সৈয়দ আশরাফের মৃত্যু দিবসে ছিল না আ.লীগের কর্মসূচি

নেতাকর্মীরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২১, ০২:৪৯ এএম

আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী ছিল গতকাল রবিবার। ২০১৯ সালের এই দিনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন দেশের জনপ্রিয় এই নেতা। তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ক্ষমতাসীন দলটি বা এর সহযোগী সংগঠনগুলোর পক্ষে ছিল না কোনো কর্মসূচি। এমনকি প্রয়াত এই নেতার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে গতবার দলের পক্ষ থেকে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে তার কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হলেও এবার তাও হয়নি। শধু পরিবারের পক্ষ থেকে সৈয়দ আশরাফের বোন সৈয়দ জাকিয়া নূর অন্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বনানী কবরস্থানে ভাইয়ের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে মোনাজাত করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগভাবে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। দলের আর কোনো নেতা বনানী কবরস্থানে গেছেন বলে খবর পাওয়া যায়নি। অবশ্য দলের অনেক সাধারণ কর্মী-সমর্থক বিচ্ছিন্নভাবে শ্রদ্ধা জানান। এর বাইরে সৈয়দ আশরাফের জন্মস্থান কিশোরগঞ্জে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ নেতাকর্মীদের মনে প্রশ্ন, তাহলে কি মাত্র দুই বছরেই সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে ভুলে যেতে বসেছে দল!।

দলীয়ভাবে কর্মসূচি না থাকায় আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মীরা ভীষণ হতাশ ও ক্ষুব্ধ। সাধারণ কর্মীদের মতো ক্ষোভ কেন্দ্রীয় অনেক নেতার কণ্ঠেও ঝরেছে। তবে ক্ষুব্ধ কোনো নেতাই প্রকাশ্যে তাদের ক্ষোভের কথা জানাতে চাননি। ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গতকাল দিনভর এ নিয়ে ক্ষোভ ঝেড়েছেন দলের অনেক কর্মীসহ সাধারণ মানুষ। দলে প্রয়াত সৈয়দ আশরাফের অসামান্য অবদান এবং ব্যক্তিজীবনে তার স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কথা তুলে ধরে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন দলের অসংখ্য নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। কোনো কোনো স্ট্যাটাসে দলীয় কোনো কর্মসূচি না থাকায় আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্বের তুমুল সমালোচনাও করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলোচনায় দলের অন্তত দেড় ডজন নেতা দলীয় কর্মসূচি না থাকার বিষয়টি তুলে ধরে ক্ষোভ ঝাড়েন। কিন্তু নাম প্রকাশ করে তারা কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

দলীয়ভাবে কর্মসূচি গ্রহণ করা না হলেও সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে স্মরণ করে বনানী কবরস্থানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। অপর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে একটি অনুষ্ঠানে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে স্মরণ করে বক্তব্য দেন। জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট এই স্মরণসভার আয়োজন করে তথ্যমন্ত্রীর নির্দেশে।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকীতে দলীয় কর্মসূচি না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক সায়েম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো সাধারণ সম্পাদকের মৃত্যুবার্ষিকীতে দলের পক্ষ থেকে কোনো কর্মসূচি নেওয়া হয় না। তবে দলের সাধারণ কর্মীরা এই বক্তব্য মানতে নারাজ। তাদের দাবি, দলের জন্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আর অন্য কোনো নেতার অবদান এক নয়।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের একজন জনপ্রিয় নেতা। তার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের কোনো কর্মসূচি থাকলে ভালো ও সুন্দর দেখাত।’

তবে প্রয়াত কোনো সাধারণ সম্পাদকেরই মৃত্যুবার্ষিকীতে কোনো কর্মসূচি থাকে না জানিয়ে নাছিম বলেন, ‘পারিবারিকভাবে অথবা কোনো সংগঠনের ব্যানারে আয়োজন থাকলে আওয়ামী লীগ নেতারা সেখানে অংশ নেন।’

সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুবার্ষিকীতে দলীয় কর্মসূচি না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়টি আওয়ামী লীগ নেতাদের জিজ্ঞাসা করুন।’

প্রবীণ আরেক নেতা মোজাফফর হোসেন পল্টু বলেন, ‘সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম নিঃসন্দেহে একজন জ্ঞানী-গুণী-জনপ্রিয় ও বলিষ্ঠ নেতা। তাকে স্মরণ না করার কোনো কারণ নেই। আওয়ামী লীগের জন্য তিনিসহ তার গোটা পরিবারের অবদান রয়েছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রবীণ আরেক নেতা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ এখন বর্তমানের পার্টি হয়ে গেছে। অতীতকে মনে রাখে না। আবার দলের ভেতরে বেশিরভাগ নেতা মনে করেন অন্যকে শ্রদ্ধা করলে নিজে বুঝি খাটো হয়ে গেল। এই মানসিকতা থেকে হয়তো এমন ঘটনা ঘটতে পারে।’

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি নিজেও লজ্জিত। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুবাষিকী কেন আমার মনে ছিল না! সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে আমি সরাসরি কাজ করেছি। উনি অনেক বড়মাপের নেতা। আশা করি দলের নেতাকর্মীরা তাকে শ্রদ্ধাভরে মনে রাখবেন।’

সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কর্মময় জীবন নিয়ে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তার আংশিক এখানে তুলে ধরা হলো ‘ওয়ান-ইলেভেনের কঠিন দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা তখন আদর্শের পরীক্ষায় হাবুডুবু খাচ্ছেন। ভয় এবং লোভের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছেন অনেকে। যখন প্রিয় নেত্রীর গ্রেপ্তারে হতবিহ্বল কর্মীরা। হতাশা, বিভক্তি আর অজানা আশঙ্কায় বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগ। এ সময় সৈয়দ আশরাফ শেখ হাসিনার পক্ষে এক অনবদ্য অবস্থান নেন। দলকে টেনে তোলেন খাদের কিনারা থেকে। সৈয়দ আশরাফ দলের বাইরেও ছিলেন সমান জনপ্রিয়। এমন স্বল্পভাষী, মিষ্টভাষী, পরিমিতিবোধ সম্পন্ন প্রজ্ঞাবান মানুষ রাজনীতিতে বিরল। দেশ, বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার প্রতি সৈয়দ আশরাফের কমিটমেন্ট ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে। কর্মীদের ওনার মত করে ধারণ করতে খুব কম নেতাই পেরেছেন।’

দলে প্রয়াত সৈয়দ আশরাফের অসামান্য অবদান এবং ব্যক্তিজীবনে তার স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কথা তুলে ধরে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা শরীফুল হাসান তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এই বাংলাদেশের অসাধারণ একজন রাজনীতিবিদ। সততা, আদর্শ, বিনয় সব দিক থেকেই অসাধারণ। ক্ষমতায় গেলে অন্য প্রায় সবার সম্পদ যখন হু হু করে বাড়ে, তখন আপনারটাই শুধু কমেছে। যেটুকু ছিল তা-ও বিলিয়ে দিয়ে সব সময় ডুবে থাকতেন বইয়ের মধ্যে।

প্রিয় আশরাফ ভাই, বাংলাদেশের প্রথম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে আপনি। সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন প্রায় এক দশক। পাঁচবারের এমপি আপনি, তিনবারের মন্ত্রী। কিন্তু এত কিছুর পরেও আপনার বিনয় ছিল অসাধারণ। এত সব পদে থাকার পরেও নিজের চিকিৎসার জন্য শহরের বাড়িটা বিক্রি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আপনি সৈয়দ আশরাফ বলেই এটা সম্ভব। কারণ রাজনৈতিক সততার উজ্জ্বল ও বিরল এক দৃষ্টান্ত আপনি।’

সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুতে দলীয় কর্মসূচি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে শরীফুল লিখেছেন, ‘আশরাফ ভাই, আজ আপনার মৃত্যুবার্ষিকী। কিন্তু আপনি তো পঙ্গপালের মতো কর্মী রাখতেন না। তারাই আপনার কাছে থাকতেন যারা দলটাকে ভালোবাসত। এই যে দেখেন আজকে আপনার মৃত্যুবার্ষিকী অথচ আপনাকে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ফেসবুক ভেসে যাচ্ছে না। আপনার স্মরণে বড় কোনো অনুষ্ঠান চোখে পড়েনি। শ্রদ্ধা জানাতে আওয়ামী লীগের কোনো কেন্দ্রীয় নেতা কবরে যাননি। অবশ্য কারও থাকা না থাকায় সৈয়দ আশরাফের কিছু যায়-আসে না। বেঁচে থাকতেই তিনি এসব করেননি, দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর আর তার দরকার কী?’

জিয়া উদ্দিন শিপু নামে আরেকজন তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘আজকের দিনে কে ফুল দিতে গেল, কে যায়নি বড় কথা নয়। মানুষ আপনাকে মনে রাখবে সৈয়দ আশরাফ ভাই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত