সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার খামার গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান। ধারদেনার পুঁজিতে কাপড় কেনেন। বিভিন্ন এলাকার পাইকারদের কাছে এগুলো পাঠানোর পর টাকা পান বিকাশ অ্যাকাউন্টে। মোস্তাফিজুরের টাকায় নজর পড়ে প্রতারকের। বিকাশ কর্মকর্তা সেজে ফোন দিয়ে ভুলে ৯ হাজার টাকা চলে গেছে জানান। চেক করে অ্যাকাউন্টে সমপরিমাণ টাকা পান তিনি। এরপর মিথ্যা তথ্য দিয়ে মোস্তাফিজুরের অ্যাকাউন্টের পিন নিয়ে সাড়ে ৩৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারকরা।
গত অক্টোবরে প্রতারণার এ ঘটনা ঘটে। গত বৃহস্পতিবার মোস্তাফিজুর দেশ রূপান্তরকে জানান, ঘটনার কয়েক দিন পর বেলকুচি থানায় তিনি জিডি করেন। এখন পর্যন্ত একটি টাকাও উদ্ধার হয়নি। পুঁজি হারানোর ধাক্কা এখনো ভোগাচ্ছে বলে জানান তিনি।
মোস্তাফিজুরের মতো সারা দেশে পড়ালেখা না জানা অনেক ব্যবসায়ী বিদায়ী ২০২০ সালে মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারকদের খপ্পরে তাদের পুঁজি খুইয়েছেন। প্রতিকারের আশায় থানায় গেলে পুলিশ মামলার বদলে জিডি নিলেও কোনো টাকা উদ্ধার করতে পারেনি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণা বলছে, মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে প্রতারণার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার করে। বাংলাদেশে বর্তমানে বেসরকারি ডাচ-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক লিমিটেড মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালাচ্ছে। সব মিলে গ্রাহক তিন কোটির বেশি। টাকা লেনদেনের সহজ মাধ্যম হিসেবে মোবাইল ব্যাংকিং জনপ্রিয়তা পেয়েছে। একই সঙ্গে মাধ্যমটি ব্যবহার করে প্রতারণা, চাঁদাবাজি ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে।
মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণার মামলার অধিকাংশ তদন্ত করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ।
সিটিটিসির সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের উপকমিশনার আ ফ ম আল কিবরিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রাহক সচেতনতার অভাবে বেশিরভাগ প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। মোবাইল ব্যাংকিং পরিচালনাকারী কর্র্তৃপক্ষকে অ্যাকাউন্টের সঠিকতা যাছাইয়ে আরও আন্তরিক হওয়া দরকার।’
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পেইড অ্যাপসের মাধ্যমে ‘বিকাশ’ লেখা বা বিকাশের নম্বর ক্লোন করে প্রতারকরা নানা কৌশলে গ্রাহককে বিভ্রান্ত করে তাদের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ ছাড়া ‘হ্যালো পার্টি’ নামে প্রতারক গ্রুপ, জিনের বাদশা পরিচয়ে ফোন, জিম্মি করে চাঁদা আদায়, অপহরণের পর চাঁদা দাবি, সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদা, জঙ্গি কার্যক্রমে টাকা লেনদেন, অশ্লীল ছবি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, ফেইসবুক হ্যাক করে টাকা আদায়সহ বহুমাত্রিক প্রতারণা হচ্ছে। আর এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের টাকা আদায় মূলত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হচ্ছে। এ ধরনের প্রতারক গ্রুপ এখন শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, বিদায়ী ২০২০ সালে সারা দেশে মোবাইল ব্যাংকিং খাতে প্রতারণার মচ্ছব হয়েছে। শহর থেকে গ্রাম সবখানে সক্রিয় ছিল হাজারো প্রতারক চক্র। এক বছরে এসব চক্রের পকেটে গেছে গ্রাহকের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। বছর শেষেও অধিকাংশ প্রতারক চক্র ধরাছোঁয়ার বাইরে, উদ্ধার হয়নি উল্লেখ করার মতো কোনো অর্থ।
সারা দেশে থানায় করা মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, বিদায়ী বছরে সারা দেশে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ২ হাজার ৪৭৭টি মামলা করেন ভুক্তভোগীরা, যা গড়ে দিনে ৭টি। এসব মামলার তদন্তে হাজার হাজার প্রতারক চক্রের সন্ধান পেলেও অর্থ উদ্ধারের ঘটনা প্রায় শূন্য। এরই প্রভাবে এখন প্রতারণার শিকার হলেও বেশিরভাগ ভুক্তভোগী মামলা করতে চান না। তাদের অভিযোগ, পুলিশ মামলা না নিয়ে জিডি নেয়। ফলে কোনো তদন্ত হয় না।
পুলিশের রেঞ্জ অনুযায়ী মামলার তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, বিদায়ী বছরে সবচেয়ে বেশি প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। এই রেঞ্জের বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে ২৭১টি। প্রতারণার শিকার বিভাগগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় ঢাকা বিভাগ। এই বিভাগের বিভিন্ন জেলায় মামলা হয়েছে ২২৮টি। এ ছাড়া রাজশাহী ১৫৩, খুলনা ১৭৪, বরিশাল ১১৮, সিলেট ৭৪, রংপুর বিভাগে ১৬৭, রেলওয়ে রেঞ্জে ২টি ও ময়মনসিংহ বিভাগে ১৪১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মেট্রোপলিটন অন্তর্ভুক্ত থানায় সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ১৪৯টি মামলা হয়েছে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী উপমহাপরিদর্শক সোহেল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজ থেকে অপরাধ দূর করা সম্ভব নয়। সামাজিক-সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিকসহ যেসব প্রভাবক মানুষকে অপরাধমনস্ক বা অপরাধ সংঘটনে দায়ী, সেগুলো সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। মোবাইল ব্যাংকিং নয়, যেকোনো প্রতারণার ক্ষেত্রেই এটি প্রাসঙ্গিক। তবে আমরা অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনা কমিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’
