সংবাদপত্রের সংকট ও দেশ রূপান্তরের এগিয়ে চলা

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:৩০ এএম

দৈনিক দেশ রূপান্তর যখন প্রতিষ্ঠার ২ বছর পূর্ণ করছে, তখন বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে চলছে কভিড-১৯ নামের এক দীর্ঘস্থায়ী মহামারী। এর অভিঘাতে অর্থনীতি পর্যুদস্ত, জীবন-জীবিকা সংকটাপন্ন। দেশের মিডিয়ার সামনে দেখা দিয়েছে এক অশনিসংকেত। করোনাকালের অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত প্রায় সব মিডিয়া হাউজ। করোনা সংক্রমণ, ছাঁটাই, বাধ্যতামূলক ছুটি, অনিয়মিত বেতন। নজিরবিহীন এক সংকটে গণমাধ্যমকর্মীরা। সংকটে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোও। সার্কুলেশন কমেছে প্রিন্ট মিডিয়ার। এমনিতেই তেমন একটা নেই সরকারি বিজ্ঞাপন, প্রায় বন্ধের উপক্রম বেসরকারি ব্যবসা-বাণিজ্যের বিজ্ঞাপনও। সরকারি-বেসরকারি বকেয়া বিলের স্তূপ এ সংকটকে করেছে গভীর।

এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকা এবং সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পাঠকের তথ্যপিপাসা মেটানোর চেষ্টা নিঃসন্দেহে অনেক বড় ব্যাপার। সে জন্য একজন পাঠক হিসেবে শুরুতেই দেশ রূপান্তর কর্র্তৃপক্ষকে অভিনন্দন জানাই। নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে সময় পার করলেও দেশ রূপান্তর পাঠকপ্রিয়তা লাভ করছে, দেশের সীমা ছাড়িয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাভাষী পাঠকের ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়েছেএটা একটা সার্থকতা। 

সারা বিশ্বেই সাংবাদিকতা এখন বেশ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ছাপানো পত্রিকার গায়ে কুবাতাস বইছে। মরণদশায় পেয়ে বসেছে প্রিন্ট মিডিয়াকে। কমছে সার্কুলেশন, কমছে বিজ্ঞাপন। আর এর ফলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন সংবাদপত্র। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনেক নামি-দামি মুদ্রিত সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট জার্নালিস্টস নেটওয়ার্কের তথ্য মতে, করোনার প্রথম চার মাসেই দেশের উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় শহর থেকে প্রকাশিত ৪৫৬টি স্থানীয় সংবাদপত্রের মধ্যে ২৭৫টি (৬০.৩১%) সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। জাতীয় পর্যায়ের সংবাদপত্রগুলোও ধুঁকছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার একচেটিয়া আধিপত্য ও জনপ্রিয়তা। সোশ্যাল মিডিয়া সংবাদপত্রের প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছে। একদিকে ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারের প্রভাব, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিরূপতা, আর্থিক সংকট সাংবাদিকতা পেশার জন্য এক প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মান ধরে রাখার, প্রতি মুহূর্তে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা, প্রতি মুহূর্তে বদলে যাওয়া পাঠকের আকাক্সক্ষার সঙ্গে সংগতি রেখে নিউজ-কনটেন্ট সাজানো, অবিশ্বাস্য দ্রুততায় নির্ভুলভাবে খবরকে তুলে আনার দক্ষতা। কোনো কিছুই যেন একপেশে, একঘেয়ে ও বৈচিত্র্যহীন না হয় তা উপলব্ধি করা। সেই অনুযায়ী সংবাদপত্রের কনটেন্ট বিন্যাস ও উপস্থাপন করা। কাজটা অত্যন্ত কঠিন। এর জন্য প্রস্তুতি ও বিনিয়োগ দরকার। যা এই মুহূর্তে সংবাদপত্রগুলোর নেই।

একথা ঠিক যে সংবাদপত্রের বিষয়বৈচিত্র্যে এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগে শুধু সংবাদ থাকত। এখন সংবাদের সঙ্গে সংবাদ বিশ্লেষণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, সিনেমা, ফ্যাশন, আইটি, রান্নাবান্না কত কী দেওয়া হচ্ছে! এমনকি ছাত্রদের নোট পর্যন্ত। আগে পত্রিকা ছিল আট পৃষ্ঠার। এখন ষোল, বিশ, বাইশ, চব্বিশ পৃষ্ঠার। শুধু তাই নয়, পত্রিকার সঙ্গে বিনামূল্যে একাধিক ম্যাগাজিন, যা আগে কেউ কোনোদিন কল্পনাই করতে পারত না। তারপরও পাঠকের অভিযোগ সংবাদপত্রে কিছু নেই, কিছুই থাকে না! বিষয়টা বিবেচনার দাবি রাখে। তাই এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা ও অনুসন্ধান জরুরি। প্রথমেই অনুসন্ধান করা দরকার কেন এ অভিযোগ।

আগের দিনে সংবাদপত্রে কিছু লেখা হলে সর্বত্র তোলপাড় হতো। ঘুষ, দুর্নীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, রাজনীতি যে কোনো বিষয়েই হোক না কেন। কিন্তু আজ, আজ কোনো কিছু নিয়ে লিখলে তোলপাড় হয় না বরং তা নিয়ে নানান প্রশ্ন, সন্দেহ-সংশয় দেখা দেয়। সংবাদমাধ্যম সবচেয়ে বেশি হারিয়েছে বিশ্বাসযোগ্যতা। মানুষ এখন আর গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বিশ্বাস করতে চায় না। মিথ্যা, ভুল, খণ্ডিত, মতলবি খবর প্রকাশ করে করে সংবাদমাধ্যমই নিজেদের সর্বনাশ নিজেরা করেছে।

দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন, সমাজের মানস গঠন, বিজ্ঞানমনস্কতা, উদ্ভাবন-আবিষ্কারের খবর ইত্যাদি বিষয়ও সংবাদপত্রে তেমন একটা দেখা যায় না। সমাজের ইতিবাচক বিষয়গুলো এখনো সংবাদমাধ্যমে যথাযথ গুরত্ব পায় না। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় খেলা বিশেষ করে ক্রিকেটের খবর, সাজপোশাক, ফ্যাশন, শোবিজ জগতের খবর। কিছু খুন-খারাবির ঘটনা, কিছু মত-মন্তব্য, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, কিছু ধর্মীয় বয়ান ইত্যাদি। কিন্তু বিজ্ঞানের খবর তাতে দেখা যায় না। কালেভদ্রে মৃত এক-আধজন বিজ্ঞানীর একটা ছবি দিয়ে হয়তো টেক্সটবুক স্টাইলে একটা রস-কষহীন বর্ণনা ছাপা হয়।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের হিসাব অনুযায়ী দেশে ৩৮টি পাবলিক এবং ৯০টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ১৬ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে ১২৮টি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি কলেজ ও সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে ৫৯৮টি, বেসরকারি কলেজ রয়েছে ২,৮৯৯টি, সরকারি মেডিকেল কলেজ ৩৬টি, আর রয়েছে প্রায় ৭০টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ। উচ্চশিক্ষার এই যে বিপুল আয়োজন, সেই আয়োজন কি সত্যসত্যই অন্তঃসারশূন্য? কোথাও কোনো গবেষণা হয় না? কোথাও কোনো ভালো ছাত্র ও ছাত্রী আন্তর্জাতিক মানের কাজ করে না? সেসব খবর কোথায়?

গণমাধ্যমে চাষবাসের খবর বলতে গেলে থাকেই না। কোনো কোনো বাংলা কাগজে কৃষির জন্য একটি সাপ্তাহিক পাতা বরাদ্দ আছে বটে, কিন্তু সে সব লেখা পড়লে মনে হয় সরকারের কৃষি দপ্তরের হ্যান্ড আউট পড়ছি বাংলায়। অথচ গোটা দেশে মোট জনসংখ্যার অন্তত ৭০ শতাংশ আজও কৃষিনির্ভর। একটা প্রচণ্ড খাদ্যঘাটতির দেশ আজ খাদ্যে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর। হাতেকলমে কাজ করে যে মানুষগুলো দুর্ভিক্ষ থেকে দেশকে উদ্ধার করলেন, দুধ উৎপাদনে দেশকে এগিয়ে নিলেন, মৎসচাষে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনলেন, তাদের স্বীকৃতি সংবাদমাধ্যমের পাতায় বা পর্দায় কোথায়? ফি বছর আমের মৌসুম বা ফুলের সিজনে একজন, দু’জন চাষির কাহিনী ঘুরেফিরে সংবাদমাধ্যমের দাক্ষিণ্য পায়। কিন্তু প্রতিনিয়ত যারা সাফল্যের ফুল ফোটাচ্ছেন, তাদের আমরা চিনি না। বন্যা বা খরায় ধান, আলু, সবজি মার খেলে তাবৎ সংবাদমাধ্যমে গেল গেল রব ওঠে। তখন কৃষিমন্ত্রী, কৃষি সচিব, কৃষি পরামর্শদাতা, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের বক্তব্য ফলাও করে সংবাদমাধ্যমে প্রচার পায়। ক’জন কৃষিজীবী, যাদের ফলিত জ্ঞান যে কোনো মন্ত্রী, সচিব, অধ্যাপক ও পরামর্শদাতাদের চেয়ে বেশি ছাড়া কম নয় ওই প্রচারের আলোতে আসেন? কৃষির পরেই সবচেয়ে বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয় ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র শিল্পে, যেখানে এক একটি সংস্থায় মালিকসহ কর্মচারীর সংখ্যা নয় থেকে দশ। এ ধরনের সফল সংস্থার মালিক ও কর্মচারীদের কথা সংবাদ মাধ্যমে দেখি না। কেন দেখি না, এর উত্তর নেই।

বিগত তিন দশকে সাংবাদিকদের মন-মানসিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। অতীতে সাংবাদিক মানে একজন আদর্শ নীতিনিষ্ঠ সাহসী ব্যক্তিত্বকে বোঝাত। কিন্তু এখন বিষয়টা সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। এখন অনেক ক্ষেত্রেই সাংবাদিকতায় আদর্শের কোনো বালাই নেই। সাংবাদিকরা অনেকেই এখন রাতারাতি ধনী হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে ফ্ল্যাট, গাড়ি, বাড়ি করেছেন। এ প্রতিযোগিতায় ইতিমধ্যে কেউ কেউ কোটিপতি পর্যন্ত হয়েছেন। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে।

গণমাধ্যমের এই সামগ্রিক অধঃপতনের মধ্যে ‘দেশ রূপান্তর’ যে স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে পথ চলছে, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে দায়িত্বশীলতার জায়গায় ভূমিকা পালন করে টিকে রয়েছে, এজন্য সাধুবাদ জানাই। তবে টিকে থাকাই শেষ কথা নয়। উত্তরোত্তর উন্নয়ন ও এগিয়ে যাওয়ার পথপদ্ধতি খুঁজে বের করাই হবে মূল কাজ। এ ক্ষেত্রে পাঠকের দায়িত্ব খুব অল্প। কর্র্তৃপক্ষের দায়িত্ব অনেক বেশি।

লেখক : লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত