করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ইউরোপ ও আমেরিকা। অনেক স্থানে চলছে লকডাউন। বাকি সব এলকায় সামাজিক অনুষ্ঠানের ওপর রয়েছে নানা বিধিনিষেধ। এতে সেখানকার পোশাক বিক্রি অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। গোডাউনে পড়ে আছে বিলিয়ন ডলারের পণ্য। পাওনাদারের ধাক্কা সামলাতে না পেরে অনেক নামী ব্র্যান্ডও দেউলিয়ার খাতায় নাম লেখানোর আবেদন করেছে। অনেকে বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এমতাবস্থায় আগামী শীত মৌসুমের ক্রয়াদেশ দেওয়ার ব্যাপারে সময় নিচ্ছেন। রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, ইউরোপের বর্তমান অবস্থা ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে দেউলিয়ার তালিকা আরও বাড়বে। এমনটি হলে দেশের পোশাক কারখানা মালিকদের বড় ধরনের সংকটের মুখ পড়তে হবে।
ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া ঘোষণার জন্য দেশভেদে আইনের পার্থক্য রয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকার আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পাওনাদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে অক্ষম হলে তখন ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দেউলিয়ার জন্য আবেদন করতে পারে । সে ক্ষেত্রে আদালত ওই প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ করবে। এরপর তার সম্পদের একটি চূড়ান্ত হিসাব করা হবে। যদি দেনা পরিশোধের সামান্যতম সুযোগ থাকে তাহলে ওই প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া তালিকাভুক্ত হতে পারবে না। অন্যথায় হয় কোম্পানিটির দেনা শোধের জন্য সরকার অর্থের জোগান দেবে বা অন্য একজন পার্টনার নেওয়ার সুযোগ দেবে। অন্যথায় কোম্পানিটিকে নিলামে তুলতে পারে। তবে দুটি ক্ষেত্রেই ঋণ পরিশোধে স্থানীয় পাওনাদাররা অগ্রাধিকার পাবে। সুতরাং রপ্তানিকারকরা শিগগিরই তাদের পাওনা পাবে না।
টিম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ হিল রাকিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ক্রেতারা জানিয়েছেন, তাদের প্রায় ৫০ শতাংশ পণ্য স্টক হয়ে আছে। পণ্য খালাস করলে টাকা পরিশোধ করা লাগবে এ জন্য অনেকেই শিপমেন্ট পিছিয়ে দিচ্ছেন। লকডাউন যদি ফেব্রুয়ারির পরেও দীর্ঘায়িত হয় তাহলে ক্রেতাদের স্টকের পরিমাণ বাড়বে। আর পণ্যের স্টক বাড়লে তারল্য সংকট বাড়বে। এতে পাওনাদারের পরিমাণও বাড়তে থাকবে। তখন হয়তো আরও অনেকে দেউলিয়া ঘোষণার জন্য আবেদন করবে। এমনটি হলে আমরা বাঁচতে পারব না। কারণ, আমরা তো আমাদের টাকা পাব না।’ রপ্তানিকারকদের এ বিষয়ে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
করোনা মহামারী শুরুর দুই মাসের মাথায় গোটা ইউরোপ-আমেরিকায় লকডাউন শুরু হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিক্রি বন্ধ হওয়ায় ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল করে। এরপরও অনেকে ধাক্কা সামলাতে পারেনি। দেনার দায়ে অনেক নামী ব্র্যান্ড দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্যের দেবেনহাম ও এডিনবার্গ উলেন মিল, যুক্তরাষ্ট্রের জে সি পেনি, জে ক্র, অ্যাসেনা রিটেইল গ্রুপ, সিয়ার্সসহ অনেক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকেও পণ্য কেনে। বাংলাদেশ থেকে পণ্য কেনা বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো করোনার প্রথম ধাক্কা সামলে নিয়েছিল। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় বিক্রির মৌসুম বড়দিনের সময়ে দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানায় বিক্রিতে আবারও ধস নেমেছে। ইউরোপের গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পোশাক স্টক হয়ে আছে। এ অবস্থায় সামনে আরও অনেক দামি প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া ঘোষণার জন্য আবেদন করে বসতে পারে। তাহলে বাংলাদেশের জন্য সেটা বড় ধরনের ধাক্কা হবে।
এদিকে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় ক্রয়াদেশ আরও কমছে; বিশেষ করে শীতকালীন ক্রয়াদেশে ভাটা পড়তে শুরু করেছে। সাধারণত এপ্রিল-আগস্টে শীতকালীন পণ্য রপ্তানি করা হয়। অন্য সময়ে গ্রীষ্মকালীন পণ্য রপ্তানি হয়। শিপমেন্টের দুই থেকে তিন মাস আগে ক্রয়াদেশ আসে। রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, প্রতি বছর এই সময়ে যে পরিমাণ ক্রয়াদেশ পাওয়া যেত এবার সেভাবে আসছে না। ক্রেতারা বলছেন অপেক্ষা করতে। এ ছাড়া যেসব ক্রয়াদেশ আসছে, সেগুলোর দামও ৭-১০ শতাংশ কম।
ইউরোপের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শীতের শুরু থেকেই সেখানে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ প্রকট হয়েছে। আমেরিকায়ও একই অবস্থা। এতে অনেক দেশ লকডাউন জারি করেছে। আবার অনেক দেশ সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সীমিত করে ফেলেছে। এ ছাড়া সেখানকার সর্ববৃহৎ উৎসব বড়দিনে সেভাবে বিক্রি হয়নি। এতে ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রি অর্ধেকে নেমে গেছে। স্টক হয়েছে বিলিয়ন ডলারের পণ্য। যদি শীত মৌসুমে করোনা নিয়ন্ত্রণে না আসে তাহলে বিক্রিতে আরও বড় ধস নামবে। তখন ক্রেতারা অবিক্রীত পণ্য আগামী শীতে বিক্রি করতে চাইবে। এমনটা হলে বাংলাদেশও শীতকালীন ক্রয়াদেশ কম পাবে।
নিপা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খসরু চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আশার কথা হলো করোনার ভ্যাকসিন চলে এসেছে। ওদের শীত চলবে মে মাস পর্যন্ত। তাই পণ্য বিক্রির সময় এখনো আছে। এ জন্য নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার ব্যাপারে ক্রেতারা সময় নিচ্ছে। আমাদের জানিয়েছে, এই মাস শেষে বোঝা যাবে অবস্থা কোন দিকে যায়। যদি ভ্যাকসিনে করোনা নিয়ন্ত্রণে আসে তাহলে শীতকালীন ক্রয়াদেশ নিয়ে তেমন একটা ভাবতে হবে না বলেই আমার মনে হচ্ছে।’
