ফিরে দেখা ২০২০

করোনাকালে ভার্চুয়াল আদালতের পথযাত্রা

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২০, ০৫:৫২ এএম

বছরজুড়ে নানা ঘটনায় আলোচনায় ছিল আইন ও বিচারাঙ্গন। মার্চের শুরুর দিকে করোনাভাইরাসজনিত সৃষ্ট রোগ কভিড- ১৯-এর সংক্রমণ শুরু হওয়ার আগে উচ্চ ও বিচারিক আদালতসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম চলছিল স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু কভিড সংক্রমণের পর আদলতের কর্মসূচি এলোমেলো হয়ে যায়। একপর্যায়ে বিচার প্রার্থীদের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভার্চুয়াল আদালতের বিধান চালু হয়। এছাড়া আন্দোলনের মুখে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদ- করাসহ আরও কিছু বিষয় আলোচনায় ছিল বছরজুড়ে। উচ্চ আদালতে জামিন পেতে জালিয়াতচক্রের অপতৎপরতাও ছিল উল্লেখ করার মতো।

ভার্চুয়াল আদালতে বিচার বিভাগের নতুন যাত্রা : করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে গেল মার্চের শেষ সপ্তাহে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও আদালতে ছুটি ঘোষণা করে সরকার। মহামারীর মধ্যে ভিডিও কনফারেন্সসহ অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে সীমিত পরিসরে মামলার শুনানির উদ্যোগ নেয় সুপ্রিম কোর্ট। গত ৭ মে ‘আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ ২০২০’ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন লাভের পর ৯ মে এ সম্পর্কিত অধ্যাদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। ১১ মে থেকে ভার্চুয়ালি পদ্ধতিতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী উচ্চ ও বিচারিক আদালতে সীমিত পরিসরে হাজতি আসামিদের জামিন শুনানি শুরু হয়। উচ্চ আদালতে বেশকিছু বেঞ্চে সীমিত আকারে মামলার শুনানি ও আদেশ হয়। তবে ভার্চুয়াল আদালতের বিষয়ে আইনজীবীদের বড় একটা অংশের ধারণা না থাকা, প্রযুক্তিগত সমস্যাসহ নানা কারণে আইনজীবীদের অনেকেই নিয়মিত আদালতের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এরপর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের বিভিন্ন সময়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ভার্চুয়াল আদালতে চেক ডিজঅনার মামলার আবেদন, ফৌজদারি মামলায় আসামির রিমান্ড শুনানির আবেদন, দেওয়ানি মামলার আবেদন ও আপিল গ্রহণ শুরু হয়। সাড়ে তিন মাস আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ জুলাই নিয়মিত বিচার কার্যক্রম শুরু হয় উচ্চ ও বিচারিক আদালতে। দুর্যোগকালীন ভিডিও কনফারেন্সসহ অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার বিধান রেখে ‘আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার বিল-২০২০’ গত ৭ জুলাই জাতীয় সংসদে পাস হয়।

উচ্চ আদালতে বেপরোয়া জামিন জালিয়াতচক্র : তথ্য গোপনসহ বিচারিক আদালতের রায় ও আদেশের নথি, মামলার এজাহার, অভিযোগপত্রের তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে সৃজন করে চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে উচ্চ আদালত থেকে জামিনের আবেদনের বেশকিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা ধরা পড়ে। এসব ঘটনায় মামলা ও কতিপয় আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত অন্তত ১০টি জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ঝিনাইদহের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের মামলার রায়ের সার্টিফায়েড কপি (রায়ের অনুলিপি) জাল করে ধর্ষণ মামলায় আসামির যাবজ্জীবন কারাদ-কে সাত বছর, একজন আসামির জায়গায় চারজন ও আসামিকে ৬৫ বছরের বৃদ্ধ দেখিয়ে হাইকোর্টে জামিন নেওয়ার চেষ্টা, অস্ত্র মামলায় এজাহার থেকে শুরু করে বিচারিক আদালতের রায়সহ মামলার সব নথি জাল ও সৃজন করে একজন আসামির জায়গায় দুজন আসামি, মূল আসামির পরিবর্তে অস্তিত্বহীন আসামি এবং ওয়ান শুটারগানকে চায়নিজ কুড়াল দেখানোর মতো ভয়াবহ জালিয়াতির দুটি ঘটনা ধরা পড়ে।

মানবাধিকার রক্ষায় মধ্যরাতে হাইকোর্ট : সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল প্রয়াত কেএস নবীর দুই নাতিকে তাদের বাবা সিরাতুন নবীর বাড়িতে ঢুকতে না দেওয়ার বিষয়ে ৩ অক্টোবর রাতে একটি টেলিভিশন টকশোতে আলোচনা চলছিল। বিষয়টি নজরে আসে হাইকোর্টের। রাত ১২টার দিকে হাইকোর্ট ওই দুই শিশুকে তাদের পৈতৃক বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার আদেশসহ তাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আদেশ দেয়। গত ৮ অক্টোবর (শনিবার) রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত একটি প্রতিবেদন নজরে এলে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার চার শিশুর জামিন আবেদন নিষ্পত্তি করে তাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিতে নির্দেশ দেয় এই আদালত। হাইকোর্টের আদেশের পর রাতেই চার শিশুকে বাড়ি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে যশোর জেলা প্রশাসন।

ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ড : ধর্ষণে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের দাবির মধ্যে চলতি বছর শেষদিকে এ সংক্রান্ত আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। গত ১৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০০০’ জারি করেন। পরে ৮ নভেম্বর নিয়ম অনুযায়ী অধ্যাদেশটি সংসদে তোলেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক। একইদিন সেটি বিল আকারে সংসদে পাস হয়। ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) উপধারায় বলা ছিল, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হবেন। বিলে মূল আইনের খসড়ায় ৯(১) উপধারায় ‘যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়।

করোনায় গতিহীন ট্রাইব্যুনাল : এদিকে করোনার প্রভাব পড়ে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। সরকার নির্ধারিত ছুটি শেষ হলেও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গতি আসেনি প্রায় বছরজুড়ে। ট্রাইব্যুনালে যেখানে বছরে অন্তত চারটি রায় হতো সেখানে এক বছর ধরে কোনো রায় হয়নি। মামলার সবশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের (আর্গুমেন্ট) শুনানিও হয় না বছর ধরে। বিভিন্ন সময়ে ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে আসামিপক্ষের ২৯টি আপিল।

প্রসিকিউটররা জানান, গত ৮ আগস্ট সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু হলেও শুধু জামিন শুনানিসহ বিচারাধীন মামলাগুলোর সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্কসহ অন্যান্য আইনি বিষয়ের জন্য নতুন করে শুনানির তারিখ নির্ধারণ হয়। গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ার কথা জানানো হলেও সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য, জব্দ তালিকা শনাক্তকরণ ব্যক্তির সাক্ষ্য এবং আসামিদের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সংক্রান্ত আবেদন ও আদেশ এবং জামিন শুনানি হচ্ছে ট্রাইব্যুনালে। ট্রাইব্যুনালের এক বিচারক দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ট্রাইব্যুনালের বেশ কয়েকজন প্রসিকিউটর ও নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশের অন্তত ২৫ জন সদস্য করোনায় আক্রান্ত হওয়া, সাক্ষীদের ঢাকায় এনে সাক্ষ্য নেওয়ার মতো পরিস্থিতি না থাকার পরিপ্রেক্ষিতে বিচারকাজ ধীরগতিতে হচ্ছে বলে জানান প্রসিকিউটররা।

সাহেদ, পাপিয়ারা দোষীসাব্যস্ত : অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় নরসিংদী যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ ও তার স্বামী মফিজুর রহমান চৌধুরী ওরফে সুমনকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনের দুটি ধারায় গত ১২ অক্টোবর ২০ বছর করে কারাদন্ড দেয় ঢাকার একটি আদালত। অস্ত্র আইনের ১৯ এর ‘এ’ ধারায় পাপিয়া ও সুমনকে ২০ বছর সশ্রম কারাদ- এবং ১৯ এর ‘এফ’ ধারায় অবৈধভাবে গুলি রাখার দায়ে দুজনকে আরও ৭ বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়। দুই ধারায় দুজনের ২৭ বছর কারাদন্ড হলেও রায় অনুযায়ী দুটি ধারার সাজা একসঙ্গে কার্যকর হবে বলে দুজনকে ২০ বছর সাজা খাটতে হবে। পাপিয়াদের ‘তথাকথিত ও বিপজ্জনক’ রাজনীতিক হিসেবে আখ্যায়িত করে আদালত। করোনা পরীক্ষার সনদ জালসহ বহুমাত্রিক জালিয়াতিতে আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমকে গত ২৭ সেপ্টেম্বর অস্ত্র আইনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয় ঢাকা মহানগর ১ নম্বর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় স্মরণকালের সবচেয়ে দ্রুত সময়ে রায় হয়।

প্রধান সাক্ষী থেকে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি মিন্নি : ২০১৯ সালের ২৬ জুন দুপুরে বরগুনা জেলা শহরের কলেজ রোডে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাত শরীফকে। এ সময় রিফাতকে রক্ষা করতে স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির প্রাণান্তকর চেষ্টার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। লোমহর্ষক এ ঘটনায় করা মামলায় ১ নম্বর সাক্ষী করা হয় মিন্নিকে। কিন্তু পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে এ ঘটনায় মিন্নি নিজেও জড়িত। মিন্নিসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে গত ৩০ সেপ্টেম্বর রিফাত হত্যা মামলায় মিন্নিসহ প্রাপ্তবয়স্ক ছয় আসামিকে দন্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদন্ডের রায় দেন বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ মো. আছাদুজ্জামান। বিচারিক আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেন মিন্নি। দন্ড থেকে খালাস চেয়ে করা আপিলটি গত ৪ নভেম্বর শুনানির জন্য গ্রহণ করে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ।

নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনে ঐতিহাসিক রায় : ২০১৩ সালের নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে প্রথম রায় হয় চলতি বছর ৯ সেপ্টেম্বর। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিরপুরের পল্লবীতে জনি হত্যা মামলায় তিন পুলিশ সদস্যকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড দেয় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত। দন্ডপ্রাপ্তরা হলেন বরখাস্ত উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদুর রহমান খান, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রাশেদুল ইসলাম ও কামরুজ্জামান মিন্টু। এছাড়া পুলিশের দুই সোর্স রাশেদ ও সুমনকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদন্ড ও ২০ হাজার টাকা অর্থদন্ড দেয় আদালত। কারাদন্ডের পাশাপাশি দন্ডপ্রাপ্ত তিনজনকে ১ লাখ টাকা করে অর্থদন্ড দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক এ রায়কে স্বাগত জানান মানবাধিকারকর্মীরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত