ডেরেক শওভিন নামে এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মী হাঁটু দিয়ে জর্জ ফ্লয়েডের গলা চেপে বসে আছেন- এই ছবিটা ছড়িয়ে পড়তেই প্রতিবাদের আগুন জ্বলে উঠেছিল গোটা আমেরিকায়। বর্ণবিদ্বেষবিরোধী সেই প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল সবখানে। রাস্তা থেকে খেলার মাঠ- কিছুই বাদ পড়েনি।
জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর (২৫ মে ২০২০) সপ্তাহখানেক পরে মিনিয়াপোলিসের সিটি হলে একটা স্মরণসভার আয়োজন করা হয়, যেখানে এসেছিল তার ছয় বছরের মেয়ে জিয়ানা। কেউ একজন তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার বাবা কী করেছিল, তুমি জানো?’ জিয়ানা উত্তরে বলে, ‘আমার বাবা তো দুনিয়াই বদলে দিল!’
সত্যিকার অর্থেই নিজের জীবন দিয়ে দুনিয়া বদলে দিয়েছেন ফ্লয়েড। ৪৬ বছরের এই কৃষ্ণাঙ্গের মৃত্যুতে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের নগ্ন রূপ পৃথিবীর সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ে। বর্ণবাদবিরোধী প্রতিবাদে শামিল হন সবাই। নৃশংস হত্যাকা-ের প্রতিবাদ জানাতে এগিয়ে আসেন ক্রিকেট-ফুটবল-টেনিস-বাস্কেটবল তারকাসহ খেলাধুলা অঙ্গনের সব মানুষ। আর তাতেই বছরের আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ নামের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন।
তখনো কভিডের আক্রমণে খেলাধুলা পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়নি। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ চলছিল। সেখানেই লিভারপুল প্রথম অভিনব কায়দায় প্রতিবাদ জানায়। এরপর মাঠে ‘এইচ’ অক্ষরের আকারে হাঁটু মুড়ে বর্ণবাদবিরোধী প্রতিবাদে শামিল হন চেলসি ফুটবলাররা। ‘এইচ’ মানে ‘হিউম্যান’। তাদের অনুসরণ করে নিউক্যাসলও ট্রেনিংয়ের সময় হাঁটু মুড়ে বসে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। তারপর হ্যাশট্যাগ চালু হয়, ‘আমরা সবাই এক’ (ইউনাইটেড অ্যাজ ওয়ান)। এই প্রতিবাদ কেবল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগেই সীমাবদ্ধ ছিল না। জার্মানির বুন্দেসলিগাও প্রতিবাদে শামিল হয়। ফিফা জানিয়ে দেয় ফ্লয়েড নিয়ে প্রতিবাদ জানানো ফুটবলারকে কোনো শাস্তি যেন না-দেওয়া হয়।
সেই সময় আলাদাভাবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দুই ফুটবলার পল পগবা এবং মার্কাস রাশফোর্ড তীব্র প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন। রাশফোর্ড বলেন, ‘আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না, এসব কী হচ্ছে? যখন সবাই এক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি, তখন মনে হচ্ছে আমরা সবচেয়ে বেশি বিভক্ত। মানুষ উত্তর চায়। কৃষ্ণাঙ্গদের জীবনেরও মূল্য আছে। কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতির মূল্য আছে।’ পগবা ইন্সটাগ্রামে লিখেন, ‘গত কয়েক দিন ধরে এই ঘটনাটা নিয়ে অনেক ভেবেছি। আমার রাগ হচ্ছে, দুঃখ হচ্ছে, করুণা হচ্ছে। জর্জের জন্য দুঃখ হচ্ছে। সব কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের জন্য দুঃখ হচ্ছে, যারা প্রতিনিয়ত বর্ণবৈষম্যের শিকার হন। তা সে ফুটবলে হোক কী কাজে, কী স্কুলে! বর্ণবৈষম্য বন্ধ হতেই হবে।’ ফ্লয়েডের মৃত্যুর সপ্তাহ দুয়েক পর ইংল্যান্ড তারকা জ্যাডন স্যাঞ্চো বুন্দেসলিগায় বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে গোল করে জার্সি খুলে ভেতরে পরা গেঞ্জি দেখান। তাতে লেখা ছিল ‘জর্জ ফ্লয়েড হত্যার বিচার চাই’।
জর্জ ফ্লয়েড হত্যার পর তৈরি হওয়া ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটারস’ আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন গলফ কিংবদন্তি টাইগার উডসও। তিনি বলেন, ‘পুলিশের প্রতি শ্রদ্ধা আছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেই সীমানা তারা লঙ্ঘন করেছে।’ বক্সিং কিংবদন্তি ফ্লয়েড মেওয়েদার জুনিয়র প্রতিবাদে শামিল হয়ে ঘোষণা করেন জর্জের শেষকৃত্যের সব খরচ বহন করবেন।
ক্রিকেটে প্রতিবাদ
১১৭ দিনের বিরতির পর কভিড মহামারীর আতঙ্ক সঙ্গী করেই জুলাইয়ে মাঠে ফেরে টেস্ট ক্রিকেট। সঙ্গে সঙ্গে ফেরে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’-এর সমর্থন। ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদ জানান ইংল্যান্ড ও উইন্ডিজের ক্রিকেটাররা। খেলা শুরুর আগে মিলিতভাবে হাঁটু মুড়ে বসে তারা ছবিও তুলছিল, যেমনটা করেছিল ফুটবলাররা কয়েক মাস আগে।
তখন স্কাই নিউজে একটা সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন ক্যারিবীয় কিংবদন্তি মাইকেল হোল্ডিং। বর্ণবাদের দুঃসহ স্মৃতি স্মরণ করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বাবা-মায়ের সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়লে আবেগ সামলাতে পারি না। আমি জানি আমার বাবা-মাকে কী সহ্য করতে হয়েছিল। আমার মায়ের পরিবার তার সঙ্গে কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছিল। কারণ, তার স্বামীর গায়ের রং ছিল বেশি কালো। বাবা-মায়ের সেই অভিজ্ঞতার কথা ভুলতে পারি না। বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।’
ক্রিকেট মাঠে ফেরার পর অন্যান্য দলও জর্জ ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদ করেছে। আইপিএলে হাফসেঞ্চুরির পর হাঁটু মুড়ে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন হার্দিক পান্ডিয়াও। এ ছাড়া সাবেক এবং বর্তমানের প্রায় সব ক্রিকেট কিংবদন্তিই বর্ণবাদবিরোধী প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন।
টেনিসে প্রতিবাদ
সব টেনিস তারকা এবং কিংবদন্তিই ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ প্রতিবাদ আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন, কিন্তু বেশি সোচ্চার ছিলেন সেরেনা উইলিয়ামস। কোর্টে তিনি বহুবার বর্ণবিদ্বেষের প্রতিবাদ করেছেন। কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার কারণে স্বীকৃতি ও যোগ্য মর্যাদা পাননি বলেও অভিযোগ করেছেন বারবার। ব্রিটিশ ম্যাগাজিনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের প্রশংসা করে তিনি বলেছিলেন, ‘বর্ণবাদ, বৈষম্যমূলক ঘটনা সবার সামনে আনার ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা নিয়েছে প্রযুক্তি। অনেক কিছুই এখন প্রকাশ্যে আসছে, যা আগে সেভাবে সামনে আসেনি। এতদিন ধরে যা হয়ে আসছে, মানুষ তা সহ্য করেছে। এর আগে তো কেউ ফোনে ভিডিও করেনি। এখন যেন ওদের (শ্বেতাঙ্গ) হঠাৎ করে নজরে পড়তে শুরু করেছে সব। এতদিন কারও নজরে পড়েনি কেন? সারা ক্যারিয়ারজুড়ে তো আমি প্রতিবাদ করে আসছি। নারী এবং কৃষ্ণাঙ্গদের দেখিয়ে দিতে হবে প্রতিবাদের ভাষা তাদের রয়েছে, ঈশ্বর জানেন আমি নিজের প্রতিবাদের ভাষা ব্যবহার করি।’
ইউএস ওপেনে জাপানের নাওমি ওসাকা টেনিস কোর্টে বর্ণবাদবিরোধী প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন রজার ফেদেরার, রাফায়েল নাদাল এবং নোভাক জকোভিচও।
