সার্ভিস মার্কেটিং এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০৬ এএম

গত ১২ ডিসেম্বর ছিল ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস’। এবার পালিত হয়েছে এর এক যুগ। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বর্তমানে আমাদের জাতির অন্যতম স্বপ্নের একটি। যা ‘ভিশন ২০২১’-এর অন্যতম লক্ষ্য। এটা একটি আত্মবিশ্বাসী ধারণা, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সব কাজের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) ব্যবহার করে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশকে উপকৃত করবে। ই-গভর্নেন্স, ই-বাণিজ্য, ই-উৎপাদন, ই- কৃষি, ই-ব্যাংকিং, ই-স্বাস্থ্য, মোদ্দাকথা সাধারণ মানুষের সার্বিক উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়ার জন্যই ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’। দেশব্যাপী আইসিটির অগ্রগতি হলেই হবে না, বিভিন্ন সংস্থা/প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। যাতে করে তারা প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক সাফল্য এবং সেবা বিকাশে অবদান রাখতে পারে। উন্নত বিশ্বে প্রধানত গ্রাহকদের চাহিদা বা পছন্দগুলো পূরণের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজিটাল সেবা যেমন এটিএম, টেলিফোন ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং ইত্যাদি সেবা প্রদান করছে। একইভাবে, বাংলাদেশেও বেশিরভাগ ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের এই ধরনের সেবা দিয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশে আমরা ই-ব্যাংকিং সেবা দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে খুব প্রাথমিক পর্যায়ে আছি। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল প্রযুক্তির চাপে রয়েছে। যেমন সরকারি পর্যায়ে ই-নথির প্রচলন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, পরীক্ষণ পর্যায়েও কাজ হয়েছে। কিছু কিছু প্রশিক্ষক তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। খুব দ্রুত পর্যায়ক্রমে সব সরকারি প্রতিষ্ঠান এই ই-নথির কার্যক্রম শুরু করবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানও পিছিয়ে নেই।

তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও এখন তাদের ব্যবসা প্রসারিত করছে এবং নতুন পণ্য ও সেবা প্রদান করছে। বাংলাদেশজুড়ে অনেক ব্যাংকে, ই-ব্যাংকিং এখন ব্যাংকারদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। কারণ এটি লেনদেন করার ব্যয়কে কমিয়ে দেয় ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানের দ্বারা নতুন নতুন গ্রাহককে আকর্ষণ করে। প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের চেয়ে বর্তমানের ই-ব্যাংকিং আগের চেয়ে দ্রুত লেনদেন করে, এবং সেবার মান ও সঠিক সেবা প্রদান করে। বাংলাদেশে ই-ব্যাংকিং একটি নতুন ধারণা না হলেও বেশি পুরাতনও নয়। তবুও গ্রাহকের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যবহারে এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যে বিষয় বা কারণগুলো গ্রাহকদের ই-ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের জন্য প্রভাবিত করে সেগুলো নিয়ে বাংলাদেশে গবেষণামূলক অধ্যয়নের অভাব রয়েছে। ফলে গ্রাহক বা কাস্টমারকে আকর্ষণ করার জন্য দরকার ‘সার্ভিস মার্কেটিং’ বা ‘সেবার বিপণন’। সার্ভিস মার্কেটিং বা সেবা বিপণন নামের ধারণাটি ১৯৭০ সালে প্রথম অ্যাকাডেমিকভাবে উত্থিত হয়েছিল। কিন্তু কোনো গ্রাহকের ই-ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ কী করে প্রভাবিত করা যায় বা আকর্ষণ করা যায় সেটা নিয়ে এখনো বাংলাদেশে খুব কমই গবেষণা হয়েছে।

একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং খাত প্রতিটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সুসংহত এবং দক্ষ আর্থিক সেবাগুলোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ই-ব্যাংকিং বিশ্বের সমস্ত দেশে একইভাবে বিকশিত হয়নি। আবার বয়সের ক্ষেত্রেও তরুণ এবং পুরুষ গ্রাহকরা ই-ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সুবিধা, নির্ভুলতা, দক্ষতা, কিউ-ম্যানেজমেন্ট, প্রবেশধিকার, প্রতিক্রিয়াশীলতা, সময়, ঝুঁকি, বিশ্বস্ততা, গোপনীয়তা, সত্যতা এবং কাস্টমাইজেশন ই-ব্যাংকিং সেবা মানের প্রাথমিক মাত্রা হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। বেশ আগে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে ব্যাংকের ওয়েবসাইটে এক জরিপ চালানো হয়েছিল। জরিপ থেকে দেখা গেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্যাংকগুলো ওয়েবকে তিনটি বিভিন্ন বিভাগে সুযোগ পৌঁছানোর জন্য ব্যবহার করছে: ১) বাজার সম্পর্কিত তথ্য, ২) ব্যাংকিং পণ্য ও সেবা প্রদান এবং ৩) ব্যাংকার-গ্রাহকের সম্পর্ক উন্নতকরণ। সৌদি আরবের ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য ইন্টারনেটকে তথ্য সরবরাহের সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। তুরস্ক ই-ব্যাংকিং গ্রহণের মাত্রা বা হার পরীক্ষা করে এবং এর বিস্তারকে প্রভাবিত করার কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করেছিল। বিভিন্ন গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে যে ই-ব্যাংকিং সেবাগুলো কেবলমাত্র ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় হ্রাস করে না বরং গ্রাহকের সন্তুষ্টির বা উপযোগের স্তরও বাড়িয়ে তোলে। তারা স্পষ্ট করে বলেন যে, ই-ব্যাংকিং সেবাগুলো গ্রাহক আকর্ষণের ক্ষেত্রে নানান সুবিধার যোগ করেছে। ‘দৃষ্টিভঙ্গিগত কারণ’ ই-ব্যাংকিং সেবা গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করে থাকে। এছাড়াও বয়স, লিঙ্গ, বৈবাহিক অবস্থা, শিক্ষা, আয় এবং পেশাসহ বিভিন্ন কারণও এই সেবা গ্রহণের ইচ্ছাকে প্রভাবিত করে থাকে। অর্থাৎ একজন গ্রাহক এই সেবা গ্রহণ করবে কি না তার প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। তার জন্য প্রয়োজন ই-ব্যাংকিং সার্ভিস মার্কেটিং। সরকারি বা বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান কাজের অংশ হিসেবে গ্রাহকের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশে সার্ভিস মার্কেটিংয়ের দ্বারা কোনো গ্রাহকের সন্তুষ্টি নিশ্চিতকরণ বিষয়টি এখনো অনেক পিছিয়ে। বিদেশে ‘গ্রাহক সন্তুষ্টি’ বাজারের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর সম্পর্ক মূল্যায়নের জন্য প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এই যুগে ডিজিটালাইজেশন ছাড়া আমরা কোনো ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাফল্যের কথা ভাবতে পারি না। সর্বশেষ প্রযুক্তি এবং সিস্টেমসম্পন্ন ব্যাংকগুলো প্রতিযোগিতামূলক ব্যাংকিং খাতে আরও সফল। ই-ব্যাংকিং সেবা বিপণন ধারণাটি বাংলাদেশে খুব একটা নতুন নয়। তবে এটি এখনো শিশু পর্যায়ে রয়েছে। বেশ কয়েকটি ব্যাংক ইতিমধ্যে তাদের গ্রাহকদের জন্য ই-ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে। তবে, আমাদের বেশিরভাগ ব্যাংকের জন্য ই-ব্যাংকিং সেবা কার্যকর করার জন্য নেই কোনো বিপণন প্রচারণা। বেশিরভাগ ব্যাংকের নিজস্ব ওয়েবসাইট রয়েছে তবে গ্রাহকরা যে যে বিষয়ে তথ্য পেতে চায় সে সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। বেশিরভাগ ব্যাংকার তাদের ওয়েবসাইটগুলোতে নিয়মিতভাবে নজর দেন না এবং তাদের ব্যাংক পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রদত্ত বিজ্ঞপ্তিগুলো অনুসরণ করেন না। বাংলাদেশের কিছু গবেষণামূলক প্রবন্ধ আমাদের এই পরামর্শ দেয় যে, গ্রাহকদের সন্তুষ্টির জন্য তথ্যের গুণমান উন্নত করা দরকার। গ্রাহকরা চায় বাংলাদেশে ই-ব্যাংকিং সেবা বিপণনের মান উন্নত হোক। ফলে এই আধুনিক ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা যেন তারা পেতে পারে। গত কয়েক বছরে, এটি ব্যাংক গ্রাহকদের কাছে অনেক গুরুত্ব পেয়েছ। এবং এটি আশা করা হয় যে পেশাদার ব্যাংকাররা ই-ব্যাংকিং সেবাগুলোকে ঠিকমতো বিপণন করলে এর ব্যবহার দিন দিন আরও বাড়বে।

এই আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা তথা ই-ব্যাংকিংয়ের ওপর আস্থা অর্জনের জন্য কম্পিউটারের সামগ্রিক শিক্ষার বিকাশ করতে হবে। এ লক্ষ্যে, দেশে আইটি শিক্ষার সাক্ষরতার বিকাশের জন্য সরকার মূল স্তরে উদ্যোগ নিয়েছে। এটি বাংলাদেশে ই-ব্যাংকিং সেবা বিপণনের উন্নয়নের জন্য এক নিখুঁত ভিত্তি হবে। পরিচালন এবং প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস করে এবং ব্যবহারকারীদের সন্তুষ্টি ও নিট সুবিধার জন্য নতুন গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো বাড়িয়ে বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় অর্থনীতিতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে ই-ব্যাংকিংয়ের সুবিধা গ্রহণ করা উচিত।

সরকারের উচিত স্ট্যান্ডার্ড সার্ভিস এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে ই-ব্যাংকিং সেবা প্রদানকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও উন্নত করা। যেহেতু ইনফরমেশন সিস্টেম, তথ্য এবং সেবার গুণাবলি সন্তুষ্টির প্রধান নির্ধারক, তাই ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষের উচিত ই-ব্যাংকিং সম্পর্কিত একটি কার্যকর সেবা বিপণন নীতি প্রণয়ন ও অনুসরণ করা। ডিজিটালাইজেশন শব্দটি কেবল বই বা সেমিনারে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং এটি বাস্তব জীবনের নানবিধ কর্মকা-ে প্রয়োগ করতে হবে। সমাজে ই-ব্যাংকিং সেবা বিপণন বাড়াতে মানুষের মুখে মুখে প্রচারণার পাশাপাশি অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও গ্রহণ করা দরকার।

লেখক ব্যাংকার ও গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত