স্থানীয় সরকার নির্বাচন

তৃণমূল আ.লীগে আরও চড়েছে বিরোধ-বিভেদ

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২০, ০২:১৩ এএম

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তৃণমূলে নতুন করে বিরোধ-বিভেদ দানা বেঁধেছে। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কেন্দ্রে নাম পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে তৃণমূলের নেতা ও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের একাংশ এই বিরোধ-বিভেদে জড়িয়েছেন। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে থেকে নাম নির্বাচন করে কেন্দ্রে পাঠানো নিয়ে প্রশ্ন তুলে তৃণমূল নেতাদের একাংশ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকা অপরপক্ষের নেতাদের বিরুদ্ধে ভূরিভূরি অভিযোগ উত্থাপন করছেন। এ পরিস্থিতিতে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলটির বিভিন্ন জেলা-উপজেলা ইউনিটে।

অভিযোগকারীরা বলছেন, নাম নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা নেতা ও দলীয় সংসদ সদস্যরা স্বচ্ছতার সঙ্গে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নাম কেন্দ্রে পাঠাচ্ছে না। দলের মঙ্গলের কথা চিন্তা না করে আর্থিক লেনদেন অথবা দলের লোক নয়, নিজের লোক বিবেচনায় নাম পাঠানো হচ্ছে কেন্দ্রে। এমনকি এর ফলে বিএনপি-জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের পরিবারের সদস্যরাও নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন। আবার কেন্দ্র থেকে রাতে নৌকার প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থী সকালে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে এমন নজিরও রয়েছে। আর প্রার্থী নির্বাচনে এমন অনিয়ম চলায় সংগঠনে কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের সভায় নাটোরের গোপালপুর পৌরসভায় চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয় কাজী আছিয়া জয়নুলকে। গতকাল শনিবার সকালে হঠাৎ ওই নাম পরিবর্তন করা আরেকজনকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়। এভাবে রাতে চূড়ান্ত প্রার্থী থাকলেও সকালে পরিবর্তন হওয়ার ঘটনাও একাধিক। এ ধরনের ঘটনাও সংগঠনে বিরোধ-বিভেদের জন্ম দিচ্ছে। 

এক পক্ষের দাবি অযোগ্য-অদক্ষ-অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা এবং জামায়াত-বিএনপি ও যুদ্ধাপরাধীদের স্বজনরা আর্থিক লেনদেন করে মনোনয়ন বাগিয়ে নিচ্ছেন। আর যোগ্য-দক্ষ ও ত্যাগীরা সুযোগহারা হচ্ছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে অন্য পক্ষ দাবি করছে, মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে অভিযোগকারীরা। এসব অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। আর এই পক্ষের দাবির সঙ্গে কোনো কোনো কেন্দ্রীয় নেতা একমত। কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, মনোনয়ন নিয়ে পরস্পরবিরোধী গ্রুপ এসব অপপ্রচার ছড়াচ্ছে। অভিযোগ মুখে মুখে করা হচ্ছে। যথাযথ প্রমাণসহ কোনো অভিযোগ নেই।

কুড়িগ্রাম সদর পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান সাজু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তৃণমূল থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নাম কেন্দ্রে পাঠানোর প্রক্রিয়া ভুল ছিল বলে সদর পৌরসভায় একজন যুদ্ধাপরাধীর ছেলে কাজীউল আলম মনোনয়ন পেয়েছেন। এই জেলার দায়িত্বশীল নেতারা কাজীউল আলম থেকে সুবিধা নিয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে তালিকায় নাম পাঠিয়েছেন। এলাকার সবাই জানে কাজীউল আলম যুদ্ধাপরাধীর সন্তান।’ কুড়িগ্রাম সদরে প্রথম ধাপে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

কুমিল্লা উত্তর জেলায় দাউদকান্দি পৌরসভায় যুদ্ধাপরাধী হিসেবে পরিচিতের নাতি নাঈম ইউসুফ সেইন গতবার আওয়ামী লীগের মনোনয়নে মেয়র নির্বাচিত হন। অথচ এলাকায় তার দাদা আবদুস সামাদ মুক্তিযুদ্ধে গঠিত রাজাকারদের সংগঠন শান্তি কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ওই এলাকার রাজনৈতিক নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দায়িত্বশীল নেতাদের পকেটের লোক হয়ে যাওয়া সেইন গতবার মেয়র নির্বাচিত হন। এবারও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নাম কেন্দ্রে পাঠানো হয় বলে তালিকায় তার নাম এক নম্বরে দেওয়া হয়েছে। দাউদকান্দি পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি পদে থাকা এক নেতা বলেন, সেইন অনেক টাকার মালিক। আর্থিক লেনদেন করে এবারও স্থানীয় নেতাদের ম্যানেজ করে কেন্দ্রে নাম পাঠিয়েছেন তিনি।

অভিযোগ আছে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে আসা নেতারাও নৌকার টিকিট পেয়েছেন। এগুলো স্থানীয় দায়িত্বশীল নেতাদের অরাজনৈতিক কর্মকা-ের কারণে ঘটছে বলে দাবি তৃণমূল নেতাদের অনেকেরই। টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তৃণমূল থেকে যেই প্রক্রিয়ায় মনোনয়ন দেওয়ার প্রস্তাব কেন্দ্রে যায় তা প্রশ্নবিদ্ধ। জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক অথবা সংসদ সদস্যদের কাউকে কাউকে ম্যানেজ করতে হয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশীকে। তারা ম্যানেজ হলেই কেবল কেন্দ্রে নাম পাঠানোর সুযোগ মেলে মনোনয়ন আগ্রহীদের। এর ফলে তৃণমূলের সংগঠনের যে ঐক্য থাকা প্রয়োজন স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের অস্বচ্ছ কর্মকান্ডে তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের একজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে যারাই মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে কেন্দ্রে নাম পাঠিয়েছেন তাদের সবাইকেই স্থানীয় দায়িত্বশীল নেতা ও দলীয় সংসদ সদস্যকে আর্থিক লেনদেন করে ম্যানেজ করতে হয়েছে। এখানে দায়িত্বশীল নেতারা মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে দুই কোটি টাকা তুলবেন ঘোষণা দিয়েছেন, যা স্থানীয় সবার জানা। যারা কেন্দ্রে নাম পাঠাতে চান তাদের এই টাকা দিতে হবে।’

কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন স্থানেও একইরকম ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রার্থীরা তদবির করে মনোনয়ন নিতে পারলে টাকা খরচ করতে রাজি। কারণ এখন মনোনয়ন নিতেই যা কাটখড় পোড়ানো। দলীয় মনোনয়ন নেওয়া গেলে জিততে আর কোনো বাধা থাকবে না।’

কেন্দ্রীয় নেতাদেরও একটি অংশ তৃণমূল থেকে অভিযোগ আসার সত্যতা স্বীকার করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, তৃণমূল নেতাদের এমন অসংখ্য অভিযোগ দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা পড়েছে। এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

দলের সম্পাদকমন্ডলীর দুই সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই তৃণমূলের নাম প্রস্তাবের বাইরেও আগ্রহী প্রার্থীকে দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে ওই অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতাদের সুপারিশ নিতে হবে।

সম্পাদকমন্ডলীর ওই দুই সদস্য আরও বলেন, কেন্দ্রীয় এই সিদ্ধান্তের ফলে যোগ্য বা ত্যাগীদের মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল তা আর রইল না। তৃণমূল থেকে নাম না এলেও কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডের বিবেচনায় ত্যাগ স্বীকার করা যে কারও মনোনয়ন পাওয়ার সুযোগ থেকে যায়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মনোনয়নবঞ্চিতরা অপপ্রচার ছড়াচ্ছে। এসব অভিযোগের প্রকৃতপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তৃণমূলের নেতৃত্বকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় তৃণমূল নেতৃবৃন্দকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ পাওয়া গেছে কিছু কিছু জায়গায়। এই প্রক্রিয়ার ‘মিস ম্যানেজমেন্ট’ করছেন স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেন্দ্রে নাম পাঠানোর ইস্যুতে অনেক জেলা-উপজেলায় আর্থিক লেনদেন করার মতো গুরুতর অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। এ কারণে কেন্দ্রীয় নেতাদের সুপারিশে আগ্রহী প্রার্থীদেরও মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত