কৃষকের স্বার্থরক্ষায় পরবর্তী সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত নতুন করে পেঁয়াজ আমদানির অনুমোদন (আইপি) দেবে না সরকার। যেসব আইপি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মেয়াদও বাড়াবে না। তবে বাজার স্থিতিশীল রাখতে চলমান আইপির বিপরীতে আমদানি করা পেঁয়াজের বড় অংশ সরকারের বিপণন সংস্থা টিসিবি কিনে নেবে। গতকাল রবিবার সচিবালয়ে কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এদিকে গত দুদিন ধরে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি অব্যাহত থাকায় দেশের তিন স্থলবন্দর এলাকায় পণ্যটির দামে ধস নেমেছে।
কৃষিপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) অনুমোদন নিতে হয়। একটি আইপির মেয়াদ থাকে চার মাস, পরে আরও দুই মাস বাড়ানো যায়। গত বছর ১৪ সেপ্টেম্বর ভারত সরকার পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। প্রায় সাড়ে তিন মাস পর গত ২৮ ডিসেম্বর এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় দেশটি। এরপর গত শনিবার থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে পারছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। তবে গত দুদিন যেসব পেঁয়াজ এসেছে, তা আগেই দেওয়া আইপির অধীনে এবং জানুয়ারি পর্যন্ত মেয়াদ থাকা এসব আইপির বিপরীতে ছয় লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি বাকি রয়েছে। কিন্তু ভারতে বর্তমানে পেঁয়াজ সংকট থাকায় সর্বোচ্চ এক লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন ডিএই কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, আইপির মেয়াদ শেষে আরও দুই মাস বাড়ানো যায়। কিন্তু কৃষকদের স্বার্থরক্ষায় মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না। যারা পেঁয়াজ আমদানি করতে চাইছেন, তারা আগের আইপি দিয়ে মেয়াদ থাকাকালীন ঋণপত্র (এলসি) খুলে করতে পারবেন।
গতকালের বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা আমদানির বিপক্ষে তাদের মতামত তুলে ধরেন। এ সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়, আবহাওয়া প্রতিকূলে থাকার পরও এবার সারা দেশে ৯ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এবার চার লাখ টন বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হবে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে পেঁয়াজের আমদানি নির্ভরতা কমে যাবে। কিন্তু ভরা মৌসুমে আমদানি হলে পেঁয়াজের দাম কমে যাবে। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আগামীতে পেঁয়াজ চাষে নিরুৎসাহিত হবেন। বাজারে যাতে প্রভাব না পড়ে সেজন্য আগের আইপির আমদানি করা পেঁয়াজ টিসিবি কিনে নেবে বলে জানানো হয়।
গতকাল বৈঠকে অংশ নেওয়া ডিএইর সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক এ কে এম মনিরুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ (গতকাল) সকালে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজন নেই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকেও আমরা একই কথা বলেছি। সেখানে পেঁয়াজ উৎপাদনের তথ্য পেশ করেছি। তারা আমাদের কথা শুনেছেন। পেঁয়াজে নতুন কোনো সংকট তৈরি না হলে আপাতত আমদানির অনুমোদন দেওয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভারত তাদের সুবিধামতো পেঁয়াজ বাংলাদেশে রপ্তানি করে এবং তা বন্ধ করে। এজন্য আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে চাহিদা পূরণে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। ভোক্তা ও উৎপাদনকারীদের স্বার্থরক্ষা করেই পেঁয়াজ আমদানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আগে এলসি করা পেঁয়াজগুলো এখন দেশে আসছে। এগুলোর বর্তমান আমদানি মূল্য প্রতি কেজি প্রায় ৩৯ টাকা। দেশীয় পেঁয়াজ পুরোদমে বাজারে আসবে মার্চে। কোনো অসাধু ব্যবসায়ীকে সুযোগ নিতে দেওয়া হবে না, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে দেশে ৮-৯ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজের ঘাটতি রয়েছে। সরকার পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। যে হারে উৎপাদন বাড়ছে, আগামী তিন বছরের মধ্যে এ লক্ষ্য পূরণ হবে বলে আশা করছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বাজারে আলুর মূল্য এখন স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ায় সাময়িক প্রভাব পড়েছে। তবে অসৎ উপায়ে কেউ যাতে পণ্যমূল্য বাড়াতে না পারে, সে বিষয়ে সরকার সজাগ রয়েছে। এই মুহূর্তে চালের মজুদ কিছুটা কম থাকায় আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রয়োজনীয় মজুদ নিশ্চিতে চাল আমদানি করা হবে। দরকার হলে বেসরকারি পর্যায়েও আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে।’
আমদানির প্রভাবে বন্দরে দামে ধস : প্রায় সাড়ে তিন মাস বন্ধ থাকার পর গত শনিবার থেকে দেশে আসতে শুরু করেছে ভারতীয় পেঁয়াজ। এর প্রভাবে দেশের প্রধান তিন স্থলবন্দর দিনাজপুরের হিলি, সাতক্ষীরার ভোমরা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ বন্দরে পণ্যটির দামে ধস নেমেছে।
গতকাল দিনাজপুরের হাকিমপুর প্রতিনিধি জানান, গত সপ্তাহে বন্দর এলাকায় কেজিপ্রতি পেঁয়াজ ছিল ৪০-৪৫ টাকা। গতকাল তা কমে ২৮-৩০ টাকায় বিক্রি হয়।
