ক্লাসে প্রশ্ন দাগিয়ে দিয়ে পড়াশোনা করাটা আমাদের স্কুল-কলেজের স্বাভাবিক চর্চা। সামগ্রিকভাবে একজন শিক্ষার্থীর একটি সুনির্দিষ্ট শ্রেণিতে যা যা শেখার কথা ছিল সেটা গৌণই থেকে যায়। আমাদের সরকারের যে কারিকুলাম আছে সেটা যোগ্যতানির্ভর কারিকুলাম। কিন্তু একটি শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর অর্জিত শিক্ষার ফল বা যোগ্যতা যাচাই করার জন্য যে ধরনের প্রশ্নপত্র তৈরি করা প্রয়োজন, সেই প্রশ্নপত্র তৈরি করার জন্য বিশেষ জ্ঞান এবং দক্ষতা শিক্ষকদের থাকা প্রয়োজন সেটা বিবেচনায় নেওয়া হয় না। এ ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষকদের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার ঘাটতি আছে।

এই মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার জন্য প্রধানত দায়ী করা হয় মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা পদ্ধতিকে। এ পরীক্ষা পদ্ধতি মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা জিইয়ে রাখার ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। এ ব্যবস্থা পরম্পরার মতো চলে আসার ফলে মুখস্থনির্ভরতা এখন আমাদের শিক্ষাসংস্কৃতির অংশ। মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা হলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হচ্ছে শিক্ষার্থীর শিক্ষাগ্রহণের মধ্যে দিয়ে আরও যে পাঁচটি বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ (বোধ্যগম্যতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, প্রয়োগের ক্ষমতা, মূল্যায়নের ক্ষমতা এবং সৃষ্টিশীলতা) হওয়ার কথা ছিল সেটা হয় না অথবা সেই বিকাশগুলো বাধাগ্রস্ত হয়। শিক্ষাগ্রহণের উদ্দেশ্য যদি হয় শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ তাহলে এ পরীক্ষা পদ্ধতি পাল্টানোর কোনো বিকল্প নেই। সেই জায়গা থেকে ধারাবাহিক বা ‘ফরম্যাটিভ’ পরীক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন অবশ্যই প্রয়োজনীয় এবং যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হতে পারত। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা গবেষক এবং শিক্ষা বিজ্ঞানীরা এটা প্রয়োজনীয় মনে করছেন কিন্তু একই সঙ্গে এর বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। শিক্ষাবোদ্ধারা ফরম্যাটিভ পরীক্ষা পদ্ধতির ক্ষেত্রে যে প্রশ্নগুলো সামনে আনছেন সেটা মূলত বাস্তবায়নকেন্দ্রিক। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষার্থীদের নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের নৈতিকতার মান, পক্ষপাতদুষ্টতা, শিক্ষকের হাতে অনেক বেশি ক্ষমতা চলে যাওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলোই বিভিন্ন আলোচনায় সামনে উঠে আসছে।

এবার আসি যাচাই বা পরীক্ষার উদ্দেশ্য আসলে কী হওয়া উচিত সেই প্রশ্নে। একজন শিক্ষার্থীকে যাচাই করা উচিত এই জায়গা থেকে যে সে কতটুকু শিখল আর কতটুকু শিখতে পারল না তা বোঝার জন্য। এটা বুঝে একজন শিক্ষক কী করবেন? একজন শিক্ষক সেই শিক্ষার্থী যেখানে পারল না বা যে যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি সেই যোগ্যতা অর্জন করতে, শিক্ষার্থীকে শিখতে সহযোগিতা করবেন। একজন শিক্ষক যদি নাই জানতে পারেন তার শিক্ষার্থীরা শেখার ক্ষেত্রে ঠিক কোথায় কোথায় সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তাহলে সহযোগিতা করবেন কীভাবে? পরীক্ষা বা যাচাইয়ের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীকে শিখতে সহযোগিতা করা, শিক্ষার্থীকে অযোগ্য প্রমাণ করে অকৃতকার্য করা নয়।

অন্যদিকে এবার ফরম্যাটিভ অ্যাসেসমেন্ট কী সেই প্রশ্নে আসি। ফরম্যাটিভ অ্যাসেসমেন্টকে কনটিনিউয়াস অ্যাসেসমেন্ট বা ধারাবাহিক মূল্যায়নও বলা হয়। এ যাচাই পদ্ধতিটি মূলত শিক্ষকের জন্য। শিক্ষককে তার শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে এবং কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য এ যাচাই পদ্ধতিটি সহযোগিতা করে। কীভাবে? শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের যাচাই করে বের করবেন শিখনের কোথায় কোথায় কোন কোন ছাত্র দুর্বল রয়েছে, পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের শিখনের প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষে নিজের নির্দেশনা পরিবর্তন করবেন। আর ক্রমাগত এই প্রক্রিয়াটি অনুশীলন করার মধ্যে দিয়ে তিনি দুর্বল শিক্ষার্থীদের শিখতে সহযোগিতা করবেন।

ফরম্যাটিভ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রধান যে সমস্যাটি নিয়ে শিক্ষা বোদ্ধারা বলছেন, সেটা হচ্ছে আমাদের ক্লাস সাইজ এবং কনটাক্ট আওয়ার। আমি এখানে শুধু প্রাথমিক শিক্ষারটা উল্লেখ করছি। সরকারিভাবে আমাদের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে, প্রতি শ্রেণিতে গড়ে ৪৫ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা, কিন্তু অঞ্চলভেদে এ সংখ্যাটা ভিন্ন হয়। সাধারণত দেখা যায় আমাদের ক্লাস সাইজ গড়ে ৬৪। সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রতিটি ক্লাস ৪০ মিনিট হওয়ার কথা। এ গড়ে ৬৪ জন শিক্ষার্থী এবং ৪০ মিনিট শিক্ষাদানের সময়ের মধ্যে যদি শিক্ষকদের নিয়মিত যাচাই করতে হয় তাহলে তাদের নির্দেশনা প্রদানের সময় কমে যাবে এবং নির্দেশনা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। এটা আসলে পুরোটাই মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। ফরম্যাটিভ অ্যাসেসমেন্টকে যদি শিক্ষকরা তাদের নির্দেশনা প্রদানের অংশ হিসেবে নেয় তাহলে আসলে খুবই সম্ভব এ যাচাই প্রক্রিয়াটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা।

২০১৪-১৬ এই তিন বছর প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করেছি। যে প্রকল্পে আমাদের অন্যতম প্রধান একটি বিষয় ছিল শিক্ষকদের এ ফরম্যাটিভ যাচাইয়ের সঙ্গে পরিচিত করা, সে প্রশ্নপত্র তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরিতে সহযোগিতা করা। সর্বোপরি এ প্রশ্নপত্র ব্যবহার করে বছরে অন্তত তিনবার এমন যাচাই সম্পন্ন করা। এ প্রশ্নপত্রটি ব্যবহার করে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের যাচাই করে দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করেছে এবং একই সঙ্গে শিক্ষকদের নির্দেশনার কোথায় পরিবর্তন করতে হবে সেটিও চিহ্নিত করেছে। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দেশনা পরিবর্তনও করেছে। একেক সেমিস্টারে সাতটা বিভাগে মোট ১ লাখ ৬০ হাজার এমন শিক্ষার্থীর যাচাই প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করা গেছে।

বাস্তবায়নের পুরো বিষয়টি উদাহরণ দিয়ে বোঝালে সুবিধা হবে। যেমন দ্বিতীয় শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের বাংলা পড়ে বুঝতে পারার কথা। শিক্ষক যাচাই করে দেখলেন ২০ জন শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে ‘পাঠ’ করতে পারে না। তাদের মধ্যে ১৫ জন হয়তো যুক্তাক্ষর ভালোভাবে চেনে না। আবার যারা ‘পাঠ’ করতে পারে তাদের মধ্যে হয়তো ১০ জন যা পড়ছে তা বুঝতে পারছে না। শিক্ষক তখন জেনে গেলেন তাকে যুক্তবর্ণ ভালোভাবে পড়াতে হবে এবং এও জানলেন যে, তার শ্রেণিকক্ষে কোন শিক্ষার্থীদের বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে, কোন বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। শিক্ষক যদি জানেন তার কোন শিক্ষার্থীরা কোন কোন বিষয় পারছে না, তাহলে সেসব দুর্বল শিক্ষার্থীকে শেখানোর জন্য তিনি অনেক ধরনের কৌশল অবলম্বন করতে পারেন। যেমন সবল ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে বসানো, শিখন প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট ছোট দলে শিক্ষার্থীদের ভাগ করে বসানো। এ কৌশলগুলো নতুন কিছু নয়। আমাদের সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতেই কৌশলগুলো শেখানো হয়।

এবার আসি কনটাক্ট আওয়ারের আলোচনায়। একজন শিক্ষার্থীর জন্য ৩ থেকে ৪ মিনিট লাগে বাংলায় মৌখিক যাচাই সম্পন্ন করতে। একই শ্রেণিতে সবল ও দুর্বল শিশু থাকে। সে বিবেচনা থেকে আমরা দেখেছি গড়ে একটি ক্লাসে ১২ জনের যাচাই করা সম্ভব। ক্লাস সাইজ যদি ৪৫ হয় তাহলে তিনটি ক্লাস এবং ৬০ হলে পাঁচটি ক্লাস লাগে। আরেকটু কৌশলী হলে এই সময় আরও কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রতি সেমিস্টারে এই তিন থেকে পাঁচটি ক্লাস যাচাইয়ের কাজে নিয়োজিত করা হলে শিক্ষার্থীদের শিখন প্রক্রিয়া অনেক বেশি কার্যকর ও ফলপ্রসূ করা সম্ভব। আমরা দেখেছি শুধু বাংলা বিষয়ের ক্ষেত্রে কিন্তু একইভাবে ফরম্যাটিভ যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সব বিষয়ের ক্ষেত্রেই কার্যকর ফল আনা সম্ভব।

লেখক প্রাক্তন শিক্ষা গবেষণা ও বাস্তবায়ন প্রফেশনাল, ‘রিড’ প্রকল্প

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত