দেশের কারাগারগুলোতে মাদক সরবরাহ বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ ও ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছে উচ্চ আদালত। একই সঙ্গে কারাগারে থাকা আসামির জামিন শুনানির জন্য আসামির ওকালতনামায় সংশ্লিষ্ট ডেপুটি জেলারের পূর্ণ নামসহ স্বাক্ষর থাকতে হবে বলে আদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে কারাগারগুলোকে আটটি নির্দেশনা দিয়ে রায় দিয়েছে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের হাইকোর্ট বেঞ্চ। ওকালতনামায় ডেপুটি জেলারের স্বাক্ষর ছাড়া ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এক আসামির জামিনে মুক্তির ঘটনা নজরে আসার পরিপ্রেক্ষিতে এসব নির্দেশনা আসে। গত ১৯ অক্টোবর এ বিষয়ে আদেশ হওয়ার পর গতকাল রবিবার এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ আদেশটি প্রকাশিত হয়।
হাইকোর্টের নির্দেশনাগুলো হলো ১. দণ্ডিত কিংবা বিচারাধীন মামলায় কারাবন্দিদের নাম, ঠিকানা, মামলার নম্বর, মামলার ধারা, কোন আদালতে মামলা বিচারাধীন বা কোন আদালতের রায়ে কী দণ্ড হয়েছে কারা মহাপরিদর্শক, জেলার, সহকারী জেলারকে সেসব তথ্য রেজিস্টারে রাখতে হবে; ২. দণ্ডিত বা বিচারাধীন মামলায় বন্দির কারাগারে আসা ও বের হওয়ার তারিখ রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে কারা কর্র্তৃপক্ষকে; ৩. যথাযথভাবে যাচাই এবং নিশ্চিত হওয়ার পর কারা কর্র্তৃপক্ষ বা কারা কর্মকর্তা দণ্ডিত ব্যক্তি বা বিচারাধীন মামলায় কারাবন্দির ওকালতনামায় সই ও সিল দেবেন; ৪. ওকালতনামার যেখানে সই ও সিল থাকবে তার পাশে সংশ্লিষ্ট কারা কর্মকর্তার পুরো নাম, কারাগারের ল্যান্ডফোন ও মোবাইল ফোন নম্বর উল্লেখ করতে হবে; ৫. কোনো অশোভন, অযাচিত পরিবেশ-পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয় সেজন্য যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি কারাগার ও কারা প্রাঙ্গণের শান্তি নিরাপত্তা বজায় রাখতে কারা কর্র্তৃপক্ষকে সবসময় সতর্ক ও সচেষ্ট থাকতে হবে; ৬. কারাগারের ভেতরে সব ধরনের অবৈধ মাদকদ্রব্যের সরবরাহ বন্ধে কারা কর্র্তৃপক্ষকে যথাযথ পদক্ষেপ ও ব্যবস্থা নিতে হবে; ৭. দর্শনার্থীদের কঠোরভাবে তল্লাশিসহ দর্শনার্থী কারও কাছে কোনো মাদকদ্রব্য, অবৈধ কিছু পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ও যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে এবং ৮. ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের কারা আইন, ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের কারাবন্দি আইন এবং বাংলাদেশ জেলকোডসহ সংশ্লিষ্ট সব আইনের বিধান কারা কর্র্তৃপক্ষকে কঠোরভাবে প্রতিপালন করতে হবে।
হাইকোর্টের এ আদেশের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র্যাবের মহাপরিচালক, আইজি প্রিজনস, সব জেলার ও ডেপুটি জেলারকে আদেশের অনুলিপি পাঠাতে হবে। প্রতি তিন মাস পরপর এ আদেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবরে দাখিল করতে হবে বলেও আদেশে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, এনআরবি ব্যাংকের প্রায় ১১ কোটি টাকা ঋণ আত্মসাতের অভিযোগের দুই মামলায় জিওলোজাইজ সার্ভে করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী মো. মিজানুর রহমান কনক গত ১৫ জুন হাইকোর্টের ভার্চুয়াল বেঞ্চ থেকে জামিন পান। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এসব মামলায় জামিনের শর্তে তাকে নিয়মিত আদালত খোলার এক সপ্তাহের মধ্যে জামিন নিয়মিত করতে বলা হয়। কারণ ওই সময় ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে আদালত চলছিল এবং তখন হাইকোর্টে এফিডেভিট (হলফনামা) করে ইমেইলে আবেদনের বিষয়টি ছিল না। ইতিমধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান আসামি। নিয়মিত আদালত শুরুর পর হলফনামা চালু হলে উচ্চ আদালতের হলফনামা শাখা দেখতে পায়, আসামির বিরুদ্ধে দুটি মামলার একটির ওকালতনামায় ডেপুটি জেলারের স্বাক্ষর নেই। একপর্যায়ে আসামিপক্ষ ডেপুটি জেলারের স্বাক্ষর সংবলিত ওকালতনামার হলফানামা দাখিল করে। কিন্তু দাখিল করা নথিতে ডেপুটি জেলার যে তারিখ দেন সে সময় কারাগারে ছিলেন আসামি। বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আসলে গত ৫ অক্টোবর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার খোন্দকার মো. আল মামুনকে তলব করে আদালত। তিনি ১৯ অক্টোবর হাইকোর্টে হাজির হয়ে এ বিষয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চান। এরই ধারাবাহিকতায় হাইকোর্ট আদেশ দেয় যে আসামির ওকালতনামায় ডেপুটি জেলারের স্বাক্ষর থাকতে হবে। একই সঙ্গে আসামিকে চার সপ্তাহের মধ্যে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়।
আদালতে দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. খুরশিদ আলম খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) এ কে এম আমিনউদ্দিন মানিক এবং আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও শামীমা আক্তার।
