বঙ্গবন্ধুর নামে ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয়

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০২:২৫ এএম

শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন না থাকলেও নীলফামারীর সৈয়দপুরে ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও উদ্বোধন করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে ট্রাস্টি বোর্ডও। পত্রিকায় দেওয়া হয়েছে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। অবৈধ এই কর্মকা-ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে স্থানীয় সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য এবং একজন কলেজশিক্ষকের। যদিও ওই সংসদ সদস্য এই বিষয়ে অস্বীকার বা স্বীকার কোনোটাই করেননি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসির কর্মকর্তারা বলছেন, এই নামে দেশে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই, এমনকি কেউ এই বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপনের জন্য আবেদনও করেনি।

ভুয়া এই বিশ্ববিদ্যালয়টির নামে ফেইসবুকে একটি পেইজ পাওয়া গেছে। পেইজটি চলতি বছরের ২০ এপ্রিল খোলা হয়েছে। এরপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে লোগো এবং ব্যানার বানিয়ে বিভিন্ন সময় পোস্ট করা হয়েছে। এছাড়া পেইজটিতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ছবিতে নীলফামারী ২ এবং ৩ সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য (৩২৩ মহিলা আসন) রাবেয়া আলীমকে দেখা গেছে। সেসব ছবির বর্ণনায় রাবেয়া আলীমকে বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টির উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চ্যান্সেলর (ভারপ্রাপ্ত) পরিচয় দেওয়া হয়েছে অধ্যাপক ড. এবিএম শরিফুজ্জামান শাহ নামে এক ব্যক্তিকে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি নীলফামারীর একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষক।

বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সৈয়দপুরের বঙ্গবন্ধু সড়কে অবস্থিত ‘সরকার টাওয়ার’ নামে একটি ভবন। যেখানে প্রায়ই স্বঘোষিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টের সদস্যরা সভা সেমিনারের আয়োজন করেছেন নিয়মিত। বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর। যেটির উদ্বোধন করেছেন সংসদ সদস্য রাবেয়া আলীম। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন এমনকি বিভিন্ন সভা সেমিনারের ছবি ও খবর স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছে। ফেইসবুকে প্রচার করা বিভিন্ন পোস্ট থেকে জানা গেছে, এই বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য এবং বিভিন্ন কর্মকান্ডে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের নাম রয়েছে।

সম্প্রতি দৈনিক করতোয়া পত্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরই বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসির নজরে এসেছে। নজরে আসার পরই ইউজিসি গতকাল এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে, এই নামে দেশে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব নেই। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপনের কোনো আবেদনও নেই ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে।

এমন কর্মকান্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে ভুয়া এই বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং সংসদ সদস্য রাবেয়া আলীম গতকাল মোবাইলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার পক্ষে এ বিষয়ে তেমন কিছুই বলা সম্ভব নয়। বয়স হয়েছে ভুলে গেছি। হয়ত এলোমেলো বলে ফেলব। আমি অনেক দিন ওদিকে (সৈয়দপুর) যাই না। ভুলে গেছি সব। এর চেয়ে ভালো আমার ছেলে রাশেদুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলেন। সে সৈয়দপুরের একটি স্কুলের শিক্ষক, সে ভালো বলতে পারবে।’ তবে তিনি তার ছেলের মোবাইল নম্বর দিতে পারেননি।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চ্যান্সেলর (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. এবিএম শরিফুজ্জামান শাহর কথা জানতে চাইলে তিনি তার কথাও বলতে পারেননি।

অধ্যাপক ড. এবিএম শরিফুজ্জামান শাহর মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় নামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব সম্পর্কে কমিশন অবগত নয়। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় নামক কোনো প্রকল্প প্রস্তাবও ইউজিসিতে পাঠানো হয়নি। ইতিমধ্যে আমাদের হাতে ওই ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয় উদ্বোধনসহ নানারকম প্রমাণ চলে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির নামে একটি ফেসবুক পেইজ রয়েছে। সেটা বন্ধে বিটিআরসিকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ইউজিসি ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকবৃন্দ ও চাকরিপ্রত্যাশীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। আগ্রহীদের প্রয়োজনে ইউজিসির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা ও অনুমোদিত প্রোগামের তালিকা দেখতে বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০’ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ও আচার্য প্রত্যেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর মেয়াদে ভিসি, প্রো-ভিসি এবং কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেন। তাই এসব পদে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ কাউকে নিয়োগ প্রদান করলে তা হবে সম্পূর্ণ আইন পরিপন্থী। এছাড়া উপাচার্যবিহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রোগ্রামের প্রদত্ত সার্টিফিকেটও অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত