একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে যেসব বিষয় আমাকে পীড়িত করে তার মধ্যে জেনোসাইড অন্যতম। আশ্চর্যজনকভাবে সাধারণ মানুষেরা বিভিন্ন জেনোসাইড সম্পর্কে অজ্ঞ অথবা ঘটনাগুলো সঠিকভাবে জানে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের বাঙালি জাতির নিজের ওপর সংগঠিত জেনোসাইডের সঠিক ইতিহাস জানি বলে আমার নিজেরই মনে হয় না।
পৃথিবীর বর্তমান পরিস্থিতি এবং ঘটনাবলি আমাদের মনকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য জেনোসাইড নিয়ে উদ্বিগ্ন করে রেখেছে আজ বহুদিন। এই রকম একটা সময় রফিকুল আনোয়ার রাসেলের ডকুমেন্টারি ‘এ ম্যান্ডোলিন ইন এক্সাইল’ খুব আগ্রহ নিয়ে দেখলাম।
ডকুমেন্টারিটি মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত জেনোসাইড থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা একজন রোহিঙ্গা শরণার্থীর উদ্বাস্তু জীবনের কাহিনি।
আমরা বুঝে যাই, রোহিঙ্গা শরণার্থীর মোহাম্মদ হোসেন, যিনি রিফিউজি ক্যাম্পে আহমেদ হোসেন নামে পরিচিত। শুরুতেই ক্যাম্পের সংকীর্ণ কাঁচা ঘরে বসে মোহাম্মদ তার জীবন কাহিনি বলতে শুরু করেন। যদিও মোহাম্মদ মা-বাবার একমাত্র সন্তান, জন্মের এক বছর বয়সে তার মা মারা যান। মোহাম্মদের আট ছেলেমেয়ে। অর্থের অভাবে নিজে যেমন পড়ালেখা শিখতে পারেননি, একইভাবে তার নিজের সন্তানদেরও পড়ালেখা শিখাতে পারেনি।
মোহাম্মদের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি বার্মাতে, বোঝা যায় রোহিঙ্গারা মিয়ানমারকে এখনো বার্মা বলে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে কিছু মানুষ ম্যান্ডোলিন বাজাতে পারে যাদের কাছ থেকে তিনি ম্যান্ডোলিনের প্রথম পাঠ নেয়। তিনি ক্যাম্পের সীমিত এবং অনেকটা বন্দী জীবনে গান গেয়ে এবং ম্যান্ডোলিন বাজিয়ে নিজের ভেতরের হাহাকার লাঘবের চেষ্টা করে এই উদ্বাস্তু জীবন কাটান।
তার মাতৃভূমির জন্য ভালোবাসা ও কান্না তার গানের কথায় বারবার ফুটে উঠে। তিনি লেখাপড়া জানেন না; তার গানের কথা ও সুর তার মনের ভেতরেই গাথা থাকে। রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন উদ্বাস্তু ক্যাম্পে তিনি এই গানগুলো গেয়ে বাড়ান এবং যাতে প্রকাশ পায় মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার আর্তি।
এত দুর্দশার মধ্যেও রোহিঙ্গারা তাদের সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা অব্যাহত রাখে। এনজিও বা মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাদের বাচ্চাদের প্রথাগত শিক্ষারও ব্যবস্থা করে ক্যাম্পে। মোহাম্মদ সেইসব বাচ্চাদের ক্লাসে শিক্ষামূলক গানও শোনান। ক্যাম্পে সীমাবদ্ধভাবে হিন্দু-মুসলিম সব ধর্মের রোহিঙ্গারা তাদের নিজ নিজ উৎসব পালন করে। বাংলাদেশ সরকার মোহাম্মদের থাকার জায়গা দিয়েছে, এনজিও-রা খাদ্য, চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে... কিন্তু তারপরও রোহিঙ্গারা সুখে নেই। নিজের ভূমি আরাকানের জন্য তাদের মন সর্বক্ষণ কাঁদে।
পুরো ডকুমেন্টারি জুড়ে মোহাম্মদের উদ্বাস্তু জীবনের চিত্র ফুটে উঠে। মোহাম্মদ যেরকম কাঁচা ঘরে থাকেন, ক্যাম্পজুড়ে তার মতোই লাখ লাখ রোহিঙ্গারা মাথা গুঁজে নিয়েছে এমন কাঁচা ঘরে। ক্যামেরা বেশ কয়েকবার চারপাশের ক্যাম্পের চিত্র প্রদর্শন করে। বোঝা যায় সব উদ্বাস্তু জীবনের কাহিনি একই- মোহাম্মদের মতে অশান্তির বাগান।
যখন মোহাম্মদের উৎকণ্ঠা তার মনকে ভেঙে দিতে চায় তখন তিনি তার ম্যান্ডোলিন নিয়ে কোনো এক নির্জন জায়গায় চলে যান। তবে এত হতাশার মাঝেও রোহিঙ্গারা আশা খুঁজে পেয়ে আল্লাহের কাছে দোয়া করে যখন আন্তর্জাতিক আদালত এই গণহত্যার বিচার শুরু করে। ... এবং এরপর যেন শুধু অপেক্ষার পালা কখন দেশে যাবো কখন দেশে যাবো।
আমরাও আশা করি, সরকার ও আন্তর্জাতিক মহলের ক্রমাগত চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকারকে বাধ্য করে রোহিঙ্গাদের যথাযথ স্বকৃতই প্রদানের মাধ্যমে যেন নিজভূমে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
পরিশেষে যোগ করি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে ধন্যবাদ এই তথ্যচিত্র নির্মাণে সহযোগিতা প্রদানের জন্য। ‘এ ম্যান্ডোলিন ইন এক্সাইল’ তথ্যচিত্র পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রদর্শনের মাধ্যমে জেনোসাইড, গণহত্যা আর জাতি নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া উচিত।
করোনাকালে অনলাইন প্রিমিয়ার হয় ৫৭ মিনিটের এ ডকুমেন্টারি। এর নির্মাতা রফিকুল আনোয়ার রাসেল একজন চলচ্চিত্র সংসদ কর্মী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের চলচ্চিত্রের খণ্ডকালীন শিক্ষক।
ইতিমধ্যে চলচ্চিত্রটি অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন অনলাইন ফেস্টিভ্যালে অংশ গ্রহণ করে আগামী জানুয়ারিতে রেইনবো চলচ্চিত্র সংসদ আয়োজিত দেশের সর্ববৃহৎ চলচ্চিত্র আয়োজন ‘১৯তম বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ঢাকা ২০২১’ বাংলাদেশ প্যানোরমা বিভাগে মনোনীত হয়েছে।
লেখক: পেশায় প্রকৌশলী ও সাহিত্যানুরাগী।
