‘এথনোগ্রাফ’ নামে সমাজ ও জনসংস্কৃতির এক বহুল চর্চিত বিধিবদ্ধ অধ্যয়নবিদ্যার কথা আমরা কমবেশি জানি। গবেষককে এখানে গবেষিত ময়দানের একজন হয়ে উঠতে হয়। জনসমাজের চোখে চারপাশ জানা-বোঝার অভ্যাস গড়ে তুলতে হয়। মর্গান, ফ্রানজ বোয়াস, ম্যালিওনস্কি, লেভি স্ট্রস, মার্গারেট মিড কিংবা ম্যুলারের এথনোগ্রাফগুলো নানা তর্ক-বিতর্কসমেত জগদ্বিখ্যাত। মানিকের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, তারাশংকরের ‘হাঁসুলিবাঁকের উপকথা’, দেবেশ রায়ের ‘তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত’ কিংবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ সবই জনসমাজের এক একটি অবিস্মরণীয় এথনোগ্রাফ। এথনোগ্রাফ হয় সরাসরি শারীরিক বাস্তবতার দুনিয়ায়। কিন্তু শারীরিক বাস্তবতার পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগতেও তো তৈরি হচ্ছে অভিনব সব ‘বাস্তবতা’। কিংবা বাস্তবতা আরেক রূপ পাচ্ছে ইন্টারনেটের ডিজিটাল বলয়ে। এই ভার্চুয়াল বাস্তবতাকে পাঠ করে যারা এথনোগ্রাফ তৈরি করছেন, তারা এর নতুন নাম দিচ্ছেন ‘নেটনোগ্রাফ বা ইন্টারনেট এথনোগ্রাফ’। প্রাণ-প্রকৃতি বিষয়ে তরুণ প্রজন্মের ভাবনার ময়দানকে বোঝার জন্য একটা ‘নেটনোগ্রাফির’ প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। দৈনিকের অনলাইন সংস্করণের খবর, ইউটিউবের কিছু ভিডিও, ফেইসবুকে কিছু পোস্ট-কমেন্ট দেখে কলিজা কেঁপে উঠল! কী নিদারুণ, কী সাংঘাতিক। সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর বাজারে কিছু খাবার হোটেলে বুনোপাখির মাংস বিক্রি হয় আর মানুষ দল বেঁধে সেসব খেতে যায়। জীবন্ত পাখি, পাখির লাশ রান্না থেকে শুরু করে সেসব লাশের নির্দয় খানা-পিনার ছবি ও ভিডিও তারা মহাসমারোহে আপলোড করে। এসব ভিডিও ও পোস্ট দেখে অন্যরা ‘আহা-উহু’ করে লাইক দেয় কিংবা এখনো যায়নি বলে আফসোস করে। আমার কাছে বিষয়টি স্রেফ আইনের লঙ্ঘন বা পরিবেশ সম্পর্কে অসচেতনতার বিষয় নয়। হরিপুর বাজারে দীর্ঘদিন থেকেই হোটেল-রেস্টুরেন্ট ছিল। সেখানে শীত মৌসুমসহ বছর ধরে বুনোপাখির মাংস বিক্রিও হতো। প্রশাসন, পরিবেশ আইন এসব হোটেল-রেস্টুরেন্ট বন্ধ করতে পারেনি। বরং পাখি হত্যাকারী হোটেল-রেস্টুরেন্টের সংখ্যা বেড়েছে। কেন বেড়েছে? কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে বুনোপাখি হত্যা ও এর বাণিজ্যিক ভক্ষণকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। এখনকার প্রজন্ম শারীরিক ও ভার্চুয়াল দুটি বাস্তবতায় বসবাস করে। দুই বাস্তবতাই তার চিন্তা ও মগজে প্রভাব ফেলে। দেশের এক বৃহৎ প্রজন্মের কাছে বুনোপাখি হত্যা ও ভক্ষণের বিষয়টি মনস্তাত্ত্বিকভাবে বৈধ হয়ে যাচ্ছে। অথচ এরাই একসময় দেশের প্রশাসক, উৎপাদক, নীতিনির্ধারক, শিল্পী কী সংরক্ষণবিদ হবে। কিন্তু তাদের মগজ থেকে বুনোপাখি হত্যার বৈধতা কি ‘ডিলিট’ বা ‘ব্লক’ হবে? মানুষের চিন্তার জটিল জমিনে এর কি চিরস্থায়ী কোনো দাগ থাকবে না? ইচ্ছা করলেই বক, ডাহুক, কালিম, সরালি, বালিহাঁস নিদারুণভাবে হত্যা করে হোটেলে বসে খাওয়া যায়; এমন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই কি তবে বড় হবে নতুন প্রজন্ম? বিজ্ঞান বলে, চাহিদা থাকলেই উপায় তৈরি হয়। বুনোপাখি মানুষ খেতে চায় বলেই হরিপুরের হোটেলে এর লাশ বিক্রি হয়। আর বিক্রি জমজমাট বলেই হোটেলগুলো নির্দয়ভাবে পাখিদের হত্যা করে। প্রথমত, থামাতে হবে ভোক্তা-ক্রেতার লোভ। একজনও যদি হরিপুরের হোটেলে গিয়ে বুনোপাখির লাশ না খায়, তবে বন্ধ হবে এই নিদারুণ খুনখারাবি। তারপর প্রশ্ন হলো, দেশের আর কটি বাজারে হরিপুরের মতো এমন প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে বুনোপাখি বিক্রি হয়। এটি প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা, কাঠামো, নজরদারি, সচেতনতা এবং সুশাসনের প্রশ্ন। চলতি আলাপখানি প্রশ্নহীনভাবে হরিপুর বাজারে বুনোপাখি বিক্রি বিষয়ে একটা ছোট্ট ‘নেটনোগ্রাফি’ নমুনা।
ইউটিউব জুড়ে পাখির লাশ : হরিপুরে পাখি হত্যার বিষয়টি বোঝার জন্য ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ‘হরিপুরে পাখির মাংস’ লিখে ইউটিউবে একটি সার্চ দিই। একের পর এক হোটেলের ডেক-ডেকচি, হাঁড়ি-কড়াই, উনুন আর টেবিলে ভোক্তাদের থালায় থালায় পাখিদের ঝোলমাখা লাশের দৃশ্য। এর ভেতর সবচেয়ে পুরনো ভিডিওটি করোনা মহামারীর আগে আপলোড করা। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ‘আবেদ আবদুল্লাহ রাব্বানী (Abed Abdullah Rabbani)’ তার ইউটিউবে ‘সিলেটের হরিপুরে মাটির চুলায় পাখির মাংস’ শিরোনামে আপলোড করেছেন। হরিপুর বাজারের ‘পুরান ড্রাইভার হোটেলের’ ভেতর ঢুকে তিনি ভিডিও করে বুনোপাখি রান্না ও বিক্রির দৃশ্য দেখিয়েছেন। ভিডিওতে দেখা যায়, একজন বাবুর্চি রান্না করছেন আর ভিডিওগ্রাহক তাকে প্রশ্ন করছেন, কী রান্না হচ্ছে? বাবুর্চি মাংস নাড়িয়ে নাড়িয়ে জবাব দিচ্ছেন, বালিহাঁস। এরপর ভিডিওগ্রাহক বলছেন, ফ্রেশ বালিহাঁস আমাদের সামনেই জবাই করা হয়েছে। ‘হরিপুরের পাখির মাংস’ শিরোনামে ২০২০ সালের ২১ জুলাই একটি ভিডিও ইউটিউবে আপলোড হয় ‘এক্সপ্লোর উইথ শায়খুল (Explore with Shakhul)’ চ্যানেলে। সেখানে দেখা যায়, হরিপুরের ‘নিউ ড্রাইভার রেস্টুরেন্টে’ পাখি বিক্রি হচ্ছে। ২০২০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ‘নাহিদ নাজিমের ((Nahid Najim)’ ইউটিউবে ‘হরিপুরের বিখ্যাত পাখির মাংস ভক্ষণ, চার ধরনের পাখিভোজ’ শিরোনামে একটি ভিডিও আপলোড হয়। এই ভিডিওটি প্রায় ১২৮০ বার ভিউ হয়েছে, ১৩৪টি লাইক ও ৫টি ডিসলাইক পেয়েছে। এই ভিডিওতে নাহিদ পায়ে বাঁধা অনেকগুলো ধলাবক মাথা নিচে দিয়ে পা উল্টে ধরে দেখাচ্ছেন এগুলো এখানে রান্না হবে। পরে এই বকের লাশ রান্না দেখানো হয়। এরপর তার ভিডিওতে তিনি হোটেলের ভেতর বালিহাঁস এবং কোড়া পাখির রান্না তরকারিও দেখান। ‘চ্যানেল জে টিভি (Channel J Tv)’ ২০২০ তারিখের ১৭ অক্টোবর তাদের ইউটিউব চ্যানেলে ‘তারু মিয়া পাখির মাংসের দোকান হরিপুর’ শিরোনামে একটি ভিডিও আপলোড করে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, তারু মিয়া হোটেলে বালিহাঁস ও বক রান্না করে রাখা হয়েছে। ‘হরিপুরে পাখির মাংস খেতে চলে গেলাম’ শিরোনামে ২০২০ সালের ২০ অক্টোবর একটি ভিডিও আপলোড করেন ‘মোহাম্মদ মুরাদ (Mohammed murad)’। কোমরে মাস্ক ঝুলিয়ে তিনি হরিপুর বাজারের ‘তারু মিয়া রেস্টুরেন্টে’ কুড়া ও বালিহাঁস মাংস বিক্রি করা দেখিয়েছেন। ২০২০ সালের ৩০ নভেম্বর ‘আরিয়ান আহমেদ সৌরভ ((Ariyan Ahmed Sourav)’ তার ইউটিউব চ্যানেলে ‘বালিহাঁস পাখির মাংস খেতে হরিপুর ভ্রমণ’ শিরোনামে একটি ভিডিও আপলোড করেন।
ফেইসবুকে ডিলিট, কিন্তু মনের খাতায় : জায়েদ আহমেদ জাদু। নিজের ফেইসবুক প্রোফাইলে নিজের যত পরিচিতি হাজির করেছেন, তাতে বোঝা যায় তিনি একজন বিখ্যাতজন। স্ন্যাপথেটিকের প্রধান আলোকচিত্রী, আরবানলি ডিজিটালের বাণিজ্যিক আলোকচিত্রী, এনভিশন অ্যানালাইটিকসের প্রধান, রুলাল টু আরবানের সহ-সম্পাদক এবং যাযাবরের সহ-মালিক। সবকিছু ছাপিয়ে তার আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় তিনি দিয়েছেন। সিলেট ব্লাড ডোনেশন কমিউনিটি-বিডিসির তিনি প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপ্রধান এবং সিলেট বিএড সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে পড়াশোনা করেছেন। এই বিখ্যাতজন ব্যক্তিটি ‘বালিহাঁসের মাংস দিয়ে খেয়েদেয়ে ট্যুর সমাপ্ত’ লিখে বেশ কিছু ছবি প্রমানসমেত তার ফেইসবুকে পোস্ট করেন। তার এই পোস্ট নিয়ে তুমুল তর্ক ওঠে। বন্যপ্রাণীপ্রেমী সোহেল শ্যাম লেখেন, ‘... বালিহাঁস রান্না করা থাকলেই কি খেতে হবে। হরিপুরে যে হোটেলগুলোতে দেশি পাখি ও পরিযায়ী পাখির মাংস বিক্রি করে তারা অপরাধ করছে। একই অপরাধ আপনিও করলেন। আপনি বন বিভাগকে জানাতে পারতেন বিষয়টা। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে দেশি পাখি ও পরিযায়ী পাখি শিকার, ক্রয়-বিক্রয়, লালন, বহন করা দণ্ডনীয় অপরাধ।’ তারপর আহসানুল হোসাইন সিয়াম লেখেন, ‘... বালিহাঁস কথাটা রিম্যুভ কর। সেনসিটিভ অনেকের জন্য। ক্যাপশন এডিট করার পরে আমার কমেন্টটিও ডিলেট করে দে।’ এরপর জাদু তার পোস্টটিকে না সরিয়ে ক্যাপশন মুছে প্রথমে লেখেন, ‘পাখির মাংস দিয়ে খেয়েদেয়ে ট্যুর সমাপ্ত’।
মন্ত্রীর এলাকা কি পাখিশূন্য হবে : ইউটিউব-ফেইসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাবলিক কনটেন্টগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, হরিপুর বাজারে ‘নিউ ড্রাইভার রেস্টুরেন্ট (মালিক মো. আবদুল হান্নান)’, ‘পুরাতন ড্রাইভার হোটেল (মালিক মো. তারু মিয়া ও আবুল কালাম), ‘তারু মিয়া রেস্টুরেন্ট-কুমিল্লা (মালিক মো. রহমত উল্লাহ)’ এবং বিসমিল্লাহ হোটেলসহ বেশ কটি হোটেল-রেস্টুরেন্টে বুনোপাখি বিক্রি হয়। বুনোপাখি হত্যা ও বাণিজ্যিক ভক্ষণের বাস্তব প্রমাণ ভোক্তারাই হাজির করে রেখেছেন তাদের ভিডিও-পোস্ট ও ছবিতে। বন বিভাগ ও প্রশাসন এসব কনটেন্ট বিশ্লেষণ করতে পারে এবং হরিপুরে বুনোপাখি বিক্রি বন্ধে এক অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিক গণসচেতনতা শুরু করতে পারে। ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হরিপুর বাজারে অভিযান পরিচালনা করেন এবং তারু মিয়া হোটেল ও তার পাশের রেস্টুরেন্টকে পনেরো হাজার টাকা জরিমানা করেন। কিন্তু থামছে না হরিপুর বাজারের পাখি হত্যার হোটেল। ভার্চুয়াল কনটেন্ট এই প্রমাণ হাজির করছে বারবার। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী হরিপুরের পাখিদের সুরক্ষায় অগ্রণী হবেন আশা করি। তা না হলে তার প্রিয় সিলেট অঞ্চল কি এভাবেই পাখিশূন্য হবে?
লেখক
লেখক ও গবেষক
ধহরসরংঃনধহমষধ@মসধরষ.পড়স
