বর্তমানে নীতিমালা দিয়ে হজ ও ওমরাহ পরিচালনা করা হচ্ছে। ২০০৭ সালের এ নীতিমালায় হজ সংক্রান্ত অপরাধ করলে জরিমানা ও এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করার বিধান রয়েছে। ঠিক কত টাকা জরিমানা করা হবে বিধিমালায় তার কোনো পরিমাণ উল্লেখ নেই। এ সুযোগে ১ কোটি টাকার বেশিও জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু গত সোমবার মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ‘হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২০’-এ সর্বোচ্চ জরিমানা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। এছাড়া এজেন্সির মালিকানা বদলেরও বিধান রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশে এখনো নীতিমালার মাধ্যমে হজ ব্যবস্থাপনার কাজ চলে। অনেক সময়ই হজ পালন করতে সৌদি আরবে গিয়ে নানা অব্যবস্থাপনা ও ভোগান্তির শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করেন অনেক হাজি। এসবের মধ্যে খাওয়ার অসুবিধা, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আবাসনের ব্যবস্থা না করা এবং যাতায়াতসহ সবকিছুর ব্যবস্থা করার দায়িত্ব যাদের ওপর, তাদের অসহযোগিতাসহ নানা ধরনের অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠে থাকে। ভিন্ন অব্যবস্থাপনার অভিযোগে ২০১৯ সালে হজের পর কয়েক দফায় প্রায় ১০০ হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) সভাপতি শাহাদাত হোসেন তসলিম গত মঙ্গলবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ধর্ম মন্ত্রণালয় যে খসড়া করেছিল সেখানে হজ এজেন্সির জরিমানা আরও অনেক বেশি প্রস্তাব করেছিল। খসড়ায় প্রস্তাব ছিল হজ সংক্রান্ত অপরাধের জন্য ১ কোটি এবং ওমরাহ সংক্রান্ত অপরাধের জন্য ৫০ লাখ টাকা জরিমানার। আমরা ধর্ম মন্ত্রণালয়কে বুঝিয়ে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে হজ সংক্রান্ত অপরাধের জন্য ৫০ লাখ এবং ওমরাহ সংক্রান্ত অপরাধের জন্য ১৫ লাখ টাকা করার অনুরোধ করেছি। হজ একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিষয়। হজের সময় হাজিরা পাঁচ দিন সৌদি সরকারের অধীনে থাকেন। এ সময়ের খাবার, বাসস্থান ও যাতায়াতের সবকিছুই সৌদি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এ কারণে জরিমানার বিধান থাকলেও সবকিছু বিবেচনায় না নিয়ে এর প্রয়োগ করা ঠিক হবে না। গণহারে জরিমানা করা হলে হজ এজেন্সি এবং হজ ব্যবস্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বেসরকারি হাজিদের তুলনায় সরকারি হাজিদের অনেক বেশি অভিযোগ থাকে। বেসরকারি হাজিদের অভিযোগ নেওয়ার জন্য সেল করা হয়। কিন্তু সরকারি হাজিদের অভিযোগ নেওয়ার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে।’
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০১৭ সালে হজযাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণার জন্য মাওনা হজ এজেন্সিকে ১ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে জামানত ও হজ লাইসেন্স বাতিল করা হয়। সরকারের কাছে এই এজেন্সির জামানত ছিল ২০ লাখ টাকা। কয়েকটি হজ এজেন্সির মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, নীতিমালায় জরিমানার অঙ্ক উল্লেখ না থাকায় খেয়াল-খুশিমতো জরিমানা করা হতো। অনেক সময় আদালতে সেসব জরিমানা টিকত না। জরিমানার টাকা সুনির্দিষ্ট হওয়ায় তাদের জন্য সুবিধাজনক বলে তারা জানিয়েছেন।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইনের বিভিন্ন ধারা ভঙ্গের জন্য সরাসরি এজেন্সিকে জরিমানা করা হবে না। এজেন্সিকে প্রথম দফায় সতর্ক করা হবে। একপর্যায়ে তাদের তিরস্কার করা হবে। বিভিন্ন মেয়াদে লাইসেন্স ও জামানতের অংশবিশেষ স্থগিত করার পর তাদের লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মু. আ. হামিদ জমাদ্দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইনের খসড়াটি সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডারদের মতামত নিয়েই করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে খসড়াটি সংসদে যাবে।’
মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, আইনের খসড়া অনুযায়ী হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সরকারের ওপর ন্যস্ত থাকবে। আইনটি পাস হলে হজ ও ওমরাহ এজেন্সি সৌদি আরবে গিয়ে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা বা দুর্নীতি করলে, সেই অপরাধ বাংলাদেশে হয়েছে গণ্য করে অভিযুক্ত এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ আইনের অধীনে নিবন্ধন ছাড়া কেউ কোনো হাজি বা হজের কোনো লোকজনকে হ্যান্ডেল করতে পারবে না। অনিয়মের জন্য হজ এজেন্সির নিবন্ধন বাতিল করা যাবে এবং সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। ওমরাহ এজেন্সির ক্ষেত্রে নিবন্ধন বাতিল ও ১৫ লাখ টাকা জরিমানা করা যাবে। ক্রিমিনাল অফেন্স করলে পেনাল কোড বা অন্যান্য আইনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
২০১১ সালে সৌদি আরব হজ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনে, যার পরিপ্রেক্ষিতে সে সময় পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১২ সালে মন্ত্রিসভা বৈঠকে হজ ব্যবস্থাপনায় নীতিমালার পরিবর্তে একটি আইন তৈরির নির্দেশনা দেন। এরপর ২০১৩-১৪ সালের দিকে সরকার এ আইন করার উদ্যোগ নিলেও হজ এজেন্সি মালিকদের সঙ্গে মতভিন্নতার কারণে সেটা আর অগ্রসর হয়নি।
একটি এজেন্সির মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একজন হাজির কাছ থেকে এজেন্সি মালিক নেবেন সাড়ে ৩ লাখ টাকা, কিন্তু তার অভিযোগের ওপর জরিমানা হবে ৫০ লাখ টাকা, আবার ফৌজদারি আইনেও বিচার হবে। বিষয়টি একটু বেশি কড়াকড়ি হয়ে যাচ্ছে। তারপরও এ ধরনের একটি আইন দরকার ছিল। এতদিন নীতিমালা দিয়ে হজ ও ওমরাহ পরিচালনা করা হতো। আইন করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও ১০ বছর পার হয়েছে আইনবিহীনভাবে। আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়েছে। আইনটি খুব প্রয়োজনীয়। কারণ আইনের পরিপূরক নীতিমালা নয়। নীতিমালা দিয়ে আইন কাভার করা যায় না। নীতিমালা দিয়ে হজ ও ওমরাহ পরিচালনার জন্য অনেক সিদ্ধান্তই ঝুলে রয়েছে। একটা আইন হলে যেকোনো সময় পরিবর্তন আনা যায়। নীতিমালার আলোকেই আইনটির খসড়া করা হয়েছে। নীতিমালায় হজ এজেন্সির মালিকানা বদলের কোনো সুযোগ ছিল না। বর্তমানে মালিকানা বদলের সুযোগ রাখা হয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী হজে যেতে আগ্রহীদের অনলাইনে প্রাক নিবন্ধন করতে হয়। এ নিবন্ধন সারা বছরই চলে। হজ পালনের কয়েক মাস আগে সরকারের তরফ থেকে চূড়ান্ত নিবন্ধনের আহ্বান জানানো হয়। সে ক্ষেত্রে যারা আগে প্রাক নিবন্ধন করেন, তালিকায় ক্রমানুসারে তারাই চূড়ান্ত নিবন্ধন করতে পারেন। চূড়ান্ত নিবন্ধনের জন্য সরকার সময় নির্ধারণ করে দেয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেউ যদি নিবন্ধন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তালিকা থেকে ক্রমানুসারে অন্যদের সুযোগ দেওয়া। বাংলাদেশ থেকে কেউ হজে যেতে চাইলে তাকে প্রায় দুই বছর আগে থেকে প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়। বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বৃদ্ধি পাওয়ায় হজে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
