প্রথম অধ্যায় : প্রথম পরিচ্ছেদ
(শহীদ মুনীর চৌধুরী ও শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর বোর্ড বই অনুসারে)
গত সংখ্যার পর
বিশে^র সব দেশেরই প্রধান ভাষা আছে। এই ভাষাগুলো বিভিন্ন অঞ্চলজুড়েও বিস্তৃত থাকে। যেমন আমাদের বাংলাদেশের মাতৃভাষা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের মানুষের প্রধান ভাষা। এর কারণ হলো, ব্রিটিশ আমলে এবং তারও আগে মোঘল, সুলতান, হিন্দু রাজাদের বিভিন্ন আমলজুড়ে শাসনকালে বাংলাদেশ ভারতবর্ষের অংশ ছিল। তখন পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশ এক ছিল। যদিও তাদের মধ্যে যুদ্ধ, বিদ্রোহের কারণে এই দুটি অঞ্চল নানা সময় নানা ভাগে ভাগ হয়েছে। আবার কখনো বড় হয়েছে কোনো প্রতাপশালী, ক্ষমতাবান শাসকের বিজয়ের ফলে। ফলে অঞ্চলটির মাতৃভাষা হয়েছে বেশিরভাগ মানুষের মুখের ও লেখার ভাষা বাংলা। ভারতবর্ষ ১৯৪৭ সালে আলাদা হয়ে গেলে ব্রিটিশরা বিদায় নেওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তান এটি পাকিস্তানের অংশ হয়েছে ও ভারত নামের আলাদা একটি বিশাল দেশের জন্ম হয়েছে। তবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মুখের ভাষা বাংলাই রয়ে গেল। তারা আমাদের মতোই বাংলা লিপি বা অক্ষরে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে মনের কথা লেখেন। সাহিত্য, গান, কবিতা ইত্যাদি রচনা করেন। এই হলো ভাষার ভাগ।
এই ভাগের ভেতরে আরও ভাগ আছে। শত শত বছর জুড়ে নানা কারণে অনেক কিছু ভাষার মধ্যে মিশে ভাষা ছোট হয়ে গিয়েছে। কোনো অঞ্চলে একটি কথ্য রীতি প্রধান হয়েছে, যদিও লেখার রীতি মূল ভাষাটিই থেকেছে। যেমন আমাদের বাংলাদেশ যারা ভাষাকে ভিত্তি করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে; ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কথা তো সবারই জানা ফলে আলোচনা এখানে আর হলো না; এই দেশের নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষের একটি কথা বলার ভাষা আছে। তারা পানিকে বলেন ‘হানি’। ইংরেজিতে হানি মানে ‘মধু’। বরিশালেরও তাই, ময়মনসিংহেরও তেমন। এই উপভাষাগুলো সব দেশের মতো অঞ্চলের ভিত্তিতে, আঞ্চলিকতার টানে মুখে উচ্চারিত হয়। তাই উচ্চারণগুলোও ভিন্ন হয়। এ তেমন কঠিন কিছু নয়, বোঝা। মেয়েরা আঞ্চলিক ভাষায় বেশি কথা বলেন খেয়াল করলে জানা যায়।
আঞ্চলিক ভাষাগুলোর মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য থাকে। সেগুলো লেখা, উচ্চারণ, সংস্কৃতির টানে সমৃদ্ধ বা দুর্বল হয়। এই হলো ভাষার চলমানতা। ভাষা এভাবে এগিয়ে চলে জীবন্ত প্রাণের মতো। তবে এই ভাষাগুলোকে ভাষাবিজ্ঞানী ও বিদগ্ধজনেরা মূল ভাষাটির চেয়ে দুর্বল বলেন। বেশিরভাগ মানুষ প্রধান ধারাটি লেখা, পড়া ও চলা, বলায় ব্যবহার করেন বলে আঞ্চলিক ভাষার মানুষেরা তাতে মিশে যান। সেটি হলো ‘আদর্শ ভাষা’। যেমন বাংলাদেশের বাংলা ভাষা হলো আদর্শ, বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য।
ভাষার রূপ : অনেকভাবে ভাষার ব্যবহার হয়। যেমন আকার, ইঙ্গিত, আঁকাতে ভাষা থাকে। তবে তার প্রধান রূপটি হলো লেখা ও মুখের কথা। কোনো শিল্পী যে দেশের, তিনি সেই দেশের ভাষায়, সেই ভাষার মানুষের সঙ্গে মিলে-মিশে ছবি আঁকেন; সিনেমা বানান। এই জন্য ভ্যানগগ ও জয়নুল আবেদিন নামের শিল্পীর কাজে পার্থক্য হয়। সে আলাপে নয়, ভাষার আলাপে থাকি।
ভাষার মুখের ব্যবহার বা মৌখিক রূপ আভিধানিকভাবে তার একটি অঙ্গ বা অংশ হলো মুখের কথার চলমান বা এখন যা চলছে, সেই রীতি। ভাষাবিজ্ঞানীরা একে ভাষার চলিত কথ্য রীতি বলে ডাকেন। আরেকটি বলেছি আগেই আঞ্চলিক কথ্য রীতি। বাংলা ভাষাও এর বাইরে নয়। তবে ভাষার বিবর্তনে সমৃদ্ধ হওয়া আমাদের বাংলার আছে সমৃদ্ধ ও উন্নত চলিত রীতি এবং সাধু রীতি। এর কারণ হলো যখন থেকে বাংলা লেখার শুরু হলো তখন এটি সাধু ভাষায় লেখা হতো। সেই ধারায় সাহিত্যসহ ভাষার সব শাখা কয়েকশ বছর এগিয়েছে। ফলে লেখায় উন্নত সাধু ভাষা জন্মেছে। মুখের ভাষায়ও আঞ্চলিকতা এড়িয়ে একটি আদর্শ ধারা গড়ে তোলার জন্য সাধু কথ্য রীতির জন্ম হয়েছে। পরে ভাষা শক্তিশালী হয়ে তার দ্রুতগতির, সহজে বোঝা যায়; লেখা যায় বিশ^মানের সঙ্গে মিলিয়ে এমন একটি রূপ নিতে থাকল। সব ভাষাই এমন। বাংলার সেটি হলো চলিত বাংলা ভাষা। তাতে লেখা ও পড়া এবং বলা হয় এখন। তবে সাধু রীতি কিন্তু মরেনি। আছে এখনো। কিন্তু বলা, লেখা ব্যবহারের অভাবে দুর্বল হয়েছে। সব ভাষারই হয়। বাংলার এটিসহ আঞ্চলিক, চলিত রীতি রয়েছে। সবাই চলিত রীতি গ্রহণ করেছেন, চর্চা করছেন।
আলোচনার শেষদিকে ভাষাবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন বাংলা ভাষার রূপটি হলো লেখা, পড়া ও মুখের। এই তিন রূপের মধ্যে প্রধানত লেখা ও পড়ায় সর্বজনের কাছে গ্রহণীয় আগের সাধু ভাষার লেখার রূপ, চলিত ভাষার মুখের, লেখার ও পড়ার এবং জীবনযাপনে ব্যবহারের রূপ আছে। আঞ্চলিক বা উপভাষারও তেমনভাবে লেখার (সাধু ও চলিত রীতিতে), মুখের (এভাবেই ভাষাটি প্রধানত ব্যবহার হয়ে থাকে) ও জীবনযাপনের রূপ রয়েছে।
