বিদায় ২০২০: নিউ নরমাল ফুটবলে ভিন্ন স্বাদ

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৭:১৯ পিএম

প্রবাদ আছে ‘শেষ ভালো যার সব ভালো তার’। ২০১৯-এর ডিসেম্বরে মানুষের শরীরে যখন করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব প্রথম ধরা পড়ে, কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি এই ভাইরাসের কারণে পরবর্তী বছরে কতটা ক্ষতি হতে যাচ্ছে বিশ্বব্যাপী। ক্রীড়াঙ্গনে ব্যস্ত সূচিতে ঠাসা ছিল ২০২০ সাল। কিন্তু মহামারীর কারণে স্থগিত, পেছানো, এমনকি বাতিল হয়ে যায় অনেক ফুটবল টুর্নামেন্ট। মার্চে থমকে যাওয়া ফুটবল দীর্ঘ বিরতি শেষে মে-জুনে আবারও মাঠে ফেরে। তড়িঘড়ি করে শেষ করা হয় ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর মৌসুম। সেইসব ঘটনা নিয়েই আজকের লেখায় আন্তর্জাতিক ফুটবলের ফিরে দেখা ২০২০।

ইউরো ও কোপার সূচি বদল

১১ মার্চ করোনাভাইরাসকে মহামারী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ইউরো ও পরে কোপা আমেরিকা স্থগিতের ঘোষণা আসে। দুটি টুর্নামেন্টই পিছিয়ে যায় এক বছর। দুটি টুর্নামেন্টই শুরু হবে ২০২১-এর ১১ জুন থেকে।

৫ বদলি

৯ মার্চের পর স্থগিত হতে থাকে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগ। তবে করোনার প্রকোপ কিছুটা কমে এলে ফের মাঠে ফিরে শীর্ষ পাঁচ লিগের চারটি। শুধু ফরাসি লিগ মৌসুম শেষ করে দিয়ে স্থগিত থাকার সময় শীর্ষে থাকা পিএসজিকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয় এপ্রিলের শেষে। ইউরোপের লিগগুলো ফের মাঠে ফেরার আগেই ফিফা নিয়ম করে করোনাকালে তিনজনের জায়গায় বদলি হিসেবে নামতে পারবেন পাঁচজন খেলোয়াড়। আর লিগে এই নিয়মের প্রয়োগ ছেড়ে দেন আয়োজকদের ওপর। অল্প সময়ে বেশি ম্যাচ থাকায়, খেলোয়াড়দের ইনজুরি প্রবণতা কমাতে এই পদক্ষেপ নেয় ফিফা, যা পরবর্তীতে গ্রহণ করা হয় আন্তর্জাতিক ফুটবল, ইউরোপের শীর্ষ চার লিগসহ (ইপিএল বাদে) উয়েফা টুর্নামেন্টে ও বিশ্ব ফুটবলে। 

করোনা টেস্ট, আইসোলেশন, নানা নিয়ম

ফুটবল ম্যাচ শুরুর ২৪ ঘণ্টা আগে ও অনুশীলনের আগেও খেলোয়াড়দের করোনা টেস্টের নিয়ম চালু হয়। কেউ করোনা আক্রান্ত হলে তাকে রাখা হয় আইসোলেশনে। উয়েফা নিয়ম করে স্কোয়াডের ১৩ জন খেলোয়াড় সুস্থ থাকলেই খেলতে হবে ম্যাচ। গোল উদযাপনে সতীর্থকে জড়িয়ে ধরা, হাত মেলানো থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের জার্সি বদলে ছিল নিষেধাজ্ঞা। খেলোয়াড়দের সাইডলাইনে বসতে হয় মাস্ক পরে। পরবর্তীতে আস্তে আস্তে কিছু নিয়ম শিথিল হয়।

বুন্দেসলিগা দিয়ে শুরু, বায়ার্নের টানা অষ্টম শিরোপা

ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের মধ্যে সবার আগে মাঠে খেলা ফেরায় বুন্দেসলিগা। দীর্ঘ দুই মাস পাঁচ দিন স্থগিত থাকার পর ১৬ মে মাঠে গড়ায় স্থগিত থাকা ২০১৯-২০ মৌসুম। দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে হয় খেলা। ছন্দ ধরে রেখে দুই ম্যাচ বাকি থাকতে বুন্দেসলিগায় টানা অষ্টমবার শিরোপা জয়ের উৎসব করে বায়ার্ন মিউনিখ।

রিয়ালের শিরোপা পুনরুদ্ধার

দর্শক ছাড়া ফুটবল খেলা হলেও দীর্ঘ বিরতি দলের ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তা বোধহয় সবচেয়ে বেশি টের পেয়েছে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা। মার্চে করোনার কারণে লিগ স্থগিতের আগে তারা ছিল শীর্ষে। তখনো লিগের ১১ ম্যাচ বাকি ছিল। ১১ জুন মাঠে ফেরে লিগ। ছন্দ হারায় বার্সা। আর গতি পায় রিয়াল মাদ্রিদের খেলায়। বাকি ১১ ম্যাচের দশটিতে জিতে শেষ পর্যন্ত ৫ পয়েন্টে এগিয়ে থেকে তিন বছর পর আবারও লিগ শিরোপা জেতে জিনেদিন জিদানের রিয়াল মাদ্রিদ।

লিভারপুলের ৩০ বছরের অপেক্ষার অবসান

ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগ শিরোপাটা বহু বছর ধরে অধরা ছিল লিভারপুলের। ১৯৯০ সালের পর গেল মৌসুমে শিরোপা জেতে তারা। সময়ের হিসাবে ৩০ বছর। অর্থাৎ ১৯৯২ সালে ইপিএল নামকরণের পর অলরেডদের প্রথম শিরোপা। করোনার কারণে বিরতিতে যাওয়ার আগে অন্যদের তুলনায় পয়েন্টের ব্যবধানে বেশ এগিয়ে ছিল লিভারপুল। ১৭ জুন খেলা ফের মাঠে গড়ালে ৩১তম রাউন্ড শেষেই নিশ্চিত হয়ে যায় অলরেডদের ১৯তম লিগ শিরোপা।

জুভেন্তাসের টানা নবম

ইতালিয়ান লিগ মাঠে ফেরার পর শিরোপা লড়াইয়ের মূল আকর্ষণ ছিল জুভেন্তাস ও লাৎসিওকে ঘিরে। ২৬তম রাউন্ডের পর করোনার কারণে স্থগিতের আগে দু’দলের পয়েন্টের ব্যবধান ছিল ১। ২০ জুন আবার লিগ শুরু হলে কিছুটা ছন্নছাড়া পারফরম্যান্স ছিল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জুভেন্তাসের। তবে দুই ম্যাচ বাকি থাকতে টানা নবমবারের মতো লিগ শিরোপা ধরে রাখা নিশ্চিত করে তুরিনের দলটি। তবে বিরতির পর লিগে চার হার ও দুই ড্রতে চাকরি হারান মরিসিও সারি। জুভেন্তাসের নতুন কোচ হন আন্দ্রেয়া পিরলো। 

ভিন্ন ফরম্যাটে চ্যাম্পিয়নস লিগ, বায়ার্ন ৮-২ বার্সা

প্রি-কোয়ার্টারের চারটি ম্যাচ বাকি থাকতে স্থগিত হয়ে গিয়েছিল চ্যাম্পিয়নস লিগের খেলাও। আগস্টে ভিন্ন ফরম্যাটে ফেরে চ্যাম্পিয়নস লিগ। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জৈব-সুরক্ষা বলয়ে এক লেগের কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল নিয়ে টুর্নামেন্টটির শেষ অংশের প্রতীকী নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মিনি টুর্নামেন্ট’। বিশ্বকাপ আবহের টুর্নামেন্টে কোয়ার্টারের লড়াইয়ে ফুটবলবিশ্ব সাক্ষী হয় এমন এক ম্যাচের যা হয়তো কেউ কল্পনা করেনি আগে। ১৪ আগস্ট বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে ৮-২ গোলে বিধ্বস্ত হয় বার্সেলোনা। জুভেন্তাসও বাদ পড়েছিল আগেই প্রি-কোয়ার্টারে। ফলে ২০০৪-০৫ মৌসুমের পর প্রথম ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসিহীন সেমিফাইনাল দেখতে হয় চ্যাম্পিয়নস লিগে। পরে প্রথমবার ফাইনালে ওঠা পিএসজিকে হারিয়ে শিরোপা জেতে জার্মান চ্যাম্পিয়ন বায়ার্ন মিউনিখ।

মেসির বুরোফ্যাক্স, দলবদলের সম্ভাবনা

চ্যাম্পিয়নস লিগে ভরাডুবির কয়েক দিন পরই ফুটবলবিশ্ব চমকে ওঠে আরেক খবরে। ব্রেকিং নিউজ হয়- ২০০৪ সাল থেকে খেলে আসা বার্সেলোনা ছাড়তে ক্লাবকে বুরোফ্যাক্স পাঠিয়েছেন লিওনেল মেসি। কিন্তু ৭০০ মিলিয়ন ইউরো রিলিজ ক্লজের বিষয়ে বেঁকে বসে বার্সা। মেসিকে ধরে রাখতে রাস্তায় নামেন বার্সা সমর্থকরা। তারা পদত্যাগ দাবি করেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউর। মূলত জুনে মৌসুম শেষ হলেও করোনার কারণে বার্সার ২০১৯-২০ মৌসুম শেষ হয়েছিল চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বাদ পড়ার মধ্য দিয়ে। ১০ দিনের টানাপড়েনের পর মেসি থেকে যান বার্সেলোনাতে। কিছুদিন পর বার্তোমেউ পদত্যাগ করেন। তবে নতুন চুক্তিতে এখনো সই করেননি মেসি। নতুন চুক্তিতে সই না করলে চলতি মৌসুমই হবে বার্সায় মেসির শেষ।

হয়নি ব্যালন ডি’অর, ফিফার সেরা লেভানডোস্কি

করোনাভাইরাসের কারণে ২০২০ সালে দেওয়া হয়নি ব্যালন ডি’অর পুরস্কার। ৬৪ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম ঘটে এমন ঘটনা। কিন্তু ফিফার দ্য বেস্ট ঘোষণা করা হয় চলতি মাসেই। তাতে দ্য বেস্ট হন বায়ার্ন মিউনিখের পেন্টা জয়ের নায়ক পোলিশ স্ট্রাইকার রবার্ট লেভানডোস্কি। ২০১৯-২০ মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলে ৪৭ ম্যাচে ৫৫ গোল করেন তিনি।

মেসির পেলেকে ছাড়িয়ে যাওয়া

এ বছরই নির্দিষ্ট ক্লাবের হয়ে সবচেয়ে বেশি গোলের মালিক হয়েছেন মেসি। সান্তোসের হয়ে ফুটবল সম্রাট পেলের ৬৪৩ গোলকে ছাড়িয়ে গেছেন ২০০৪ সাল থেকে বার্সেলোনার হয়ে ৬৪৪ গোল করা এই আর্জেন্টাইন। গেল মৌসুমের জন্য পিচিচি ট্রফি জেতেন তিনি। পেয়েছেন পিস অ্যাওয়ার্ড।

মেসি-রোনালদো মুখোমুখি

২০১৮ সালে রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে জুভেন্তাসে যান ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ফলে চ্যাম্পিয়নস লিগের মঞ্চ ছাড়া বা আন্তর্জাতিক পর্যায় ছাড়া সময়ের সেরা দুই খেলোয়াড়ের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ ছিল না। ২০২০-২১ চ্যাম্পিয়নস লিগে একই গ্রুপে পড়ায় অন্তত দু’বার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হয়েছিল মেসি ও রোনালদোর। কিন্তু তুরিনে প্রথম লেগের সময় রোনালদো করোনা আক্রান্ত থাকায় সেটি হয়নি। পরে ন্যু ক্যাম্পে দেখা হয় তাদের। সেখানে দুই গোল করায় আপাতত রোনালদোকে এগিয়ে রাখতেই পারেন ভক্তরা।

পরিশেষে

ব্রিটিশ দার্শনিক স্যার বার্নার্ড উইলিয়ামসন বলেছেন, ‘এমন কোনো রাত বা সমস্যা নেই যা সূর্যোদয় বা আশাকে পরাজিত করতে পারে।’ সেটি ধরে কিংবা লেখার শুরুর প্রবাদ ধরেই বলতে হয়- যেহেতু গেল মৌসুমের স্থগিত থাকা খেলাগুলো ফের চালু হয়ে শেষ হয়েছে, মাঠে দর্শক ফেরা শুরু হয়েছে, তাই আশা করাই যায় নতুন বছরে বিশ্ব ফুটবল আবারো ফিরবে তার পুরনো রূপে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত