ডিসেম্বর মাস বাংলাদেশের জন্য অনেক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের এই মাসেই আমরা ৩০ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা এবং দু’লাখ মা-বোনের চোখের জলে ভেজা মাটিতে বিজয় পতাকা উড়িয়ে ছিলাম। আবার ১৯৯০ সালের এই মাসের ৬ তারিখে সামরিক স্বৈরশাসককে ক্ষমতা থেকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিলাম। এই মাসে এই দুটি গৌরবের সঙ্গে একটি বেদনার দিন আছে। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের।
বিভিন্ন দেশের নির্বাচনের মান এবং বাংলাদেশের অবস্থান : যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দ্য ইলেক্টোরাল ইন্টিগ্রিটি প্রজেক্ট’ ২০১৯ সালের মে মাসে ‘পারসেপশন অব ইলেক্টোরাল ইন্টিগ্রিটি’ বা নির্বাচনী সততার ধারণা সূচক প্রকাশ করেছে। এতে ২০১২ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ১৬৬টি দেশে অনুষ্ঠিত ৩৩৭টি প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচন কেমন হয়েছে, তা তুলে ধরেন তারা। নির্বাচনী আইন, নির্বাচনের প্রক্রিয়া, আসনের সীমানা নির্ধারণ, ভোটার নিবন্ধন, দল নিবন্ধন, মিডিয়া কাভারেজ, প্রচারণার অর্থায়ন, ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়া, ভোট গণনা, ফলাফল ও নির্বাচন কর্র্তৃপক্ষ এই ১১টি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সূচকটি প্রকাশ করা হয়েছিল। ২০১২ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশে দুটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সূচকে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ৩৮ স্কোর করেছে। সে হিসেবে ১৬৬টি দেশের মধ্যে মাত্র ২১টি দেশের চেয়ে বাংলাদেশের নির্বাচনের মান ভালো। দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র আফগানিস্তানের (৩৪) চেয়ে বাংলাদেশের নির্বাচনের মান ভালো। অন্য দেশগুলোর স্কোর ভুটান (৬৬), ভারত (৫৯), নেপাল (৫৬), মালদ্বীপ (৫২), শ্রীলঙ্কা (৫২) ও পাকিস্তান (৪৭)। এ পরিস্থিতিতে দেশের ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে যে প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি তার বিরুদ্ধে কিছু গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা প্রত্যাশা করেছেন।
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আনা তাদের অভিযোগগুলো : ১. ‘বিশেষ বক্তা’ হিসেবে বক্তৃতা দেওয়ার নামে দুই কোটি টাকার মতো আর্থিক অসদাচরণ ও অনিয়ম। ২. নির্বাচন কমিশনের কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চার কোটি আট লাখ টাকার অসদাচরণ ও অনিয়ম। ৩. নিয়মবহির্ভূতভাবে তিনজন কমিশনারের তিনটি গাড়ি ব্যবহারজনিত আর্থিক অসদাচরণ ও অনিয়ম। ৪. ইভিএম কেনা ও ব্যবহারে গুরুতর অসদাচরণ ও অনিয়ম। ৫. একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে গুরুতর অসদাচরণ ও অনিয়ম। ৬. ঢাকা (উত্তর ও দক্ষিণ), খুলনা, গাজীপুর, সিলেট, বরিশাল ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোতে গুরুতর অসদাচরণ ও অনিয়ম। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনে প্রশিক্ষণ বাবদ বরাদ্দ ছিল ৬১ কোটি ২৫ লাখ ও ৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনাররা ‘বিশেষ বক্তা’ হিসেবে এই অর্থ নিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের তৎকালীন সচিব ‘কোর্স উপদেষ্টা’ হিসেবে একাই নিয়েছেন ৪৭ লাখ টাকা। সিইসি ও চার নির্বাচন কমিশনারসহ ১৩ জন কর্মকর্তা নিয়ে একটি ‘বিশেষ বক্তা’ প্যানেল গঠন করা হয়। রাষ্ট্রপতির কাছে লেখা চিঠিতে বিশিষ্ট নাগরিকরা উল্লেখ করেছেন যে, ‘ইসির নথিতে উল্লেখ আছে সিইসিসহ এই কর্মকর্তারা ১৮ দিনে ৫২০টি স্থানে বক্তৃতা করেছেন। প্রতিটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে চার জন বিশেষ বক্তার উপস্থিত থাকার কথা। ফলে প্রত্যেক ‘বিশেষ বক্তা’কে দিনে কমপক্ষে ১৪টি স্থানে বক্তৃতা দিতে হয়েছে। যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সংসদ নির্বাচনে প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে বরাদ্দ ছিল ৪৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এই অর্থ থেকে ১ কোটি ৪ লাখ টাকা ভাগ করে নিয়েছেন নয় জন ‘বিশেষ বক্তা’। রাষ্ট্রপতির কাছে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই অর্থ নেওয়ার বিষয়টি সংবিধানের ১৪৭(৩) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশনাররা, নির্বাচন কমিশনের সচিবের কাজ দেশে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করা। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তারা বাসস্থান, গাড়ি, বেতন-ভাতা, যাতায়াত সুবিধা, আপ্যায়ন সুবিধা, নিরাপত্তা পেয়ে থাকেন। তাদের পদমর্যাদা বিচারপতিদের সমান। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের বেতন ১ লাখ ৫ হাজার ও ৯৫ হাজার টাকা। তারা আজীবন পেনশন পাবেন মাসিক বেতনের সমপরিমাণ অর্থ।
নির্বাচন কমিশনারদের দায়িত্ব সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করা। প্রশিক্ষণসহ সবকিছুই এই আয়োজনের অংশ। তারা যে সম্মান ও সম্মানী পেয়ে থাকেন তা বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো বিবেচনাতেই কম নয়। ফলে এ সমস্ত কাজের জন্য দুই কোটি টাকা ভাতা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিটি ইভিএম কিনতে খরচ হয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৭৩ টাকা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ইসির জন্য যে ইভিএম তৈরি করেছিল, তার প্রতিটির দাম পড়েছিল ২০-২২ হাজার টাকা। ভারতের নির্বাচন কমিশন ইভিএমের দাম নির্ধারণ করেছে ১৭ হাজার রুপি। প্রতি রুপি ১ টাকা ২৫ পয়সা হিসেবে ধরে বাংলাদেশি টাকায় ভারতের ইভিএমের দাম পড়ে ২১ হাজার ২৫০ টাকা। সেই হিসাবে দেখা যাচ্ছে ভারতের নির্বাচন কমিশন কিংবা বাংলাদেশের বুয়েটের ইভিএম-এর তুলনায় প্রায় ১১ গুণ বেশি খরচ করে ইভিএম কিনেছে বাংলাদেশ। ভোটারদের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতার জন্য কমিটি ইভিএমে ভোটার ভ্যারিয়েবল পেপার অডিট ট্রেইল (যন্ত্রে ভোট দেওয়ার পর তা একটি কাগজে ছাপা হয়ে বের হবে) সুবিধা রাখার পরামর্শ দিলেও তা রাখা হয়নি। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এর প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে সংবিধানে যা উল্লেখ আছে তা হলো ১১৮। (১) প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চার জন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন। (৩) এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে কোনো নির্বাচন কমিশনারের পদের মেয়াদ তাহার কার্যভার গ্রহণের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসরকাল হইবে এবং (৪) নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবেন। (৫) সংসদ কর্র্তৃক প্রণীত যে কোনো আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশনারদের কর্মের শর্তাবলী রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা যেরূপ নির্ধারণ করিবেন, সেইরূপ হইবে: তবে শর্ত থাকে যে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হইতে পারেন, সেইরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত কোনো নির্বাচন কমিশনার অপসারিত হইবেন না।
নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে : ১১৯। (১) রাষ্ট্রপতি পদের ও সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার-তালিকা প্রস্তুতকরণের তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ এবং অনুরূপ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যস্ত থাকিবে এবং নির্বাচন কমিশন এই সংবিধান ও আইনানুযায়ী (ক) রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করিবেন; (খ) সংসদ-সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করিবেন; (গ) সংসদে নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করিবেন; এবং (ঘ) রাষ্ট্রপতির পদের এবং সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার-তালিকা প্রস্তুত করিবেন। (২) উপরি-উক্ত দফাসমূহে নির্ধারিত দায়িত্বসমূহের অতিরিক্ত যেরূপ দায়িত্ব এই সংবিধান বা অন্য কোনো আইনের দ্বারা নির্ধারিত হইবে, নির্বাচন কমিশন সেইরূপ দায়িত্ব পালন করিবেন। এই সাংবিধানিকভাবে গঠিত নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য দেশের ৪২ জন নাগরিকের পক্ষে চিঠি পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অবসরপাপ্ত মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান, অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল ও রাশেদা কে চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার ও মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন। অভিযোগে স্বাক্ষরকারী বাকিরা হলেন অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম, মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির ভিসি পারভীন হাসান, সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আহমেদ কামাল, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ও অর্থনীতিবিদ আহসান মনসুর। সাবেক সচিব আবদুল লতিফ মণ্ডল, স্থপতি মোবাশ্বের হাসান, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সি আর আবরার, আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদ, লুবনা মরিয়ম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আকমল হোসেনসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল নাগরিকরা। ৪২ নাগরিক তাদের পর্যবেক্ষণ, উদ্বেগ ও পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতির কাছে। তারা কি অপেক্ষায় থাকবেন নাকি উপেক্ষিত হবেন?
