মুক্তিযুদ্ধে শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:১৬ এএম

দেশ বিভাগের পর পূর্ববাংলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল একটা বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়। এর আগে সমস্ত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র ছিল কলকাতা। ঢাকায় অনেক কিছুই তখন বিকশিত হয়নি, রাজনীতিটাও ছিল একটা চরম অনিশ্চয়তায়। মুসলিম লীগ সক্রিয় থাকলেও তেমন সংগঠিত ছিল না। দেশ বিভাগের বেদনায় ভারাক্রান্ত প্রগতিশীল রাজনীতি পুরোদমে তখনো সচল হয়নি। এ সময় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলেন, তখনই তথাকথিত স্বাধীনতার অন্তঃসারশূন্যতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের মনোভাবটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে অসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি শিল্প-সাহিত্যচর্চায় যুক্ত ব্যক্তিরা একটা ঐক্য গঠনের উপলব্ধি বোধ করতে থাকে। এই উপলব্ধি থেকেই রাজনৈতিক দল গঠন এবং কবি, সাহিত্যিক এবং বিজ্ঞানীরাও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করেন।

আটচল্লিশ থেকে বাহান্ন সাল পর্যন্ত ছাত্র, শিক্ষক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা যার যার মাধ্যমে পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য সচেষ্ট হন। বাহান্ন সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। যার ফলে ভাষা আন্দোলন সংগঠিত হয়। এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ থেকে আটান্ন সালের সামরিক শাসন এবং ষাট দশকের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে রাজনৈতিক দল ও সংস্কৃতিচর্চা পাশাপাশি চলতে শুরু করে। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত স্বাধিকার আন্দোলনের পক্ষের রাজনৈতিক দল-মতের সঙ্গে দেশের কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীদের একটা সুস্পষ্ট যৌথ প্রয়াস লক্ষ করা যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময়েও এই প্রয়াস অক্ষুন্ন থাকে। ষাটের দশকে বিভিন্ন কাব্যে, উপন্যাসে, ছোট গল্পে, চারুকলায় এবং নাটকে এর প্রতিফলন দেখতে পাই। চলচ্চিত্রেও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা ফুটে ওঠে। যার একটি বড় উদাহরণ জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’। ‘জয় বাংলা’ নামেও একটি চলচ্চিত্র এ সময়ে খুবই আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ সময়ে বাংলাদেশের মঞ্চনাটক খুব নিয়মিত চর্চার মধ্যে ছিল না। তবু কিছু উন্মুক্ত স্থানে নাটক অভিনীত হয়, যে নাটকগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গটি সামনে নিয়ে আসে। কিছু গান রচিত হয় যেগুলোকে দেশাত্মবোধক গান হিসেবে চিহ্নিত করা হয় বটে, তবে সেগুলো গণসংগীতের ভূমিকা পালন করে। এ সময়ে ক্রান্তি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী ‘একটি জ্বলছে আগুন ক্ষেতে খামারে’ নামে নৃত্যনাট্য প্রযোজনা করে। নৃত্যনাট্যটি দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শিত হয়।

১৯৭১ সালে মার্চ মাস জুড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে নানা ধরনের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ কবিতা রচনা, গানের অনুষ্ঠান, ছোট ছোট নাটিকার অভিনয় এবং গ্রামাঞ্চলে যাত্রাপালায় দেশপ্রেমের বাণী উচ্চারিত হয়। ২৫ মার্চের কালরাতের পর পাকিস্তানিদের চরম নিষ্ঠুরতার মধ্যে কোনো কোনো শিল্পী প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দেন। যারা প্রাণ নিয়ে বেঁচে যেতে পারেন, তাদের একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন আর অন্যরা গোপন স্থানে থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করে যান। চট্টগ্রামের বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ও কুশলীরা কালুরঘাটে একটি বেতার কেন্দ্র স্থাপন করেন। সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা এবং নানা ধরনের নির্দেশনা, সংবাদ প্রচার সাময়িককালের জন্য প্রচার হলেও পরে তারা সীমান্ত দিয়ে অন্য একটি অবস্থানে চলে যান। খুব দ্রুতই তারা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপন করে ফেলেন। এই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে দেশের সাংবাদিক, সাহিত্যিক, নাট্যশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, যন্ত্রশিল্পী এবং অন্য শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ পরিবেশনা, সম্পাদকীয় মন্তব্য বিভিন্ন সেক্টরের যুদ্ধের খবর, তাৎক্ষণিকভাবে রচিত নাটক, সংগীত, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, নেতাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের এবং দেশবাসীকে নানাভাবে অনুপ্রাণিত করতে থাকে। দেশের অভ্যন্তরে আতঙ্কিত জনগণের কাছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র একটা স্বস্তির জায়গায় পরিণত হয়। মুক্তিযুদ্ধের তাৎক্ষণিক সংবাদ মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়াতে প্রবলভাবে সাহায্য করে। এ সময়ে কোনো কোনো মুক্ত এলাকায় গানের অনুষ্ঠান এবং যাত্রাপালার অভিনয়ও তাৎপর্যপূর্ণভাবে স্বাধীনতার চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করে।

এ সময় ছায়ানটের শিল্পীদের নেতৃত্বে একটি ভ্রাম্যমাণ গানের স্কোয়াড বিভিন্ন মুক্ত এলাকায় ট্রাকে করে দেশপ্রেমের গানের অনুষ্ঠান করে মুক্তিযোদ্ধাদের, শরণার্থীদের এবং জনগণের মধ্যে প্রবল দেশপ্রেমের বন্যা বইয়ে দেয়। একজন বিদেশি ক্যামেরাম্যানের তোলা সেসব ফুটেজ নিয়ে বহু বছর পরে ‘মুক্তির গান’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে দেশের মানুষের কাছে উপস্থাপিত হয়। এ সময় মুক্তাঞ্চল থেকে এবং বাংলাদেশের ভেতর থেকেও কিছু সংবাদপত্র গণজাগরণের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাকিস্তানিরা এ সময় উপলব্ধি করে যে, বাংলাদেশের শিল্পীরা মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামীদের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এমনও প্রমাণ তাদের কাছে এসে যায় যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে কিছু গান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে চলে যাচ্ছে, শুধু তা-ই নয় বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় গণজাগরণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। এ সময় তারা বাংলাদেশের অসাধারণ সুরকার আলতাফ মাহমুদকে ধরে নিয়ে যায় এবং প্রচণ্ড অত্যাচারের পর নির্মমভাবে হত্যা করে। শুধু তা-ই নয়, অনেক নাম না জানা শিল্পী, কবি, লেখক, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক তাদের ওপরও অমানুষিক নির্যাতন চালায়, কাউকে কাউকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যাও করে। অনেকে কারারুদ্ধ হয় এবং মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে স্বাধীনতার পর ছাড়া পায় বটে কিন্তু পরবর্তী জীবনে রোগাক্রান্ত থাকে।

কলকাতা প্রবাসী অনেক লেখক-শিল্পী আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে দাঁড়ানোর জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত হয় প্রবাসীদের নানা ধরনের উদ্যোগ। দেখা যায় রবিশঙ্কর এবং জর্জ হ্যারিসন নিউ ইয়র্কে একটি কনসার্ট করে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন, মুক্তিযুদ্ধের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থও সংগৃহীত হয়। প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে শিল্পীরা নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কূটনৈতিক উদ্যোগ ছাড়াও বিদেশে শিক্ষারত ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপক, কূটনীতিক নানা শৈল্পিক মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরেন এবং এ সময় নির্মিত জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’ প্রামাণ্যচিত্রটি প্রদর্শিত হয় এবং বিপুল জন-সমর্থন লাভে সক্ষম হয়।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে বহু দেশপ্রেমিক রক্ত দিয়েছেন। অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন, অনেক মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছেন। তবে পাশাপাশি শিল্পী-সাহিত্যিকদের অবদানও কোনো অংশে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। পাকিস্তানিরা বাঙালিদের এই শক্তিকে উপলব্ধি করতে পেরেছিল। সেই উপলব্ধির কারণেই ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে বুদ্ধিজীবী নিধন শুরু করে এবং সর্বশেষ ১৪ ডিসেম্বর এই বুদ্ধিজীবী নিধনের শেষ পর্বটি সমাপ্ত করে। শিল্পীদের অবদানের পুরোপুরি চিত্র এখানে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। এ শুধু এক-ভগ্নাংশমাত্র। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলে পরবর্তী দিনগুলোতেও শিল্পীরা অসাধারণ এক ভূমিকা পালন করেছেন এবং এখনো করে যাচ্ছেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।

লেখক নাট্যকার ও অভিনেতা

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত