শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা কোথায়

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:৩৩ এএম

করোনা মহামারীর শুরুর দিনগুলোতেই হোঁচট খেতে শুরু করেছিল দেশের বিভিন্ন শিল্প খাতের কল-কারখানাগুলো। প্রথম দিকের টানা লকডাউন পরিস্থিতিতে গণপরিবহনসহ শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদনও থমকে যায়। কিন্তু সরকার সে সময়ই তৈরি পোশাক খাতসহ রপ্তানিমুখী শিল্প খাতগুলোর জন্য বিপুল অঙ্কের বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সম্ভাব্য বিপর্যয় রোধে অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এরপরও মালিকপক্ষের একগুঁয়েমিতে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি অমান্য করে শ্রমিকদের শিল্পাঞ্চলে টেনে আনা হয়। গণপরিবহনহীন মহাসড়কগুলোতে শ্রমিকদের দীর্ঘ পদযাত্রার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। মূলত সে সময় থেকেই একের পর এক রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঢল শুরু হয়। একইসঙ্গে তখন সমালোচিত হয় কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা সময়মতো পরিশোধ না করা নিয়ে। অথচ, এসব কারখানার মালিকরাই সরকারি প্রণোদনার অর্থ সবার আগে পেয়েছেনযা দেওয়াই হয়েছিল শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের জন্য। এখন দেখা যাচ্ছে করোনাকালে ছাঁটাই করা শ্রমিকদের যথাযথ তালিকাও দিচ্ছেন না কারখানা মালিকরা। যে কারণে বিদেশি দাতাদের প্রদেয় অর্থ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বেকার শ্রমিকরা। যা শুধু দুঃখজনকই নয়, পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য এবং নিন্দনীয়।

এরই মধ্যে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি গত সপ্তাহে এক গবেষণায় দাবি করেছে করোনা পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধে সরকার যে প্রণোদনার অর্থ দিয়েছে তার ৮৪ শতাংশই মালিকদের ভিন্ন ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার হয়েছে। এর ফলে অন্তত ১৪ লাখ ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক প্রণোদনার অর্থ পাননি। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো মহামারীর মধ্যে সরকারি প্রণোদনার অর্থ পাওয়ার পরও বিপুল সংখ্যক পোশাক শ্রমিককে নির্মমভাবে ছাঁটাইয়ের শিকার হতে হয়েছে। টিআইবির দাবি প্রণোদনা পাওয়া ৬৪টি কারখানার ২১ হাজার শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে সে সময়। আর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তৈরি পোশাক খাতে সবমিলিয়ে প্রায় ৬০-৬৫ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়। যদিও অন্যান্য গবেষণা এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী করোনাকালে অন্ততপক্ষে এক থেকে দেড় লাখের বেশি শ্রমিক স্থায়ীভাবে ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। এছাড়া সাময়িকভাবে বরখাস্ত বা ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন আরও বেশ কয়েক হাজার শ্রমিক। কিন্তু তৈরি পোশাক কারখানাসহ অন্যান্য শিল্পকারখানার মালিকরা শুরু থেকেই শ্রমিক ছাঁটাই এবং বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়ে নানারকম বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে এ বিষয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি করেছেন। এই বিষয়টিও উঠে আসে টিআইবির প্রতিবেদনে। টিআইবি বলছেবাতিল হওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ কার্যাদেশ পুনর্বহাল হলেও বিজিএমইএ এ বিষয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।

রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘শ্রমিকদের জন্য ইইউ-জার্মানির প্রণোদনা : ৭,৩৯০ বেকার শ্রমিক খুঁজে পেয়েছে কমিটি’ শিরোনামের আরেক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয় শ্রমিক ছাঁটাই নিয়ে রপ্তানিমুখী কারখানার মালিকদের মিথ্যা তথ্য দেওয়ার বিষয়টি। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, করোনাকালে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জার্মানির সরকারের ১১৩ মিলিয়ন ইউরো বা ১ হাজার ১৭৫ কোটি টাকার প্রণোদনার অর্থ বিতরণে সংকট তৈরি হয়েছে শ্রমিক ছাঁটাইয়ে যথাযথ তালিকা না থাকার কারণে। ১০ লাখ শ্রমিকের জন্য জনপ্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে ৩ মাস ধরে এই সহায়তা বিতরণ করার কথা। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করেছিল শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। ১৫ ডিসেম্বর কমিটির বৈঠকে প্রণোদনার যোগ্য হিসেবে ৭ হাজার ৩৯০ জন শ্রমিকের তালিকা করা হয়েছে। এ ছাড়া বণ্টনের পর অবশিষ্ট যে টাকা থাকবে, সেটাও শ্রমিকের কল্যাণে ব্যয়ের জন্য প্রস্তাব দেবে কমিটি। কিন্তু কারখানা মালিকদের দেওয়া এই ছাঁটাইয়ের তালিকা অসম্পূর্ণ এবং সঠিক নয় বলে তা নাকচ করে দিয়েছেন খোদ শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান। মাত্র সাত হাজারের মতো ছাঁটাইকৃত শ্রমিকের তালিকা নিয়ে প্রতিমন্ত্রী শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা তো বিশ্বাসযোগ্য না। এখন নাকি এই তালিকা ১০ হাজার জনে পৌঁছেছে। আমার কাছে গোয়েন্দা প্রতিবেদন আছে। ১ লাখের বেশি চাকরি হারানোর তথ্য আমার কাছে আছে।’

করোনাকালে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রদানে গড়িমসির পর ছাঁটাই করা শ্রমিকদের তালিকা নিয়ে এমন অসত্য তথ্য প্রদান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সেটাও যথেষ্ট নয়। এখন মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে কারখানা মালিকদের সংগঠনগুলোর প্রতি কঠোর হয়ে তাদের কাছ থেকে করোনাকালে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা আদায় করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকাশিল্পের কর্মহীন হয়ে পড়া ও দুস্থ শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। যাতে সরকারি প্রণোদনার অর্থ কিংবা বিদেশি দাতাদের সহায়তা প্রকৃত বেকার ও দুস্থ শ্রমিকদের হাতে পৌঁছায়। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত