১৯৯২ সালে ৩ ডিসেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস’ ঘোষণা করে সব সদস্য দেশকে দিবসটি পালনের আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। বাংলাদেশ এই দিবসটি পালনের ধারাবাহিকতায় প্রায় দুই দশক আগে ‘বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১’ পাস করে। কিন্তু ওই আইনটি কেবল কল্যাণভিত্তিক হওয়ায় প্রতিবন্ধী অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান থেকে যায়। এর পরই শুরু হয়েছিল আরেকটি আন্দোলনকেবল কল্যাণ নয়, অধিকারভিত্তিক আইন প্রতিষ্ঠা। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী জনগণের সমঅধিকার নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা বাস্তবায়নে পাস হয়‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’। এ আইনটি পাসের ফলে জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী অধিকার সনদে বর্ণিত প্রায় সব অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট তৈরি হয় দেশে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সাত বছর পেরিয়ে গেলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষায় বেশিরভাগ আইনি বাধ্যবাধকতাও যেমন পূরণ হয়নি, তেমনি সামাজিকভাবেও প্রতিবন্ধী অধিকার প্রতিষ্ঠায় খুব একটা এগোতে পারেনি দেশ। আইনে অনেক কিছু থাকলেও বাস্তবায়নের সাফল্য খুবই কম।
সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘গরু কেতাবেই আছে গোয়ালে নেই’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে প্রতিবন্ধী অধিকার ও সুরক্ষা আইনে বর্ণিত নানা অধিকার এবং সেগুলো বাস্তবায়নের একটি হালনাগাদ পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নানা ধরনের সুরক্ষা আইনে দেওয়া হলেও এগুলোর বেশিরভাগই শুধু আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা-উপধারাতেই যেন শোভা পাচ্ছে। আইন অনুযায়ী সরকারি প্রথম শ্রেণির চাকরিতে প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ কোটা এবং
তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে ১০ শতাংশ কোটা থাকলেও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কত শতাংশ কোটা থাকবে তার উল্লেখ নেই আইনে। অন্যদিকে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে, সরকারি প্রথম শ্রেণির চাকরিতে ১ শতাংশ কোটা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। আর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে ১০ শতাংশ কোটা থাকলেও তা এতিমদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীরা চাকরিতে নিয়োগ পাচ্ছেন না। এছাড়া সরকারি চাকরির পাশাপাশি বেসরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধীদের নিয়োগ উৎসাহিত করতে কর রেয়াতের সুবিধা দেওয়ার কথা থাকলেও এক্ষেত্রেও সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যমান বাস্তবতায় দেশি ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় ন্যূনতম ২ শতাংশ পদ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য সংরক্ষণ করার তাগিদ দিয়েছেন প্রতিবন্ধী অধিকার তদারকির দায়িত্বে থাকা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এছাড়া কর্মরত অবস্থায় প্রতিবন্ধিতার শিকার ব্যক্তির চাকরি হারানো এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা। চাকরির পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ঋণ প্রদান কর্মসূচি যেমন সীমিত তেমনি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনা জামানতের ঋণ দেওয়ার নির্দেশনাও বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
দেখা যাচ্ছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানে অগ্রগতির অভাবের মতোই প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি নেই। প্রতিবন্ধী অধিকার প্রতিষ্ঠার জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, প্রতিবন্ধীদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। শতভাগ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী শিক্ষা উপবৃত্তির আওতায় আসেনি। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বই এবং অন্যান্য গ্রন্থাগারের বই ই-লার্নিং প্ল্যাটফরমের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের একটি পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেজ তৈরি ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও দেশের সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এ ডেটাবেজের আওতায় আসেনি। এছাড়া অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিবন্ধী ভাতার টাকার পরিমাণ বাজারদর অনুযায়ী পর্যাপ্ত নয়। শতভাগ অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও ভাতার আওতায় আসেনি। প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে যেমন আইনি বিধান সত্ত্বেও অগ্রগতি নেই তেমনি সামাজিক পরিসরেও নিত্য অবহেলার শিকার হচ্ছে প্রতিবন্ধী অধিকার। আইন অনুযায়ী যাত্রীবাহী যানবাহনের ৫ শতাংশ আসন প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত রাখার কথা। কিন্তু বাসসহ অন্যান্য যানবাহনের কাঠামোই প্রতিবন্ধীদের ব্যবহার উপযোগী নয়। আর গণপরিবহনের চালক ও সহকারীরাও প্রতিবন্ধীদের প্রতি সংবেদনশীল নয়। এজন্য গণপরিবহন, স্টেশন-টার্মিনাল এবং নগরের পরিকাঠামো প্রতিবন্ধীবান্ধব হওয়া জরুরি।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠায় এতটা পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে সরকারের মনোযোগের অভাবই প্রতীয়মান। প্রতিবন্ধী অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনি কাঠামো অনুসারে মন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় সমন্বয় কমিটি এবং সচিবের নেতৃত্বে জাতীয় নির্বাহী কমিটি গঠিত হয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির একটিমাত্র বৈঠক হয়েছে ২০১৮ সালে। আর ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাহী কমিটি গঠন করা হলেও অদ্যাবধি এর কোনো সভাই হয়নি। এছাড়া এসব কমিটিতে কোনো প্রতিবন্ধী পুরুষ বা নারীর প্রতিনিধিত্ব নেই। মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি হলেও এখনো অনেক জেলা, উপজেলা ও শহর কমিটি গঠন হয়নি। এমন নির্মম বাস্তবতায় প্রতিবন্ধী নাগরিকদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের অবশ্যই উদ্যোগী ভূমিকা নেওয়া উচিত।
