ভোজ্যতেল ও চালের অস্বাভাবিক দামে নাকাল ভোক্তা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি আরও ১০ টাকা বৃদ্ধি অথবা এক স্তরের ভ্যাট চায় বিপণন কোম্পানিগুলো। পেঁয়াজ, আলুর দামও চড়ছে কয়েক মাস ধরে। দাম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। কিন্তু বাস্তবতা আগেও যেমন ছিল, এখনো তেমনি। বাজারে এখন ভালো মানের মোটা চাল কিনতে হচ্ছে ৫৫ টাকা কেজি দরে। আর সয়াবিন তেলের লিটার বিকোচ্ছে ১২০ টাকা। নতুন করে দাম বৃদ্ধির তালিকায় যুক্ত হয়েছে রসুন। যদিও শিগগিরই দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে আবারও এমন আশ^াস শুনিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, কেজিপ্রতি নাজিরশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৮-৭০ টাকা দরে। আর মিনিকেট চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকা। এ ছাড়া নিম্নমানের মোটা চালের কেজিও এখন ৪৮-৫০ টাকা।
বাজারে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের লিটার ১১০ টাকা। প্রতি কেজি ভালো মানের পুরনো আলুর কেজি ৪৫, নতুন ৫০-৫৫, দেশি পুরনো পেঁয়াজ ৭০-৮০ ও নতুন পেঁয়াজ ৬০-৭০ টাকা। এ ছাড়া ভালো মানের রসুনের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৩০ টাকা দরে। চট্টগ্রাম নগরীতে সপ্তাহ ব্যবধানে নাজিরশাইল চালে কেজিপ্রতি ৮ টাকা বেড়ে গতকাল ৬৮ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। মোটা স্বর্ণা চালে কেজিতে ২ টাকা বেড়ে বিক্রি হয়েছে ৫৪ টাকায়। আর কেজিপ্রতি ৪ টাকা বেড়ে বিরি-২৮ চাল বিক্রি হয়েছে ৫৬ টাকা দরে। দেশি পুরনো পেঁয়াজ কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ৫০ টাকা ও আমদানি পেঁয়াজ প্রকার ও মানভেদে ৫-১৫ টাকা বেড়ে ৩০-৪৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
রাজধানীর নাখালপাড়ায় থাকেন রিকশাচালক ইব্রাহীম আদহাম। তিন সন্তান ও পিতামাতসহ তার সংসারে মোট সাতজন সদস্য। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রোজ তিন কেজির বেশি চাউল লাগে। কেজিতে দাম বাড়ছে ৮-১০ টাকা। হিসাব করলে মাসে ১ হাজার টাকা খালি চাউলেই নাই। ত্যাল (সয়াবিন তেল), পেঁয়াজ, আলু সবকিছুরই দামই বাড়ছে। ওএমএসের গুদামের চাউল কিনতে বড় লাইন। সেখানে যে সময় যাবে, তাতে একটা ট্রিপ হয়। এমনিতেই করোনার পর থেকে ট্রিপ কমে গেছে। তাই সময় নষ্ট করি না। আমাদের দুঃখ বোঝার মতো কেউ নাই।’
চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার কাজ করছে ১৪ ডিসেম্বর দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানিয়েছিলেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম। চালের দাম এখনো নিয়ন্ত্রণে না আসার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজকে বললাম আর কালকেই দাম কমবে, বিষয়টা এমন না। এটা সময়সাপেক্ষ বিষয়। কৃষক বেশি দামে ধান বিক্রি করছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাই মিলাররা চালের দাম বেশি নেবেন। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি কোথাও কিন্তু অতিরিক্ত চাল মজুদ নেই। যেটা বলতে পারেন সেটা হলো মিলাররা বেশি করে ধান কেনায় বাজারে ধানের দামটা একটু বেশি বেড়ে গেছে। এতে তো কৃষকের লাভ হচ্ছে। আমরা মোটা চাল আমদানি করতেছি। এ সপ্তাহেই এটা আমরা পাব। আর ৪ লাখ টন চাল আমদানির দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। একটু অপেক্ষা করেন। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
আমদানিকৃত চাল কেবল খাদ্য অধিদপ্তর বিক্রি করবে, নাকি খোলাবাজারে বিক্রি হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা মোটা চাল আমদানি করছি। এটা ওএমএস (খোলাবাজারে) বিক্রি হবে। এতে যারা মোটা চাল খায় তাদের খুচরা বাজারে যেতে হবে না। ফলে বাজারে চালের ওপর চাপ কমবে।’ খুচরা বাজারের জন্য চাল আমদানি করা হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে তো দেখি কী অবস্থা দাঁড়ায়। প্রয়োজন হলে সেটাও করব। এ ছাড়া আগামী মাসে ওএমএসের আওতা আরও বাড়ানো হবে।’
এদিকে গত ৫ মাসে সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৩-২২ টাকা বাড়িয়েছে বিপণন কোম্পানিগুলো। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় খরচ বেশি পড়ছে উল্লেখ করে গত ১৫ নভেম্বর লিটারে আরও ১০ টাকা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিপণনকারী কোম্পানিগুলোর সমিতি বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। প্রস্তাবিত দর যৌক্তিক কি না, তা যাচাই করতে ২৬ নভেম্বর বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে (বিটিটিসি) চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণারয় গত সপ্তাহে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। কিন্তু এখনো কোনো সুরাহা হয়নি। তাই বাজারে লিটারপ্রতি সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা দরে।
তীর ব্র্যান্ডের বোতলজাত সয়াবিন তেল উৎপাদক কোম্পানি সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ^জিৎ সাহা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে মন্ত্রণালয় বসেছিল। আমরা আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি। তিন স্তরের ভ্যাট থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে খরচ বাড়ে। কমলে খরচ কমে। সরকার যদি এক স্তরের ভ্যাট করে তাহলে এই সমস্যা থাকে না। কিন্তু মন্ত্রণালয় এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।’
পেঁয়াজের দামের বিষয়ে শ্যামবাজার বণিক সমিতির সহসভাপতি আবদুল মাজেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এত দিন কুয়াশা থাকায় কৃষক পেঁয়াজ তুলতে পারেননি। আর পুরনো পেঁয়াজের সরবরাহ তো প্রায় শেষ। তাই দাম কিছুটা বাড়তি। আবহাওয়া এখন কিছুটা ভালো। বাজারেও নতুন পেঁয়াজ আসতে শুরু করেছে। আগামী সপ্তাহে দাম আরও কমবে। রসুনের অবস্থাও একই। নতুন রসুন বাজারে আসতে শুরু করলে এই সমস্যা আর থাকবে না।’
স্বস্তি সবজির বাজারে : ডিসেম্বরজুড়েই কিছুটা স্বস্তি মিলছে সবজির বাজারে। মূলত শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছে। যদিও এখনো তেমন একটা কমেনি কাঁচামরিচ, টমেটো ও পেঁয়াজের দাম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন বছরের শুরুতে এসব পণ্যের দামও কমবে। সবজির চাহিদা বাড়ায় কিছুটা কম মাছের দামও।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতিটি ফুলকপি ও বাঁধাকপি বিক্রি হয়েছে ২০-৩০ টাকা দরে। কেজিপ্রতি মুলা, শালগম, পেঁপে ও শিম বিক্রি হয়েছে ৩০-৪০ টাকা দরে। প্রতি কেজি ঢেঁড়স বিকোচ্ছে ৪০ টাকা ও বেগুন মানভেদে ৫০-৬০ টাকা। বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজের পাতা (কালি) ৪০ টাকা, পটোল ৫০ টাকা, কাঁচা টমেটো ৪০ টাকা, গাজর ৫০-৬০ টাকা, নতুন আলু ৫০-৬০ টাকা, পুরনো আলু ৪৫ টাকা, পাকা টমেটো ১০০ টাকা, চিচিঙা, ঝিঙে ৫০-৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ১০০-১২০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
বাজারে ছোট আকারের রুই-কাতলা ১৮০-২২০ টাকা ও বড় আকারের রুই-কাতলা ৩০০-৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি তেলাপিয়া বিক্রি হয়েছে ১৪০-১৫০ টাকা, পাঙাশ ১৪০ টাকা, বাগদা ও গলদা ৫০০ টাকা, টেংরা ৩৫০-৪০০ টাকা, শিং ৪০০ টাকা, পাবদা ৪০০-৪৫০ টাকা, সাগরের টেংরা ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরীতে কিছুটা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে টমেটো ও মিষ্টিকুমড়া। কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে পণ্য দুটি ৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। বাজারে ফুলকপির কেজি ১৫-২০ টাকা, বাঁধাকপি ২০ টাকা, বেগুন ৩০ টাকা, গাজর ও শসা ৪০ টাকা, বরবটি ৫০-৬০ টাকা, মুলা ও লাউ ৩০ টাকা, উচ্ছে ৫০ টাকা এবং কাঁচামরিচ ১০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
