আমদানিতে যেন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০৭ এএম

দেশের বাজারে চিকন চালের দাম এখন ৫০ কেজির প্রতি বস্তা ৩২০০ টাকা থেকে ৩৪০০ টাকার মধ্যে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি সরু চালের দাম পড়ছে ৬৪ থেকে ৬৬ টাকা। আর সরু চালের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাঝারি ও মোটা চালের দামও বেড়েছে। সরকারি হিসাবেই এখন প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা। এই পরিস্থিতিতে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ আর সরকারি নিরাপত্তা মজুদ ঠিক রাখার লক্ষ্যে চালে আবারও আমদানিনির্ভর হচ্ছে সরকার। এবার আমন মৌসুমে ৩৬ টাকা কেজি দরে মিলারদের থেকে চাল কেনার প্রস্তাব দেয় সরকার। এই দামে চাল দিলে লোকসান হবে এমন অজুহাতে কোনো মিল মালিক সরকারকে চাল দেননি। এমনকি বোরো মৌসুমে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পরও অধিকাংশ চালকল সরকারকে চাল দেয়নি। চাল সংগ্রহে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার কারণেই আমদানি করতে হচ্ছে সরকারকে। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কি এবার চালের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণে ব্যর্থ হয়েছে নাকি সরকার চালকল মালিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে? এবারের চাল সংকট অভাবনীয় ছিল না। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট আগেই বলেছে, পরপর চার দফা বন্যায় এবার ধান উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাতে ১৫ লাখ মেট্রিক টন চাল কম উৎপাদন হতে পারে। কিন্তু তারপরও যে পরিমাণ চাল উৎপাদন হবে, তা দিয়ে আগামী জুন পর্যন্ত চাহিদা মিটিয়েও কমপক্ষে ৩০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। সেক্ষেত্রে এখন যে চাল আমদানি করা হচ্ছে সেটা কতটা বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য আর কতটা খাদ্যের নিরাপত্তা মজুদের জন্য সেটাও বিবেচনা করা জরুরি।

রবিবার এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার জানিয়েছেন, চালের দাম নিয়ে ভোক্তাদের যাতে কষ্ট না হয়, আবার কৃষকও যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় চাল আমদানির সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য চালের আমদানি শুল্ক এখনকার ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী। উল্লেখ্য, এখন আমনের ভরা মৌসুম চললেও ধান ও চাল দুটোরই দাম গত বছরের তুলনায় বেশি। সরকারের ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে নাজিরশাইল ও মিনিকেটের দাম বেড়েছে ৯ দশমিক ৮২ শতাংশ। আর ইরি বা স্বর্ণার মতো মোটা চালের দাম ১২ দশমিক ৯৪ শতাংশ বেড়েছে। মাঝারি মানের চাল পাইজাম বা লতার দাম বেড়েছে ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অন্যদিকে, সরকারি গুদামগুলোতে ৫ দশমিক ৪২ লাখ মেট্রিক টন চাল মজুদ রয়েছে। চালের এই মজুদ গত বছরের এই সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। এই পরিস্থিতিতে ওএমএস, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, রেশনসহ অন্যান্য সরকারি প্রয়োজনে দরপত্র ও জিটুজি ভিত্তিতে চাল আমদানি করছে সরকার। ইতিমধ্যে ভারতের বাজার থেকে ৩৪ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে ১ লাখ টন চাল আমদানি শুরু করেছে সরকার। সর্বমোট ৪ লাখ টন চাল সরকারিভাবে আমদানির দরপত্র সচল হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী।

চাল আমদানি প্রসঙ্গে তিন বছর আগের অভিজ্ঞতা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ২০১৭ সালে আগাম বন্যায় হাওরের বোরো ধান বিনষ্ট হলে দেশে ১০ লাখ মেট্রিক টন চাল কম উৎপাদিত হয়। সরকার খাদ্য সংকট মোকাবিলায় চাল আমদানির শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেয়। সেই সুযোগে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে প্রায় ৬০ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানি করে। ফলে পরবর্তী দুই বছর দেশের কৃষকরা নিজেদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। তারা ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি। প্রতি মণ ধান ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হন। আর মিল মালিকরা সেই ধান থেকে চাল উৎপাদন করে সরকারি গুদামে সরবরাহ করে বিপুল বিত্তের মালিক হন। এবার এখনো পর্যন্ত কেবল সরকারি পর্যায়ে আমদানির সিদ্ধান্তের কারণে পরিস্থিতি খানিকটা ভিন্ন। সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি পর্যায়ে আমদানি করা চাল খোলাবাজারে বিক্রি করা হবে। সবগুলো মহানগরীতেই এই চাল বিক্রি হবে। এতে যেটা হবে, মোটা চাল খায় এমন বড় একটা অংশ খোলাবাজারে যাবে। তখন খুচরা বাজারে স্বাভাবিকভাবেই চাপ কমে যাবে। এরপরও যদি দেখি বাজারে দাম কমছে না, তখন বেসরকারিভাবেই চাল আমদানি করা হবে। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির সিদ্ধান্তের বিষয়ে আগাম সচেতনতা জরুরি। একই সঙ্গে বিশ^বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি এবং আগামী বছরের সম্ভাব্য মন্দার সংকটের বিষয়টিও সরকারকে মাথায় রাখতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত