চাঞ্চল্যকর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আনিসুল করিম শিপন হত্যা মামলার তদন্ত অনেক এগিয়েছে। এ মামলায় আগামী মাসে (জানুয়ারি) আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালের মালিকসহ ১৫ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হবে বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
ইতিমধ্যে হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়ে আদালতে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ। এতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন প্রভাবশালী একটি মহলকে ম্যানেজ করে অবৈধভাবে চলছিল ক্লিনিকটি। এতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত এবং তারা নিয়মিত মাসোহারা নিতেন বলে তদন্তে মিলেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার হারুন-অর-রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এএসপি আনিসুল হত্যাকাণ্ড গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত প্রায় শেষের দিকে। আশা করছি আগামী মাসের মধ্যে আমরা চাঞ্চল্যকর এ মামলায় অভিযোগপত্র দিতে পারব। এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদেরই আসামি করা হবে।’
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও আদাবর থানার পরিদর্শক (অপারেশন) ফারুক মোল্লা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আশা করছি আগামী মাসে মামলার অভিযোগপত্র আদালতে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। মামলার তদন্তের স্বার্থে কিছু জায়গায় চিঠি দেওয়া হয়েছে। দ্রুত এসব চিঠির জবাব পাওয়া যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের পর এখন পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬ জন ঘটনার সঙ্গে জড়িত স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। রিমান্ডেও তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। এক আসামি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, মাইন্ড এইড হাসপাতাল দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় জরুরি সেবা উপকরণ ছাড়াই অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ওয়ার্ডবয়, বাবুর্চি, রিসেপশনিস্ট ও দারোয়ান দিয়ে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হতো। এমনকি চিকিৎসার নামে রোগীদের শারীরিক নির্যাতন করা হতো। এরই ধারাবাহিকতায় মানসিক রোগের চিকিৎসা নিতে আসা সিনিয়র এএসপি আনিসুল করিম শিপনকে সিগারেট দিতে চেয়ে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় নেওয়া হয়। সেখানে অ্যাগ্রেসিভ পেশেন্ট ম্যানেজমেন্ট কক্ষে জোর করে তাকে ঢুকিয়ে উপুড় করে আসামিরা দুই হাত পিঠমোড়া করে বাঁধেন। বাঁধতে বাঁধতেই ঘাড়, মাথা, পিঠ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি আঘাত করলে তার মৃত্যু হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে ক্লিনিকটি কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। ইতিমধ্যে তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীও এটির সঙ্গে জড়িত। এজন্য তারা প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা নিতেন। তাদের বিষয়েও আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। তথ্য-প্রমাণ হাতে এলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আনিসুল হত্যাকাণ্ডে গত ১০ নভেম্বর আদাবর থানায় তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা মো. ফাইজুদ্দিন আহম্মেদ ১৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন। পরে মাইন্ড এইড হাসপাতালের মার্কেটিং ম্যানেজার আরিফ মাহমুদ জয়, পরিচালক ফাতেমা খাতুন ময়না, মুহাম্মদ নিয়াজ মার্শেদ, কো-অর্ডিনেটর রেদোয়ান সাব্বির, কিচেন শেফ মোহাম্মদ মাসুদ, ফার্মাসিস্ট তানভীর হাসান, ওয়ার্ডবয় জোবায়ের হোসেন, তানিম মোল্লা, সজীব চৌধুরী, অসীম চন্দ্র পাল, লিটন আহাম্মদ, সাইফুল ইসলাম পলাশ এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেজিস্ট্রার আবদুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেপ্তার করে কয়েক দফা রিমান্ডে নেওয়া হয়। এদের মধ্যে একমাত্র আসামি হিসেবে আবদুল্লাহ আল মামুন জামিনে আছেন। আর পলাতক সাখাওয়াত হোসেন ও সাজ্জাদ আমিন। এছাড়া মাসুদ, অসীম, আরিফ মাহমুদ, সজীব চৌধুরী, তানভীর হাসান ও তানিম মোল্লা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
জবানবন্দিতে তারা জানিয়েছেন, চলতি বছর ৯ নভেম্বর এএসপি আনিসুল করিমকে সিগারেট খাওয়ানোর কথা বলে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অ্যাগ্রেসিভ ম্যানেজমেন্ট কক্ষে জোর করে ঢুকিয়ে পিঠমোড়া করে হাত বেঁধে মারধরের একপর্যায়ে মৃত্যু হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে আসামি ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, সরকারি কাজের পাশাপাশি মাইন্ড এইড হাসপাতালে নিয়মিত রোগী পাঠানো হতো। এজন্য হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ তাকে মোট বিলের ২০ শতাংশ কমিশন দিত। পরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডা. মামুনের বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে বলা হয়, আসামি ডা. মামুন ২৮তম বিসিএসের মাধ্যমে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নিয়োগ পেয়ে পরে সহকারী চিকিৎসক পদোন্নতি পান। গত ৯ নভেম্বর আনিসুল তার আত্মীয়স্বজনসহ জাতীয় মানসিক ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে তার কাছে চিকিৎসা নিতে আসেন। ডা. মামুন সরকারি হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই বুঝিয়ে তাকে মাইন্ড এইড হাসপাতালে পাঠান। তিনি নিজেই নিয়মিত ওই হাসপাতালে রোগী দেখেন।
পুলিশের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মাইন্ড এইড হাসপাতালের ওয়ার্ডবয়, বাবুর্চি, রিসেপশনিস্ট, দারোয়ানসহ কয়েকজন কর্মচারী চিকিৎসা নিতে আসা আনিসুলকে চিকিৎসার নামে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেন, যার সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হয়। জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা পলাতক আসামিদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। হাসপাতালের পরিচালক ফাতেমা খাতুন ময়না স্বীকার করেন, দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় জরুরি সেবা উপকরণ ছাড়া অবৈধভাবে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন তারা।
আনিসুলের বাবা ফাইজুদ্দিন আহম্মেদ তদন্তকারী সংস্থাকে বলেছেন, ‘আমার একমাত্র সম্বল ছিল শিপন। অসুস্থবোধ করায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম। সেটিই কাল হলো। মাইন্ড এইড হাসপাতালের কর্মচারীরা আমার ছেলেকে পিটিয়ে মেরে ফেলল। আমি হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
