জামাতার বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা হত্যা’ মামলায় ফাঁসলেন শ্বশুর

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০৩:৫৫ এএম

মেয়ে সাথী আক্তারকে হত্যার অভিযোগ এনে জামাতা মো. কাওসার গাজীর বিরুদ্ধে মামলা করেন আবদুল জলিল দুয়ারি। কিন্তু দুই বছর পর এসে তিনি মেয়ে ‘আত্মহত্যা’ করেছিল জানিয়ে বিচারাধীন মামলা থেকে জামাতার অব্যাহতি এবং জামিনের পক্ষে উচ্চ আদালতে সাফাই সাক্ষ্য দেন।

এমন পরিস্থিতিতে উষ্মা প্রকাশ করে গতকাল মঙ্গলবার হাইকোর্ট মিথ্যা তথ্যে মামলার কারণে বাদীর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করতে পটুয়াখালীর ওসিকে নির্দেশ দিয়েছে। একইসঙ্গে আসামিকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছে। বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।

মামলাটি অভিযোগ গঠন শেষে সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। নিজের মেয়ে হত্যার ঘটনায় বাদী হয়ে মামলা করে এখন সেটিকে আত্মহত্যা উল্লেখ করায় বিস্ময় প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। তারা বলেন, দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কেউ মিথ্যা অভিযোগে মামলা করে বা করায়, তাহলে সেই ব্যক্তির দুই বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদে সশ্রম অথবা বিনাশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে। এ ছাড়া কেউ যদি কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা ৭ বছর বা এর বেশি মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় কোনো অপরাধের মিথ্যা অভিযোগ করে, তাহলে অভিযোগকারীর ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

মামলার এজাহারে বাদী আবদুল জলিল দুয়ারি উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পটুয়াখালীর বহালগাছিয়া গ্রামের বড় গাজী বাড়িতে তার মেয়ে সাথী আক্তারের মাথায় আঘাতসহ নির্যাতন করে স্বামী কাওসার ও পরিবারের সদস্যরা। পরে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাকে পার্শ্ববর্তী একটি নির্মাণাধীন ভবনে ঝুলিয়ে রেখে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে প্রচার করে। এ ঘটনার দুই মাস পর ২০১৯ সালের ১২ মার্চ পটুয়াখালী থানায় সাথীর স্বামী কাউসার, শ্বশুর জাফর গাজী (৬০), শাশুড়ি ফাতেমা (৫০) ও ভাশুর আলামিন গাজীর (৩৫) বিরুদ্ধে হত্যা এবং আলামত গোপনের মামলা করেন আবদুল জলিল। এর পর থেকে প্রধান আসামি কাউসার প্রায় ২১ মাস কারাবন্দি রয়েছেন।

ইতিমধ্যে সাথীর পাঁচ বছরের মেয়ে আদালতে জবানবন্দিতে জানায়, তার আব্বু (কাওসার) আম্মুকে লাঠি দিয়ে মাথায় এবং দাদা শরীরে আঘাত করে। পরে রশি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখে। ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও মাথায় আঘাতের বিষয় উঠে আসে। সাথীর এক বছরের একটি ছেলেও রয়েছে।

গত বছরের ৩১ আগস্ট শ্বশুর-শাশুড়ি ও ভাশুরকে অব্যাহতি দিয়ে এ মামলায় পটুয়াখালীর সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। কিন্তু দীর্ঘদিন পর মামলার বাদী আবদুল জলিল প্রথমে বিচারিক এবং চলতি সপ্তাহে হাইকোর্টে হলফনামায় (এফিডেভিট) জানান,  প্রকৃতপক্ষে তার মেয়ে আত্মহত্যা করে। কিন্তু কিছু কুচক্রীর প্ররোচনায় তিনি জামাতার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন, যা আদৌ সত্য নয়।

আবদুল জলিল আরও বলেন, ‘আমার মেয়ে সাথী জামাতা সম্পর্কে ভুল বুঝে রাগের বশে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। আমার মেয়েজামাই দুটি নাবালক সন্তানের পিতা। ওদের ভবিষ্যৎ দেখাশোনার জন্য মামলাটি পরিচালনায় আমার আবশ্যকতা নেই।’

আদালতে আসামিপক্ষে মো. আসাদ মিয়া, রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ড. বশির উল্লাহ শুনানি করেন।

এ বিষয়ে বশির উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে জানান, বাদীর আচরণ অস্বাভাবিক। মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলা করেছেন; এখন হলফনামায় আসামির জামিনের সাফাই দিয়েছেন। এ ঘটনায় আদালত উষ্মা প্রকাশ করে বলেছে, প্রায়ই মিথ্যা তথ্য দিয়ে আসামিপক্ষ জামিন করানোর চেষ্টা চালায়। এ ধরনের ঘটনা রোধে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা দরকার (বাদীর বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ)। তবে কার মাধ্যমে প্ররোচিত হয়েছেন বাদী তা পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসবে বলে জানান তিনি।

আসামির আইনজীবী মো. আসাদ মিয়া বলেন, ‘ঘটনার দুই মাস পর মামলা, দুটি নাবালক সন্তান, সুরতহাল রিপোর্টে আঘাতের চিহ্ন না থাকলেও ময়নাতদন্তে এসেছে, এক বছর ধরে কোনো সাক্ষী আসছেন না এসব যুক্তিতে আমরা জামিন আবেদন করি। বাদী জামিন আবেদন না করলেও হলফনামায় আসামি অব্যাহতি পেলে আপত্তি থাকবে না বলে জানান। আদালত জামিন মঞ্জুর করে বাদীর বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ দিয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত