নাতিবিলম্ব বিচারের চাবিকাঠি : তল্লাশিপর্ব

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ১০:৫৫ পিএম

‘Justice delayed is justice denied’ (ন্যায়বিচার অনন্তকাল ঝুলিয়ে রাখা না-দেওয়ারই সমান)। এ কি আজকের কথা! উক্তিটি বেশি চলে ভিক্টোরিয়ান যুগের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী (১৮৬৮-১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চারবারে ১২ বছর) উইলিয়াম এওয়ার্ট গ্ল্যাডস্টোনের নামে। তারও আগে ব্রিটিশের উত্তর আমেরিকান উপনিবেশের পেনসিলভানিয়া প্রদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক উইলিয়াম পেন (১৬৪৪-১৭১৮ খ্রিস্টাব্দ) নাকি এ রকমটাই বলেছিলেন। প্রখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক ফ্র্যান্সিস বেকন ১৬১৭ খ্রিস্টাব্দে ‘লর্ড-চ্যান্সেলর’ হয়ে বলেছিলেন ‘Swift justice is the sweetest’ (ত্বরিত বিচারই মধুরতম)। তারও আগে ১২১৫ খ্রিস্টাব্দের ম্যাগনা কার্টায় ৪০ অনুচ্ছেদে লেখা হয় ‘To no one will we sell, to no one will we refuse or delay, right or justice.’ (সত্য ও ন্যায়বিচার কারও কাছেই বেচব না, না-দেওয়া বা ঝুলিয়েও রাখব না)। খ্রিস্টীয় পঞ্চম-পঞ্চদশ শতকের লাতিন বিচার সূত্রে আছে ‘ In diem vivere in lege sunt detestabilis (Delays in the law are hateful আইনি বিচারে অতিবিলম্ব ঘৃণ্য কারবার)। ইহুদিদের নীতিকথার সংকলন ‘চরৎশবর আড়ঃ’-এ নাকি এমন কথাই আছে।

ভিক্টোরিয়ান যুগের ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থার লটপটে অবস্থাকে কটাক্ষ করে সেই ১৮৫২-৫৩ খ্রিস্টাব্দে চার্লস ডিকেনস ‘ব্লিক হাউজ’ উপন্যাসটি মাসিক কিস্তিতে লিখে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেন, গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দেই। একটি উইল নিয়ে চ্যান্সারি কোর্টে ‘জার্নডাইস অ্যান্ড জার্নডাইস’ নামের (কল্পিত) মামলায় দশক ছাড়িয়ে যুগ পেরোনো দীর্ঘসূত্রতার খাঁই মেটাতে সেই উইলের পুরো সম্পত্তিই নিঃশেষ, দুপক্ষ সর্বস্বান্ত, একপক্ষের যক্ষ্মাক্রান্ত হওয়ার আর আরেকপক্ষের মারা যাওয়ার করুণ কাহিনী। একেবারে বানিয়ে লেখেননি ডিকেন্স। নিজের তো বছর-দেড়েকের অভিজ্ঞতা আগেই ছিল হলবর্ন কোর্টের আইনজীবী ফার্মে জুনিয়র ক্লার্ক হিসেবে। চ্যান্সারি কোর্টে তখন সত্যিই অমন বেহালদশা। দুটি মামলার কথা তো ডিকেন্স উপন্যাসের ভূমিকাতেই লিখেছেন। সে দুটিও উইলের মামলা। একটি ২০ বছর ধরে, আরেকটি ৫৫ বছর ধরে চলে আসছিল তখন অবধি।

আমাদের যে মিটফোর্ড হাসপাতাল, সেটিরও প্রতিষ্ঠা পিছিয়েছিল চ্যান্সারি কোর্টের মামলায়। ঢাকার ১৮১৬-২২ খ্রিস্টাব্দের কালেক্টর ও ১৮২২-২৮ খ্রিস্টাব্দের প্রাদেশিক আপিল আদালতের জজ রবার্ট মিটফোর্ড নিজ সম্পত্তি থেকে ঢাকায় দাতব্য কাজের জন্য তখনকার দিনের প্রায় আট লাখ রুপি উইল করে ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে মারা যান প্যারিসে। চ্যান্সারি কোর্টে তার ওয়ারিশদের করা মামলা মেটে ১৪ বছর পর ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে, ঢাকার ভাগে মাত্র ১ লাখ ৬৬ হাজার রুপি রেখে। তাই দিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের শুরু ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে। মামলা নিয়ে দশক ছাড়িয়ে যুগ যুগ ঝোলানো লটপটে সেই বিচারব্যবস্থা ব্রিটিশ রোপণ করে গেছে আমাদের এখানে। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে তারা ‘সুপ্রিম কোর্ট অব জুডিক্যাচার অ্যাক্ট’ দিয়ে নিজেদের বিচারব্যবস্থার সংস্কার শুরু করে এবং সংস্কার অব্যাহত রেখে সেই অগতি কাটিয়েছে অনেকটাই। আমাদের এখানে যখন রাতের আঁধার নামে তখন আমেরিকায় সত্যিই ভোরের আলো ফোটে। বাংলা যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গ্রাস করছে, তখন ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশের অধীনতা পাস কেটে স্বাধীন হয়। ক্ষমতার পৃথক্করণ তত্ত্বের ওপর রচিত সংবিধান বলবৎ হয় ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে। যেখানে বিচার বিভাগ হয় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের সত্যিকারের একটি। ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে পঞ্চম সংশোধনীতে ‘Due Process Clause’ যুক্ত করে আইনের শাসন ও তার ওপর বিচার বিভাগীয় পরিবীক্ষণের নিশ্চয়তা আনা হয়। সেটা আরও সম্প্রসারিত হয় ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে চতুর্দশ সংশোধনীতে। ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে ষষ্ঠ সংশোধনীতে ‘Speedy Trial Clause’ যুক্ত থাকার পরেও ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ‘Speedy Trial Act’-এ ফৌজদারি মামলার বিচার-নিষ্পত্তির সময়সীমা বাঁধা হয় শক্ত করে। 

ব্রিটিশের প্রায় সব উপনিবেশই বিচারের অতিবিলম্ব কাটিয়ে উঠেছে নানা সংস্কার করে আর চাবিকাঠি লাগিয়ে। আমরাই শুধু সেই তিমিরেই নয়, ডুবে যাচ্ছি আরও অতলে। স্বাধীনতার পরে সংস্কার আমরাও কিছু কম করিনি। ঢাকায় একটি ‘গ্যাং কেস’ (দস্যু-ডাকাত দলভুক্ত হওয়ার দায়ে দণ্ডবিধির ৪০০-৪০১ ধারা)-এর শতখানেক আসামি ‘কমিটাল প্রসিডিউরে’ সাদ-আট বছর ধরে শুধু হাজত আর ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট করতে করতে ১৬ জুলাই ১৯৬৬ ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে লোহার জালঘেরা ডকের ভেতর বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে, সেখানে টিয়ার সেল মেরে সামলানো হয়েছিল। কতজনের কী হাল হয়েছিল আর সিআইডি কী কায়দায় একরারী (রাজসাক্ষী) হাজির না করে অত বছর ঘোরাচ্ছিল, সব আছে ‘কারাগারের রোজনামচা’য় (পৃষ্ঠা ১৬৪-১৬৫)। তখন দায়রার বিচার ছিল ম্যাজিস্ট্রেটের কমিটাল প্রসিডিউরের পরে দায়রায় জুরি কিংবা অ্যাসেসর সহযোগে। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে সামরিক ফরমানে ফৌজদারি কার্যবিধির ৮৬টি (২০৬-২২০ ও ২৬৬-৩৩৬) ধারা উপড়িয়ে সেই কমিটাল প্রসিডিউরে জুরি-অ্যাসেসর ট্রায়ালের নিকুচি হয়েছে। সেই সঙ্গে দেওয়ানির দ্বিতীয় আপিলও ঘুচেছে কার্যবিধির ৪টি (১০০-১০৩) ধারা উপড়িয়ে। বিচার-নিষ্পত্তির সময়সীমা ব্রিটিশ ছেড়ে গিয়েছিল বিচারকের সদ্বিবেচনা আর আইনজীবীর সদ্ব্যবহারের ওপরে। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে আরেক সামরিক ফরমানের পর থেকে এখন দেওয়ানি-ফৌজদারির প্রায় ধাপেই সময়সীমা বাঁধা। বিরোধভেদে দেওয়ানির আর অপরাধভেদে ফৌজদারির ভিন্ন ভিন্ন আদালত এখন। দ্রুত বিচার আদালত আর ট্রাইব্যুনাল ফৌজদারিতে। ‘সকলি গরল ভেল’ হয়েছে মতলবাজদের কলকাঠিতে (দেখুন ‘বিচার বিলম্বের কলকাঠি’, দেশ রূপান্তর, ১৭ নভেম্বর ২০২০)। এখন দশক ছাড়িয়ে যুগ পেরিয়ে যাওয়া মামলার সংখ্যা সংকোচবোধে প্রকাশও করা যায় না শুমারিতে, মালুম করতে হয় মানুষের গুমরানিতে।   

আদালত এবং মামলার ব্যবস্থাপনা, তদারকি, তত্ত্বাবধানের জন্য ব্রিটিশ ‘সিভিল রুলস অ্যান্ড অর্ডারস’, ‘ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড অর্ডারস’ দিয়ে গেছে। সেগুলো অকার্যকর প্রমাণ হয়েছে কি প্রয়োগে নাকি অকার্যকর হচ্ছে অপ্রয়োগ আর অপপ্রয়োগে! তাতে প্রত্যেক বিচারকের নিজ আদালত ইন্সপেকশনের, অধস্তন আদালতগুলো জেলা ও দায়রা জজের এবং হাইকোর্ট বিভাগের ইন্সপেকশনের বিধান আছে। ইন্সপেকশন ঠিকঠাক চলে! ইন্সপেকশন রিপোর্ট সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনে কেরানিদের বাইরে কর্তাব্যক্তিদের কারও পড়ার ফুরসত আছে! ব্যস্ত সবাই নৈমিত্তিক কাজের চাপে।

বার্ষিক রিপোর্ট ছাড়াও জেলার সব আদালত থেকে ত্রৈমাসিক, বার্ষিক স্টেটমেন্ট পাঠানো হয় সুপ্রিম কোর্টে। সেগুলোতে দেখাতে হয় বিচারাধীন মামলার কতগুলো কত মাসের, কত বছরের পুরনো এবং অতিবিলম্বের কারণ। ১০ বছরের বেশি পুরনো মামলার জন্য আলাদা দুটো স্টেটমেন্ট ফরমই আছে ‘(এস) ২০’ ও ‘(এস) ২১’। স্টেটমেন্ট পর্যালোচনায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের নেওয়া ব্যবস্থা দৃশ্যমান হয়েছে! তল্পিতল্পাসহ তলব পড়ে শুধু বিচারকের ১০-২০ বছরেও মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণ দর্শাতে। কারণ তো জানানোই থাকার কথা ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক স্টেটমেন্টে। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের নেওয়া ব্যবস্থাটা জ্ঞাতব্যও নহে! বার ও বেঞ্চ নাকি একই পাখির দুটি ডানা! আরেক ডানা মোটেও না নাড়িয়ে পুরো ভর শুধুই এক ডানায় লাগালে পাখি উড়বে কোন গতিতে! আরেক ডানার সারাইয়ের কারিগরি কি নেই কোনো কেতাবে! সেই ডানার জবাবটাও কি জানা জরুরি নয়! আদালত ও মামলার ব্যবস্থাপনা-তদারকি-তত্ত্বাবধান রয়ে যায় শুধু কেতাবে, কতিপয় আমাদের স্বভাবে।

বে-কেতাবি ব্যবস্থার হাল টের পেয়েছি হাড়-হাড়ে। চাকরির দ্বিতীয় কর্মস্থলে ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে হাইকোর্টে কৈফিয়ত দর্শাতে হয়েছিল ১০ দিনে কেন দোতরফায় কোনো মামলা নিষ্পত্তি করিনি! আগের কর্মস্থল থেকে বদলি হয়ে যোগ দিয়েছি ২০ নভেম্বর, ৩০ নভেম্বরের পর ডিসেম্বর সিভিল কোর্ট ভ্যাকেশন। ফাঁকের ১০ দিনে দেওয়ানির দোতরফা! জানা ব্যাপারই জানিয়ে পার পাই সে-যাত্রায়। আটকে গেলাম চাকরির শুরুতেই সেকালের মঙ্গা এলাকায় পড়ে। মামলারও মঙ্গা সেখানে (এখন নাকি সে মঙ্গা কেটেছে অনেকটাই)। প্রতি ত্রৈমাসিকে দো-তরফা নিষ্পত্তির অপর্যাপ্ততার কৈফিয়ত দর্শাতে দর্শাতে জেরবার। মামলা মোটে ২৮-৩০টি দেওয়ানি, ৭-৮টি পারিবারিক, ৮-১০টি মিস। মাত্র ৪-৫টি দেওয়ানি ১-২ বছরের পুরনো, বাকি সবই ৩-৬ মাস বয়সের। এহেন দুরবস্থায়ও মাসে দোতরফায় দু-চারটি দেওয়ানি, পারিবারিক, মিস মামলা, অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দরখাস্ত আর কিছু দেওয়ানির একতরফা নিষ্পত্তি, ১৫-২০ জন সাক্ষীর জেরা-জবানবন্দি নিই। মামলার সংখ্যা ও বয়স বিবেচনায় এবং ‘সিআরও’ ভলিউম ১-এর ৮১৫ বিধি ও হাইকোর্ট বিভাগের ২৮ নভেম্বর ১৯৮৮ তারিখের ১ নম্বর সার্কুলার মতে পর্যাপ্ত গণ্য করার নিবেদন জানাই। প্রথম সহকারী রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরিত চিঠিতে জানানো হলো ১৯৯২ ও ১৯৯৩ বছরের এসিআরে অপর্যাপ্ত ‘বিরূপ মন্তব্য কর্তনের জন্য অত্র কোর্টে যে আবেদন করিয়াছিলেন অত্র কোর্ট বিবেচনাকরতঃ উহা নামঞ্জুর (Rejected) করিয়াছেন।’ সেকালে পর্যাপ্ততার মান ছিল ৬-৮টি দেওয়ানির দোতরফা নিষ্পত্তি। একটাও কম হলে চলবে না কেরানির হিসাবে। আপসের তো নয়ই, পারিবারিক বা আর কিছুর দাম পাওয়া যেত না মোটে। (একালে পারিবারিকের দাম তো মেলেই, আপসের দাম তিন গুণ!) মামলার মঙ্গায় মাসে ৬-৮টি দেওয়ানির দোতরফা কেমনে সম্ভব বুঝে কুল পাননি মঙ্গা এলাকার উপজেলা সহকারী জজরা, কর্র্তৃপক্ষকে আর কী বোঝাবেন! অনেকের বিরূপ অবস্থা গেছে পদোন্নতিতেও। কোনোমতে বেঁচে গেছি আরেক এলাকায় বদলি হওয়ায়।

(‘নাতিবিলম্ব বিচারের চাবিকাঠি : উদ্ধারপর্ব’ আগামী কিস্তিতে)

লেখক প্রবন্ধকার ও আইন গ্রন্থকার; অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত