দুইজনে টিকে আছে আস্ত একটা ভাষা

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:১১ এএম

ব্রাজিলের পুরুবোরা আদিবাসীদের মাতৃভাষা পুরুবোরা। করোনা আক্রান্ত হয়ে এই গোষ্ঠীর কয়েকজন সদস্যের মৃত্যু হয়েছে।  সাবলীলভাবে যে দুজন এই ভাষা জানেন, তারাও বয়সের ভারে ন্যুব্জ এবং করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় রয়েছেন। ফলে ভাষাটি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

পুরুবোরা ভাষা

পুরুবোরা ভাষায় কথা বলা ব্রাজিলের এলিজার পুরুবোরা নামে একজন ব্যক্তি এ বছরের শুরুতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন। ৯২ বছর বয়সে তার মৃত্যু হলেও একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এখন শঙ্কিত করছে অনেককেই। ইউরোপিয়ানরা আসার পর থেকেই ব্রাজিলের আদিবাসী ভাষা হুমকির মুখে পড়েছে। ১৫০০টি প্রচলিত ভাষার মধ্যে এখন মাত্র টিকে আছে ১৮১টি ভাষা। এগুলোতেও আবার কথা বলেন হাজারখানেকেরও কম মানুষ। বেশি মানুষসহ কয়েকটি দেশীয় গোষ্ঠী যেমন ‘গুয়ারানি এমবায়া’ তারা নিজেদের মাতৃভাষা এখনো টিকিয়ে রাখতে পেরেছেন। কিন্তু পুরুবোরার মতো ছোট ছোট গোষ্ঠীদের (বর্তমানে এই গোষ্ঠীতে মানুষ আছেন মাত্র ২২০ জন) ভাষা বাঁচিয়ে রাখা এখন এক রকম সংগ্রাম হয়ে দেখা দিয়েছে।

মহামারী এই সময়টিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। করোনায় ব্রাজিলে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৯ হাজার, এর মধ্যে পুরুবোরার ছয়জনসহ ৮৭৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। ভাষারক্ষকদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে এই মহামারীতে। ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন সময় সাংস্কৃতিক নানা আয়োজন করা হতো, যেগুলো এই মহামারীর সময়ে এক রকম বন্ধ হয়ে আছে, বয়স্কদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে নিষেধ করা হচ্ছে, আক্রান্তদের আইসোলেশনে রাখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ভাষা টিকিয়ে রাখার লড়াই বর্তমানে নাজুক হয়ে পড়েছে। পুরুবোরা আদিবাসীদের নিজেদের ভাষা আর সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে অনেক বছর ধরে লড়াই করে যাচ্ছেন তারা।

নাম ও জনসংখ্যা

বর্তমানের আপেরোই গ্রাম অর্থাৎ পুরুবোরা গ্রামটি বিআর-৪২৯ হাইওয়ে ও ম্যানুয়েল কোরিয়া নদীর মাঝখানে অবস্থিত। গ্রামটি সেরিনগুয়েরিস থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে। ‘পুরুবোরা’ মূলত স্ব-উপাধি দেওয়া জনগোষ্ঠী। এই শব্দের অর্থ ‘বাঘে রূপান্তরিত হওয়া’। বর্তমানে এই গোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমছে, বিশেষ করে ব্রাজিলের রন্ডোনিয়া ও আরও বেশ কয়েকটি রাজ্য থেকে। সাম্প্রতিক সময়ের সংরক্ষিত তথ্য থেকে জানা যায়, বর্তমানে আপেরোই গ্রামে ৪০ জন এবং সাইয়ো এসপিনডোলা, ম্যানুয়েল কোরিয়া, ক্যাবিক্স নদীর আশপাশে অল্প কয়েকজন পুরুবোরা ভাষায় কথা বলেন এমন ব্যক্তি রয়েছেন।

আপেরোই গ্রামে যে কয়টি পুরুবোরা পরিবার রয়েছে তারা প্রায় সবাই একে অন্যের সঙ্গে ঘোরাঘুরি বা একে অন্যের সঙ্গে দেখা করে যতটুকু সম্ভব আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রেখে চলেন। এই পরিবারের সদস্যরা বলেন, রনডোনিয়া ও সেরিঙ্গুয়েরাসের মিউনিসিপ্যালিটিস, সাও ফ্রান্সিসকো দ্য গুয়াপুর, সাও মিগুয়েল দ্য গুয়াপুর, আল্টা ফ্লোরেস্টা দ্য ওয়েস্ট, কস্টা মারকুইস, রোলিম দ্য মরা, জি পারানা, অ্যারিকমিস, পোর্তো ভেলহো এবং গুয়াজারা মিরিমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আর মাত্র অল্প সংখ্যক পুরুবোয়া ভাষায় কথা বলা ব্যক্তি আছেন।

২০০৮ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী পুরুবোরা ভাষার আর মাত্র ৩০০ জন জীবিত মানুষ বেঁচে আছেন। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা কমে এসে দাঁড়ায় ২২০-এ। ঐতিহাসিক এক তথ্যমতে, অলিম্পিও দা ফন্সিকা ফিলহো নামে একজন ব্যক্তি ১৯২৪ সালে সাও মিউজুয়েল নদীর এলাকায় পুরুবোরা ভাষায় কথা বলেন এমন প্রায় ৫০ জন মানুষের খোঁজ পেয়েছিলেন।

গোপনীয় ভাষা

প্রায় ১০০ বছরেরও আগে ইন্ডিয়ান প্রটেকশন সার্ভিসের অধীনে কাজ করা রাবার টেপাররা (রাবার গাছ থেকে রাবার সংগ্রহকারী) রোনডোনিয়ার অ্যামাজোনিয়ান স্টেটে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে রাবার গাছ থেকে কষ সংগ্রহ করা জন্য আদিবাসী পুরুষ, কিশোরদের কাজে যুক্ত করেন। নারী ও কিশোরী মেয়েরা সেই কষ প্যাকেট করে দিতেন সংগ্রহকারীদের। বাইরের কেউ এলে তাদের সঙ্গে একমাত্র কথা বলা হতো পর্তুগিজ ভাষায়। নিজস্ব ভাষায় কথা বলার কোনো অনুমতি ছিল না।

মা এমিলিয়ার মৃত্যুর পর পুরুবোরাদের নেতৃত্বকারী হিসেবে দায়িত্ব পান হোজানা পুরুবোরা। তিনি বলেন, ‘সংস্কৃতি নিয়ে যে কোনো কিছু করা আমাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। আমার মা এমিলিয়া এলিজারের ছোটবেলার বন্ধু ও আত্মীয় ছিলেন। ছোটবেলায় যখন আশপাশে কেউ থাকতেন না তখন তারা পুরুবোরা ভাষায় একে অন্যের সঙ্গে নিচু স্বরে কথা বলতেন। তারা মূলত  গোপনীয়তা বজায় রেখে পুরুবোয়া ভাষাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।’ ১৯৪৯ সালে ইন্ডিয়ান প্রটেকশন সার্ভিস ঘোষণা দেয় রোনডোনিয়ায় আর কোনো আদিবাসী মানুষ নেই। কারণ তারা বর্তমান সভ্যতার সঙ্গে মিশে গেছে। ঠিক সে সময় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হারিয়ে  যেতে থাকে পুরুবোরারা।

আর্কাইভ তৈরি

ঘোষণা দিয়ে একটি ভাষা হারিয়ে গেছে এমন বলা হলেও পুরুবোরারা  তাদের ভাষা হারিয়ে  গেছে এটা মানতে অস্বীকৃতি জানান। যে কয়জন বেঁচে আছেন তারা কয়েকজন মিলেই ঠিক করেন ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই আপেরোই নামে শেষ পুরুবোরা গ্রামটি তৈরি হয়। গ্রামে এসেই তারা সয়া ও গবাদি পশুর খামারিদের কাছ থেকে ৬২ একর পৈতৃক জমি কিনে নেন। তবে এটা তাদের বসবাসের জন্য যথেষ্ট ছিল না। এ কারণে এলিজার তার মেয়েকে নিয়ে নিকটবর্তী শহর গুয়াজারা মিরিমে বসবাস শুরু করেন। অনেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করতে থাকেন।

পুরুবোরারা এমিলিও গোয়েলদি প্যারায়েন্স জাদুঘরের একজন ভাষাবিদ আনা ভিকলাসি গালুসিওর সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন। এই জাদুঘরটি ছিল ব্রাজিলিয়ান আমাজনের ৮০টি আদিবাসী ভাষার স্থায়ী আর্কাইভ। পুরুবোরাদের সাহায্যে তিনি তাদের নিজস্ব ভাষা নিয়ে আর্কাইভ তৈরির উদ্যোগ নেন। গালুসিও যখন ২০০১ সালে পুরুবোরাদের গ্রামে যাওয়া শুরু করেন, সে সময় মাত্র নয়জন পুরুবোরা বয়স্ক সদস্য বেঁচে ছিলেন। যার তালিকায় এলিজার ও এমিলিয়াও ছিলেন। তারা আবার নিজেরাই ভাষা টিকিয়ে রাখার কাজ করছিলেন। কারণ অনেকেই গ্রাম থেকে দূরে থাকতেন আর কয়েক দশক ধরে পুরুবোরা ভাষাতে এখানে সেভাবে কেউ কথা বলেননি।

গালুসিও বলেন, ‘এমন নয় যে তারা এই ভাষায় কথা বলতে পারতেন না। কেউ না বলায় তারা নিজেরাই ভাষাটি শুনতেন না। যার কারণে ভাষার সঙ্গে তাদের নিজেদেরই যোগাযোগ ছিল না।’ গালুসিও তাদের সবাইকে কাজ করার জন্য একত্রিত করলেন। তাদের শোনার জন্য হেডফোন এবং বলার জন্য মাইক্রোফোন দেওয়া হলো। তারা যে কথাই বলছেন, তাই রেকর্ড হয়ে যাচ্ছিল ভাষার অডিও আর্কাইভে। প্রথম দিকে নিজেদের ভাষারই খুব কম শব্দ মনে করতে পেরেছিলেন তারা। প্রাণীদের নাম সহজেই মনে আসে, কিন্তু কষ্ট হচ্ছিল ব্যাকরণ ও বাক্যগঠন করার ক্ষেত্রে। কিন্তু তারা যত বেশি সময় একে অন্যের সঙ্গে কথা বলেছেন, ধীরে ধীরে তত বেশি শব্দ তাদের মনে আসতে থাকে। গালুসিও’র এমন সিদ্ধান্ত একটি ভাষাকে নতুনভাবে বেঁচে ওঠার জন্য বেশ সহায়ক ছিল।

বর্তমানে পুরুবোরা ভাষায় স্বচ্ছন্দে কথা বলতে পারেন এমন ব্যক্তি মাত্র দুজন। তারা হলেন পাওলো অ্যাপোরেটে ফিলো এবং নিলো পুরুবোরা। তাদের দুজনেরই বয়স ৯০-এর কোঠায়। আবার দুজনেই বয়সের ভাওে নূজ্য। এদিকে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তাদের মধ্যে অনেক বেশি। তারা কেউই আপোরাই গ্রামে থাকেন না। আর মহামারীর এ সময়ে তাদের সঙ্গে দেখা করার জন্য কেউ যান না। অন্যদের আরও নতুন নতুন তথ্য জানানোর আগেই তাদের দুজন করোনায় মারা যেতে পারেন এ শঙ্কা এখন গালুসিও’র। ‘এখনো আর্কাইভ করার অনেক কিছু বাকি। আমরা আসলেই অনেক চিন্তিত। তাদের এখনো অনেক কিছু বলার বাকি।’

অনুপ্রেরণা

সংখ্যায় বেশি হলেও গুয়ারানি এমবায়াদের ওপরও মহামারী ব্যাপকভাবে আঘাত হেনেছে। সাও পাওলোতে তাদের সম্প্রদায়ের তৈরি করা ছয়টি গ্রামের শতাধিক মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। যেখানে শত বছর বয়সী মানুষও আছেন। তবে আশার খবর হচ্ছে, এখন পর্যন্ত কারও মৃত্যুর খবর আসেনি। সম্প্রদায়টির প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো যারা গুয়ারানি ভাষা ও সংস্কৃতি শিক্ষা দিয়ে থাকেন, সেগুলোও বন্ধ। ফলে শিশুদের পড়াশোনা থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে। অনেক মানুষ এরই মধ্যে চাকরি হারিয়েছেন। কিন্তু এরপর গুয়ারানি ভাষা একটি অপ্রত্যাশিত অনুপ্রেরণা লাভ করেছে। যখন মহামারীটি আঘাত করে তখন অ্যান্থোনি কারাই নামে এক তরুণ আদিবাসী নেতা অনলাইনে ভাষা শিক্ষার ক্লাস চালু করেন। এটি মূলত সম্প্রদায়ের বেকারদের আয়ের উপায় ছিল। তিনি ধারণা করেছিলেন, খুব বেশি হলে হয়তো ১০০ জন শিক্ষার্থী অনলাইনে যুক্ত হবেন। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, বিলুপ্তপ্রায় এই ভাষা শিখতে দুই ঘণ্টার মধ্যে ৩০০ জন সেখানে নাম লিখিয়েছেন।

কারাই কাউকে ফেরাতে চাননি। তিনি ভিন্ন গ্রাম থেকে আরও দুজন শিক্ষককে ডাকলেন অতিরিক্ত ২০০ জন শিক্ষার্থীর জন্য। গুয়ারানি ভাষা শেখানো তাকে কেবল ভাষাকে জীবন্ত রাখতে সহায়তা করেছে তাই নয়, বরং আদিবাসীদের বাইরেও ভাষাটিকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। কারাই বলেন, ‘যখন কোনো নতুন ভাষা আপনি শেখা শুরু করলেন, এর মানে আপনাকে তখন শুধু ভাষা জানলেই হবে না, সেই সংস্কৃতি সম্পর্কেও জানতে হবে।’ কারাইয়ের এই বক্তব্য একদম সত্যি। একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে একটি সংস্কৃতিও মুছে যাওয়া। এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামটাই এখন পুরুবোরা ভাষার অন্য একজন শিক্ষক মারিও পুরুবোরার জন্য উদ্বেগের বিষয়।

আপেরোইতেও গুয়ারানি এমবায়া গ্রামের মতো শিশুরা স্কুলে পুরুবোরা শিখে থাকে। অথচ মহামারীর আগেই স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষ সেই স্কুল বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল, কারণ সেখানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল খুব কম। এমনকি ক্লাস চালু রাখার জন্য লড়াই করা মারিও নিজেও পুরুবোরাতে স্বচ্ছন্দ না। তিনি এই ভাষা নিজেই শিখেছেন গালুসিও’র রেকর্ড করা জাদুঘরের আর্কাইভ থেকে। মহামারীর আগে, গ্রামের বাইরে বয়স্কদের কাছে ভাষা নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর জানতে যেতেন তিনি। করোনাভাইরাস এই কাজটিকে এখন অনেক বিপজ্জনক করে দিয়েছে। এখন তার ভয় হচ্ছে, বয়স্কদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে অনেক না জানা তথ্য হারিয়ে যেতে পারে।

পুরুবোরা গোষ্ঠী আসলে নিজেদের গোষ্ঠীকে নিরাপদ রাখতে অনেক চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা নিজেদের বার্ষিক সব আয়োজন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিল করেছে, যেখানে তারা নিজেদের ভাষায় গল্প বলতেন, গান গাইতেন, ভাষা নিয়ে ভ্রমণের নানা গল্প শোনাতেন। তারা অবশ্য জানিয়েছেন, করোনার এই কঠিন সময়টুকু পার হয়ে গেলে নিজস্ব ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য খুব  বেশি করে কাজ করবেন তারা। বয়স্কদের মৃত্যুর সঙ্গে যেন ভাষার মৃত্যু না হয়, সেজন্যও তারা  চেষ্টা করবেন। মারিও বলেন, ‘অনেকেই বলেন আমাদের ভাষার পুনরুত্থান হয়েছে। কিন্তু এই শব্দটি আমার পছন্দ নয়। আমাদের পরিচিতি সব সময় ছিল, এখনো আছে। আর সব সময় থাকবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত