বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে পা রাখেন। স্বাভাবিকভাবেই দেশশাসনের ভার জাতি তার ওপর অর্পণ করে। সদ্যস্বাধীন রক্তঝরা, মুক্তিযুদ্ধে বিধ্বস্ত একটি দেশ। হাজারো সমস্যা, আর্থিক দৈন্য, নেই মূলধন, নেই বৈদেশিক মুদ্রা। অপরদিকে পরাজিত শক্তির উৎকট ঝামেলা, দেশ-বিদেশের গভীর ষড়যন্ত্র। সব প্রতিহিংসা, প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২-৭৩ আর্থিক বছর প্রথম বাংলাদেশের বাজেট পেশ করেন। বাজেটে ৫০০ কোটি টাকা উন্নয়ন খাতের মধ্যে ১০১ কোটি টাকা রাখেন কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে। সেই বাজেট
কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের মাইলফলক। অতঃপর কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু সবুজ বিপ্লবের ডাক দেন। হাওর-বাঁওড়-চর- পাহাড়-গড় ও সমতল ভূমির কৃষকের উপযোগিতার ভিত্তিতে কৃষি উন্নয়নে জোর দেন। তার নেতৃত্বাধীন সরকার কৃষি উন্নত দেশ থেকে বাংলার মাটি, জলবায়ু ও কৃষকের উপযোগী বিজ্ঞানসম্মত উন্নত প্রযুক্তি সংগ্রহে নেমে পড়েন। সেদিনকার পূর্ব জার্মানি থেকে ৩৮ হাজার সেচযন্ত্র, সোভিয়েত ইউনিয়নের ইউক্রেন থেকে বর্টারে ট্রাক্টর এবং ফিলিপাইন থেকে আইআর-৮ উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান আমদানি করেন। উক্ত আমদানিকৃত বীজ ও কীটনাশক উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বিনামূল্যে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করে। এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) কৃষি উপকরণ যথা সার, সেচযন্ত্র, ডিজেল ও উন্নত জাতের বীজ সরকারি ভর্তুকি মূল্যে সহজলভ্যে কৃষকদের হাতে তুলে দেয়। এমনকি বঙ্গবন্ধু ভারতের ফারাক্কা থেকে শুকনো মৌসুমে পদ্মা নদীতে ৫৪,০০০ কিউসেক পানির নিশ্চয়তা আদায় করেন। এছাড়া ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসের মধ্যেই গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প পূর্ণোদ্যমে চালুর যথাযথ ব্যবস্থা নেন।
তার নেতৃত্বাধীন সরকার কিছু যুগান্তকারী প্রদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর সূচনালগ্নে পাকিস্তান আমলের বিভিন্ন ব্যাংকের বকেয়া দশ লাখ কৃষকের সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার করে নেন। কৃষকদের খাজনার হয়রানি ও ব্যতিব্যস্ত জীবন থেকে রেহাই দিতে পঁচিশ বিঘা পর্যন্ত ভূমি খাজনা মওকুফ করে দেন। ভূমি মালিকানা সর্বোচ্চ সিলিং একশ বিঘা পর্যন্ত ধার্য করেন। বাড়তি বা খাসজমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। অতঃপর কৃৃষিঋণ পাওয়াতে হয়রানি রোধে ১৯৭৩ সালে কৃষকদের দোরগড়ার ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া জাতীয়করণকৃত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রায় ৩০ কোটি টাকা সহজলভ্য কৃষিঋণ বিতরণ করেন। তার উদ্যোগে পাটচাষিদের পাটচাষের প্রতি আরও উৎসাহ ও উদ্দীপনা বজায় রাখার লক্ষ্যে বিভিন্ন বাস্তবসম্মত প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে কৃষকরা যাতে পাটের ন্যায্যমূল্য পায় সে জন্য ১৯৭২ সালে পাটের মণপ্রতি সর্বনিম্ন মূল্য ১০০ টাকা ধার্য করেন। এই প্রথম কৃষকসমাজ রাষ্ট্রের কাছ থেকে উৎপাদিত ফসলের গ্যারান্টি অর্জন করে। উন্নতমানের পাট উৎপাদনে কৃষি মন্ত্রণালয়ে আলাদা অধিদপ্তর হিসেবে ‘পাট সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ১৯৭৫’ চালু করেন। উক্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে শক্তিশালী পাটচাষি সমিতি গড়ে তুলেন। এছাড়া পাট গবেষণা কেন্দ্রকে গতিশীল, টেকসই ও চাহিদামাফিক যুগোপযোগী করতে জুট অ্যাক্ট, ১৯৭৪ এর মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট’ নামকরণ করেন। এছাড়া কৃষক ও জাতীয় উৎপাদনের স্বার্থে পাটকলগুলোকে জাতীয়করণ করেন। বাংলার অপর আরেকটি অর্থনৈতিক ফসল ইক্ষুচাষকে আধুনিকীকরণের মাধ্যমে অধিক এলাকা চাষের আওতায় আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এ লক্ষ্যে চিনিশিল্পের উন্নয়নে ‘নিবিড় ইক্ষু উন্নয়ন প্রকল্প’ ‘ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রকল্প’ ও ‘খামার আধুনিকীকরণ প্রকল্প’ হাতে নেন। বিদ্যমান কয়েকটি চিনিকলের যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন ও আধুনিকীকরণের ব্যবস্থা নেন। ইক্ষুচাষিদের আগ্রহী করে গড়ে তোলার প্রয়াসে উন্নত জাত ও অধিক ফলনের ওপর জোর দেন এবং কৃষক ও জাতির উদ্দেশে চিনিকলগুলোকে জাতীয়করণ করেন। এছাড়া পাহাড়ি উপনিবেশিক অর্থকরী প্রতিযোগিতামূলক ফসল চা আধুনিকীকরণে বিভিন্নমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সংশ্লিষ্ট ফসলের সঙ্গে প্রায় ৩ লাখ শ্রমিক সরাসরি জড়িত যাদের মধ্যে ৭৫ ভাগই নারী ও উপজাতি। এই বৃহৎ অঙ্কের শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারে টিকে থাকায় উন্নত জাত ও মানসম্পন্ন চা উৎপাদনের কার্যক্রম গ্রহণ করেন। এজন্য পূর্ণাঙ্গ গবেষণা নির্ভর ‘বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট’ ১৯৭৩, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, সিলেট স্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধু বাংলার আদি ঐতিহ্যবাহী গর্বের হারিয়ে যাওয়া অর্থকরী ফসল তুলাচাষ পুনরায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ১৯৭২ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘তুলা উন্নয়ন বোর্ড’ গঠন করেন। বোর্ডকে এ দেশের উপযোগী জাত বাছাই, গবেষণা ও চাষযোগ্য এলাকা চিহ্নিতকরণসহ ব্যাপক চাষের কর্মসূচি প্রদান করেন।
বঙ্গবন্ধু বৃক্ষরোপণকে বৈচিত্র্যমুখী করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ লক্ষ্যে ফুল-ফল-শাকসবজি ও শৌখিন গাছ-গাছড়ার চারা উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে ‘উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড’ স্থাপন করেন। এ ছাড়া চারা উৎপাদনকারী সমমনা বিভাগ ও সংস্থা যথা বনায়ন, বিএডিসি, এনজিও এবং ব্যক্তি পর্যায়ে চারা উৎপাদনকারীদের মধ্যে অবাধ সৃষ্টিশীল প্রতিযোগিতার মনোভাব গড়ে তোলার প্রদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এর ফলে কৃষকদের চারাপ্রাপ্তি সহজ হয় এবং গ্রাম-গ্রামান্তরে বৃক্ষরোপণের মানসিকতা গড়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু কৃষিতে নতুন নতুন প্রযুক্তি স্থায়ী ও টেকসই করায় সমন্বিত গবেষণার ওপর জোর দেন। এ জন্য কৃষির সঙ্গে জড়িত সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার গবেষণাগার এক ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ নেন। সে লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে ‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল’, খামারবাড়ি রোড, ঢাকা প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া গবেষণাগারের উদ্ভাবিত জাত ও বীজের মান কৃষক পর্যায়ে যথাযথ বজায় রাখার ওপর জোর দেন। যাতে বীজ ক্রয়ের ক্ষেত্রে কৃষককুল কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না- হয়। এ ব্যাপারে সরকারি-বেসরকারি উৎপাদিত খামারের বীজ বাজারজাতকরণের মান নিয়ন্ত্রণে সরকারি স্বায়ত্তশাসিত এজেন্সি হিসেবে ‘বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি’ ২২ জানুয়ারি, ১৯৭৪, গাজীপুর স্থাপন করেন। এছাড়া গবেষণাগারের উদ্ভাবিত নতুন নতুন প্রযুক্তি ও জাত ত্বরিতগতিতে সঠিক তথ্যসহ করণীয় কৃষকদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগকে চৌকস দক্ষ কারিগরি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এ লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সম্প্রসারণ রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (সার্ডি) ১৯৭৫, বাংলাদেশ জাপান সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্বাক্ষরে গাজীপুর, ঢাকা স্থাপন করেন।
বঙ্গবন্ধু কৃষিসংশ্লিষ্ট মৎস্য ও পশুসম্পদ বিভাগকে গতিশীল ও যুগোপযোগী করার বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন মাছ হবে দ্বিতীয় প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাদ্যপণ্য। তিনি মৎস্যজীবী সম্প্রদায়কে মহাজনী শোষণ থেকে রক্ষার জন্য ‘জাল যার জলা তার’ নীতি ঘোষণা দেন। এবং স্বায়ত্তশাসিত সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)’, মতিঝিল, ঢাকা ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন। উক্ত সংস্থার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ‘বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাকাডেমি (বিএমফএ)’, ১৯৭৩ স্থাপন করেন। অ্যাকাডেমি স্থাপনে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সেদিনের ইউএসএসআর (সোভিয়েট ইউনিয়ন)-এর তত্ত্বাবধানে তাদের মেরিন বিশেষজ্ঞ এবং কলাকুশলীদের দিয়ে সম্পন্ন করেন। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে উৎপাদিত দুধ ক্রয়ে সমবায়ী প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটা, ঢাকা, ১৯৭৪ চালু করেন। এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে ১ লাখ ৫০ হাজার গাভী বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। গ্রামীণ উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিবর্গকে কৃষি, উদ্যান, টিসু কালচার, মৎস্য, পশুসম্পদের ওপরে হাতেকলমে প্রশিক্ষিত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৭৪ সালে গবেষণাধর্মী ‘পল্লী উন্নয়ন অ্যাকাডেমি (আরডিএ)’, বগুড়া। বঙ্গবন্ধু কৃষি, মৎস্য, পশুসম্পদে ব্যতিক্রমধর্মী কর্মকান্ডে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ ২৯/১৯৭৩ এর মাধ্যমে ‘বঙ্গবন্ধু পুরস্কার তহবিল’ গঠনপূর্বক পুরস্কার প্রদানের রেওয়াজ প্রচলন করেন। বর্তমান সময়ে বঙ্গবন্ধুর নেওয়া সেই সময়কার উদ্যোগের পথ ধরে বাংলাদেশ কৃষিতে বেশ অগ্রসর হতে পেরেছে। লোকসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ কিন্তু খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে চারগুণ। খাদ্য ঘাটতির দেশ আজ খাদ্যে উদ্বৃত্ত এবং একটি রপ্তানিকারক দেশ। বাংলাদেশ আজ বিশ্বে সবজি উৎপাদনে তৃতীয় এবং মৎস্য উৎপাদনে চতুর্থ। সেদিক থেকে বাংলাদেশের কৃষি খাতে বঙ্গবন্ধুর নেওয়া উদ্যোগগুলো স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক উপপরিচালক (অব.), কৃষি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ
